নাটকের শিল্পীদের পারিশ্রমিক ও কাজের নিরাপত্তা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন অভিনেত্রী পারসা ইভানা। কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি জানিয়েছেন, প্রতিটি কাজের জন্য লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক করা হোক। তাঁর ভাষায়, 'এখন সময় এসেছে প্রতিটি কাজের জন্য লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক করার।' সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মশিউর রহমান। একসময় নৃত্যশিল্পী হিসেবে বেশি পরিচিত থাকলেও সময়ের সঙ্গে অভিনয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন ইভানা, আর এই সাক্ষাৎকারে তাঁর ক্যারিয়ারের নানা বাঁক উঠে এসেছে।
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই উঠে আসে তাঁর নতুন নাটক 'রুমালে গাঁথা ভালোবাসা'-র কথা। সাগর জাহানের পরিচালনায় এটি তাঁর প্রথম কাজ, সহশিল্পী হিসেবে আছেন ইরফান সাজ্জাদ। গল্পটি পারিবারিক ও রোমান্টিক ধাঁচের, কেন্দ্রে রয়েছে এক গ্রামের মেয়ের বড় হওয়ার স্বপ্ন আর তাকে সহায়তা করা এক শহুরে তরুণ। ইভানার ভালো লেগেছে এই জায়গাটাতেই: তাঁর চরিত্রটি, এক সাধারণ গ্রামের মেয়ে, শুধু প্রেমের গল্পের নায়িকা হিসেবে নয়, নিজের স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
নাটকটি কোথায় দেখা যাবে, সে প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন ইভানা। তাঁর প্রত্যাশা, এটি ইউটিউবে ফুল স্ক্রিন এন্টারটেইনমেন্ট চ্যানেলে প্রকাশ পাবে। প্রযোজনা করেছেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। ফুল স্ক্রিনের প্রথম নাটক 'অথবা তুমি আমি'-তেও কাজ করেছিলেন ইভানা, তখনই বুঝেছিলেন তিশা পুরো বিষয়টি নিজে তদারকি করেন। সিনিয়র শিল্পীদের মধ্যে খুব কমজনই নবীনদের জন্য এভাবে সুযোগ তৈরি করেন বলে মনে করেন তিনি। তিশা নতুন শিল্পীদের কাজ দেখেন, উৎসাহ দেন, আর তাঁর নাচ পছন্দ করেন, এটা একজন নতুন শিল্পীর জন্য বড় অনুপ্রেরণা বলে জানিয়েছেন ইভানা।
অভিনয়ে এলেও নাচ থেকে দূরে সরেননি তিনি, এ কথাও স্পষ্ট করেছেন ইভানা। এখনো প্রতি দুই থেকে তিন মাসে অন্তত একটি ড্যান্স ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি, কারণ দর্শক তাঁর নাচ দেখতে ভালোবাসে। তবে নিজের জন্য নাচের কনটেন্ট বানানো সহজ নয়: পুরো খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়, কোনো স্পনসর বা ব্র্যান্ড থাকে না, শুধু ভালো লাগা থেকেই করেন। শুটিংয়ের ব্যস্ততার ফাঁকে সাক্ষাৎকারের কয়েক দিন আগেও একটি ড্যান্স ভিডিও শুট করেছেন তিনি, যা এখনো প্রকাশ পায়নি। নাচ তাঁর পরিচয়ের বড় অংশ বলেই সব সময় এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান তিনি।
এখন কেমন চরিত্র চান, সে প্রশ্নে আন্তর্জাতিক কাজের উদাহরণ টেনেছেন ইভানা। নেটফ্লিক্সের সিরিজ আর বলিউডের ছবিতে শিল্পীরা কীভাবে নিজেদের ক্রমাগত নতুন করে আবিষ্কার করছেন, তা লক্ষ্য করেন তিনি। আলিয়া ভাটের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, প্রতিটি ছবিতে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে, কখনো অ্যাকশন, কখনো রোমান্স, কখনো নারীকেন্দ্রিক গল্প। নিজেকেও সেভাবেই দেখতে চান ইভানা। নির্দিষ্ট কোনো স্বপ্নের চরিত্র নেই, তবে এমন চরিত্র চান যেখানে দর্শক তাঁকে আগে কখনো দেখেনি। তাঁর ভাষায়, 'দর্শক যেন প্রতিবার নতুন একজন ইভানাকে দেখতে পায়।'
