অভিনেত্রী তানজিন তিশাকে ঘিরে চলমান মামলায় সোমবার একসঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আদালতের নির্দেশ সামনে এলো। প্রথম নির্দেশে পুরোনো মামলাটির অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, অর্থাৎ সিআইডি। দ্বিতীয় নির্দেশে একই দিনে দায়ের করা নতুন একটি পিটিশন মামলায় তিশাকে আদালতে হাজির হয়ে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। দুটি নির্দেশই এসেছে ঢাকার আদালত থেকে, তবে দুটি আলাদা আদালতের আলাদা কার্যক্রমে।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম বাদীপক্ষের নারাজি আবেদন মঞ্জুর করেন। এরপর মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডির কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত। বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভ্র সিনহা রনি এই নির্দেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা জরুরি। সিআইডি তদন্তের নির্দেশ মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। এর অর্থ হলো, আগের তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে বাদীর আপত্তি আদালত গ্রহণ করেছেন এবং নতুন করে তদন্তের সুযোগ দিয়েছেন। সিআইডির প্রতিবেদন আসার পরই বোঝা যাবে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তকারীরা কী সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
মামলার বাদী ফ্যাশন ডিজাইনার আয়েশাহ আনুম ফায়যাহ সানায়া চৌধুরী। তাঁর অভিযোগ, গুলশানের ১২৭ নম্বর সড়কে তাঁর একটি ফ্যাশন হাউস ও স্টুডিও রয়েছে। ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তানজিন তিশা তাঁর কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি শাড়ি নেন। অনুষ্ঠান শেষে পরদিন শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সানায়া।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী ঘটনার ধারাবাহিকতা এরপর আরও জটিল হয়। শাড়িটি ফেরত চেয়ে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তানজিন তিশাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান সানায়া। এ নিয়ে অভিনেত্রী তাঁকে গালাগাল ও প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে ২০২৫ সালের ১৩ ও ১৮ মার্চ দুটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিশার সঙ্গে দেখা হলে আবারও শাড়িটি ফেরত চান সানায়া। তখনো শাড়িটি ফেরত দেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।
এই অভিযোগগুলোই মামলার ভিত্তি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকার আদালতে দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় তানজিন তিশার বিরুদ্ধে মামলা করেন সানায়া। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব দেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে, অর্থাৎ পিবিআইকে। পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশও করা হয়।
বাদী সেই প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হননি। তিনি নারাজি আবেদন করেন, অর্থাৎ প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে আপত্তি জানান। ২৫ অক্টোবর সেই নারাজি দাখিল করা হয়। আদালত নারাজি মঞ্জুর করে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনটি পুনরায় সিআইডিকে দিয়ে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। এভাবেই মামলাটি এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের তদন্তে গেল।
একই দিনে, অর্থাৎ ২৬ অক্টোবর, আরও একটি মামলার খবর এসেছে। সানায়া চৌধুরী ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বাদী হয়ে নতুন একটি পিটিশন মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, পুরোনো মামলা করার পর থেকে তিশা বিভিন্ন সময়ে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও হুমকি দিতে শুরু করেন। বাদীর অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গত ৭ নভেম্বর তাঁকে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন অকথ্য ভাষায় হেনস্তা করা হয়।
বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, সেই ঘটনার পর ১২ নভেম্বর গুলশান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি। পরবর্তীতে অজ্ঞাত লোক পাঠিয়ে মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয় এবং দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সানায়া। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে ও থানা কর্তৃপক্ষের পরামর্শে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নতুন পিটিশন মামলাটি দায়ের করেন।
ঢাকার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মু. মাহবুব উল আলম আদালতে বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে অভিযোগ আমলে নেন। এরপর অভিনেত্রী তানজিন তিশাকে আদালতে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন আদালত। আগামী ২৩ নভেম্বর তাঁকে আদালতে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাদীর আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায় এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এই প্রতিবেদনগুলোতে তানজিন তিশার বক্তব্য উল্লেখ নেই। ফলে তাঁর পক্ষের অবস্থান এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। পাঠকের জন্য এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, এখানে তুলে ধরা হুমকি, চাপ বা শাড়ি ফেরত না দেওয়ার বিষয়গুলো বাদীর অভিযোগ। আদালত এখনো এগুলো প্রমাণিত বলে রায় দেননি। সিআইডির তদন্ত ও ২৩ নভেম্বরের শুনানির পর মামলার পরবর্তী দিকটি আরও পরিষ্কার হবে।
এরপর কী হবে, সেটা এখন দুটি তারিখের ওপর নির্ভর করছে। প্রথমটি ২৩ নভেম্বর, যেদিন নতুন পিটিশন মামলায় তিশাকে হাজির হয়ে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। দ্বিতীয়টি ৩১ ডিসেম্বর, যেদিনের মধ্যে সিআইডিকে পুরোনো মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এই দুটি তারিখের যে কোনো একটিতে নতুন তথ্য এলে মামলাটি আবার আলোচনায় আসবে। ততদিন পর্যন্ত অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখতে হবে, চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়।
