অভিযোগ উঠলেই কি একজন মানুষকে দোষী ধরে নেওয়া যায়, এই প্রশ্ন তুলে নিজের অবস্থান জানালেন অভিনেত্রী তানজিন তিশা। তাঁর বিরুদ্ধে নতুন পিটিশন মামলায় আদালত সমন জারির পর ফেসবুকে দীর্ঘ এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। সেখানে মামলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ আর নিজের সম্মান নিয়ে উদ্বেগের কথা লিখেছেন এই অভিনেত্রী। রাইজিংবিডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত ওই স্ট্যাটাসেই তিশা প্রথমবারের মতো এই মামলা নিয়ে নিজের পক্ষের কথা সামনে এনেছেন।
তিশার দাবি, তাঁর একটি বক্তব্যের রেকর্ড থেকে নিজেদের সুবিধামতো অংশ কেটে মূল কথার অর্থ বদলে দেওয়া হয়েছে। এরপর ভিন্ন গল্প সাজিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে তাঁর সম্মানহানির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এই প্রচেষ্টার পেছনে কারা রয়েছে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন অভিনেত্রী। তাঁর ভাষায়, এত বছরের সম্মান, ক্যারিয়ার আর অর্জন ধ্বংস করে দেওয়ার মতো এমন চেষ্টা কেন করা হচ্ছে, সেটাই তাঁর জিজ্ঞাসা।
নিজের বিরুদ্ধে মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিশা প্রশ্ন করেছেন, অভিযোগ করলেই সত্য হয়ে যায়? তাঁর মতে, কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে তা বিশ্বাস করা এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া একজন মানুষের দীর্ঘদিনের অর্জন ও সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আদালতের পাশাপাশি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
অভিনেত্রীর ভাষ্য, এ ঘটনায় অনেক প্রশ্নের উত্তর ও তথ্যপ্রমাণ তাঁর কাছে রয়েছে। তবে সেসব তথ্য ও প্রমাণ মানুষের সামনে তুলে ধরবে কে, আদালত, নাকি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, সেই প্রশ্নও রেখেছেন তিনি। অর্থাৎ, নিজের পক্ষের প্রমাণ তিনি আদালতের প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই সামনে আসুক, এমনটাই চাইছেন বলে বোঝা যাচ্ছে তাঁর স্ট্যাটাস থেকে।
এই জবাবের প্রেক্ষাপটটা বোঝা জরুরি। গত ২৬ অক্টোবর ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মু. মাহবুব-উল-আলমের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭ ও ১১৭(সি) ধারায় নতুন পিটিশন মামলাটি করেন নারী উদ্যোক্তা ও ফ্যাশন ডিজাইনার সানায়া আনাম ওয়াফিকাহ চৌধুরী। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে সমন জারি করেছেন। আগামী ২৩ নভেম্বর তাঁকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, পুরোনো মামলা করার পর থেকে তিশা বিভিন্ন সময়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও হুমকি দিতে শুরু করেন। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই নতুন পিটিশন মামলাটি দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এখানে মনে রাখা দরকার, এগুলো বাদীর অভিযোগ। আদালত এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেননি।
পুরোনো মামলাটির গোড়ায় রয়েছে একটি শাড়ি ফেরত দেওয়া নিয়ে বিরোধ। বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তিশা তাঁর কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি শাড়ি নেন। অনুষ্ঠান শেষে পরদিন শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সানায়া। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় মামলা হয়।
ওই পুরোনো মামলায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, অর্থাৎ পিবিআই তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেছিল। একই সঙ্গে তিশাকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছিল। বাদী সেই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হননি। তিনি নারাজি আবেদন করেন। আদালত নারাজি মঞ্জুর করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, অর্থাৎ সিআইডির কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।
ফলে এখন দুটি আলাদা প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলছে। একটি হলো পুরোনো মামলার সিআইডি তদন্ত, যার প্রতিবেদন আসবে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। অন্যটি হলো নতুন পিটিশন মামলা, যেখানে ২৩ নভেম্বর তিশাকে হাজির হয়ে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। তিশার ২৭ অক্টোবরের স্ট্যাটাস এই দ্বিতীয় প্রক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই এসেছে।
এই ঘটনা কেন আলোচনায়, সেটা শুধু একজন তারকার মামলা বলে নয়। এখানে দুটি বড় প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে একজন মানুষের সুনাম কত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দ্বিতীয়ত, অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব কার, আদালতের, নাকি অনলাইন আলোচনার। তিশার স্ট্যাটাস মূলত এই দ্বিতীয় প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে।
তিশার ভক্তদের একাংশ তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে অভিযোগ যাচাই না করে ছড়িয়ে না দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, বাদীর পক্ষের বক্তব্যও এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। দুই পক্ষের বক্তব্যই এখন প্রকাশ্যে রয়েছে, আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভার আদালতের ওপর।
এরপর কী হবে, সেটা এখন দুটি তারিখের ওপর নির্ভর করছে। ২৩ নভেম্বর নতুন পিটিশন মামলায় তিশার হাজিরা ও কারণ দর্শানোর বিষয়টি সামনে আসবে। আর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার কথা। এই দুটি তারিখের যে কোনো একটিতে নতুন তথ্য এলে মামলাটি আবার আলোচনায় আসবে। ততদিন পর্যন্ত অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখতে হবে, চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়।