চরিত্র বাছাইয়ে এখন আগের চেয়ে সতর্ক তিনি। অনেক নাটকের প্রস্তাব আসে, কিন্তু ইতিমধ্যে করা চরিত্র বা একই ধরনের চরিত্র এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। সব সময় তা সম্ভব হয় না, তখন গল্প ভালো হলে পরিচালক ও সহশিল্পীদের সঙ্গে আলোচনা করে চরিত্রটিকে একটু আলাদা করার বা নতুন কিছু যোগ করার চেষ্টা করেন। লক্ষ্য একটাই: একটি কাজের সঙ্গে আরেকটি কাজ যেন না মেলে, মানুষ এক হলেও চরিত্র যেন আলাদা হয়।
ভক্তদের বহুদিনের প্রশ্ন, 'ব্যাচেলর পয়েন্ট'-এ কি ফিরবেন তিনি, তারও জবাব দিয়েছেন ইভানা। জানিয়েছেন, কাজল আরেফিন অমির সঙ্গে দুই বছর ধরে কোনো কাজ হয়নি, আর 'ব্যাচেলর পয়েন্ট ৫' প্রায় শেষের পথে। এখনো তাঁকে ডাকা হয়নি, আর ভবিষ্যতে কিছু হলে তা আনুষ্ঠানিকভাবেই সবাই জানতে পারবে। অর্থাৎ ফেরার গুঞ্জন নিয়ে তিনি কোনো নিশ্চয়তা দেননি, আবার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ করেননি।
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি এসেছে পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে। এই বিষয়ে এখনো কোনো সমাধান হয়নি বলে জানিয়েছেন ইভানা। যাঁর কাছে টাকা ছিল, তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তিনি সম্পূর্ণ যোগাযোগের বাইরে। তবে ইতিবাচক দিকটি হলো, যে প্রোডাকশন কোম্পানির কাজ ছিল, তারা পুরো টিমের দায়িত্ব নিয়েছে এবং শিল্পী ও কলাকুশলীদের পেমেন্ট দেওয়ার কথা বলেছে। এটাকে ইতিবাচক দিক হিসেবেই দেখছেন তিনি।
এটা তাঁর প্রথম এমন অভিজ্ঞতা নয়। ক্যারিয়ারের শুরুতে নবীন অবস্থায় অনেকবার এমন হয়েছে, তখন কথা বলার জায়গা ছিল কম, প্রায়ই পারিশ্রমিক পেতেন না, প্রতিবাদ করার সাহসও ছিল না। এখনো অনেকের কাছে তাঁর টাকা পাওনা আছে, কার কাছে কত পাওনা তা আর মনেও নেই। তাঁর মতে, ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বেশিরভাগ কাজ হয় ভরসার ভিত্তিতে: পরিচালক বা প্রযোজক কিছু বলেন, তিনি কাজ করেন, কিন্তু কথা না রাখলে হাতে কোনো আইনি কাগজ থাকে না, কারণ বেশিরভাগ নাটকের ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তিই থাকে না। এই জায়গা থেকেই এসেছে তাঁর লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক করার দাবি।
এই দাবি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় নাটকপাড়ার বাস্তবতা থেকে। নবীন শিল্পীদের অনেকেই কাজের শুরুতে চুক্তি ছাড়াই শুটিংয়ে নামেন, আর পরে পারিশ্রমিক আটকে গেলে তাঁদের হাতে থাকে না কোনো প্রমাণ। ইভানার মতো পরিচিত মুখ যখন প্রকাশ্যে এই সমস্যার কথা বলেন, তখন বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগ থাকে না, গোটা ইন্ডাস্ট্রির চর্চা নিয়ে প্রশ্ন হয়ে ওঠে। এরপরের নজর দুই জায়গায় থাকবে: 'রুমালে গাঁথা ভালোবাসা' কবে ইউটিউবে আসে, আর লিখিত চুক্তির দাবি নাটকপাড়ায় কোনো আলোচনার জন্ম দেয় কি না।
