শনিবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত হলেন মডেল, অভিনেত্রী ও টেলিভিশন উপস্থাপিকা তুলনা আল হারুন। শুক্রবার রাতে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁর মা, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমেনা বেগম দাফনের খবরটি জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে শোবিজ অঙ্গনের একজন পরিচিত মুখের শেষ যাত্রা সম্পন্ন হলো।
তুলনার অসুস্থতার গল্পটা খুব অল্প সময়ের। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় মাস আগে তাঁর স্তনে টিউমার ধরা পড়ে। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ঢাকার আহ্ছানিয়া মিশন হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়। পরে তাঁকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। সর্বশেষ পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
গত ২০ অক্টোবর তুলনার শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর বায়োপসি পরীক্ষায় ক্যান্সার শনাক্ত হয়। চিকিৎসকেরা তখন জানতে পারেন, তত দিনে তাঁর শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়েছে। এই খবরটি পরিবারের জন্য যেমন আকস্মিক, তেমনি শোবিজের সহকর্মীদের কাছেও ছিল গভীর ধাক্কা। কারণ, অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি এতটা জটিল হয়ে উঠবে, তা অনেকেই আঁচ করতে পারেননি।
মেয়ে তুলনার শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে মা আমেনা বেগম জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের পরের দুদিন তুলনা শারীরিকভাবে বেশ ভালো ছিলেন। পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন, হাসিখুশি ছিলেন। কিন্তু তারপরের দিন সকাল থেকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। খুব দ্রুত অবস্থা খারাপ হতে থাকে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর রাত ১১টায় তুলনাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। মায়ের এই বর্ণনায় একজন মায়ের কাছে মেয়ের শেষ দুটি দিনের স্মৃতি যেমন আছে, তেমনি আছে হঠাৎ করে সব শেষ হয়ে যাওয়ার বেদনাও।
মডেলিং, অভিনয় ও টেলিভিশন উপস্থাপনার মাধ্যমে বিনোদন অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছিলেন তুলনা আল হারুন। ফ্যাশন কোরিওগ্রাফার ও স্টাইলিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে দেশের ফ্যাশন ও বিনোদন অঙ্গনের বিভিন্ন আয়োজনে যুক্ত ছিলেন এই শিল্পী। মঞ্চের পেছনে যেমন তাঁর কাজ ছিল, তেমনি ক্যামেরার সামনেও তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ। এই দুই দিক মিলিয়েই তিনি শোবিজে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন।
পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রাণবন্ত উপস্থিতি ছিল তুলনার। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শোক প্রকাশ করছেন সহকর্মী, ফ্যাশন কোরিওগ্রাফার, ডিজাইনার ও ভক্তরা। অনেকেই তাঁর সঙ্গে কাজের স্মৃতি স্মরণ করছেন। কারও কাছে তিনি ছিলেন সহকর্মী, কারও কাছে বন্ধু, কারও কাছে অনুপ্রেরণা। এই শোকবার্তাগুলোই বলে দেয়, তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন অনেকের আপনজন।
তুলনা আল হারুন দেশের প্রখ্যাত নাট্যকার ও নাট্যনির্দেশক আবদুল্লাহ আল মামুনের ভাই আবদুল্লাহ আল হারুনের মেয়ে। তাঁর বাবা আবদুল্লাহ আল হারুন জার্মানিতে থাকেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মা আমেনা বেগম এখন এই শোকের সবচেয়ে কাছের সাক্ষী। একটি পরিবারের জন্য সন্তান হারানোর শোকের কোনো ভাষা হয় না। আর যখন সেই সন্তান সবার পরিচিত মুখ হন, তখন ব্যক্তিগত শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় সবার ভালোবাসা ও স্মৃতি।
আজকের দাফনের মধ্য দিয়ে তুলনার শেষকৃত্য সম্পন্ন হলো। কিন্তু তাঁর কাজ, তাঁর হাসি, তাঁর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো থেকে যাবে সহকর্মী ও ভক্তদের স্মৃতিতে। শোবিজ অঙ্গনে তাঁর চলে যাওয়া শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়, এটি একটি প্রজন্মের কাছে পরিচিত একজন শিল্পীকে হারানোর বেদনা। এই বেদনার মধ্যেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন সবাই।
