জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুনেরাহ বিনতে কামাল এখন একসঙ্গে অনেকগুলো পরিচয়ে আলোচনায়। তিনি একদিকে 'দাগি' ছবির অভিনেত্রী, অন্যদিকে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত 'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড' ছবির শিল্পী। আবার তিনি মঞ্চে নাচও পরিবেশন করেন। সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর এই বহুমাত্রিক যাত্রার কথা খোলাখুলিভাবে বলেছেন।
সুনেরাহর গল্পের শুরুটা সঞ্চালনা দিয়ে। ২০২২ সালে ব্লেন্ডারস চয়েস, দ্য ডেইলি স্টার ওটিটি অ্যান্ড ডিজিটাল কনটেন্ট অ্যাওয়ার্ডস যখন প্রথম চালু হয়, তখন তিনি ছিলেন প্রথম দিকের সঞ্চালকদের একজন। পাঁচ বছর পর, ৯ অক্টোবর পঞ্চম আসরে তিনি আবার মঞ্চে ফেরেন। এবার তিনি ইরফান সাজ্জাদের সঙ্গে যুগল নৃত্য পরিবেশন করেন।
নিজের স্বভাব সম্পর্কে সুনেরাহর স্বীকারোক্তি বেশ সরল। তিনি বলেছেন, সঞ্চালনা তাঁর স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা নয়, কারণ তিনি লাজুক স্বভাবের মানুষ। সাক্ষাৎকারে কথা বলতেও তাঁর সময় লেগেছে, ধীরে ধীরে তিনি সহজ হয়েছেন। এই কথাটি অনেক তরুণ শিল্পীর সঙ্গেই মিলে যায়, যাঁরা ক্যামেরার সামনে আত্মবিশ্বাসী দেখালেও ভেতরে ভেতরে লড়াই করেন।
তবে এবারের মঞ্চে তাঁর আরেকটি পরিচয় সামনে আসে, শাস্ত্রীয় নাচের শিল্পী হিসেবে। 'পাতার বাঁশরী' পরিবেশনার মাধ্যমে তিনি সেই দিকটি দেখান। তিনি জানান, অনেকেই জানতেন না তাঁর শাস্ত্রীয় নাচের পটভূমি আছে, তাই এই পরিবেশনা দর্শকরা উপভোগ করেছেন। একজন অভিনেত্রীর নাচের প্রশিক্ষণ তাঁর অভিনয়েও কাজে লাগে, শরীরের ভাষা আর ছন্দের বোধ তৈরি করে।
ইরফান সাজ্জাদের সঙ্গে যুগল পরিবেশনা নিয়েও মজার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন সুনেরাহ। দুজনের ব্যক্তিত্ব আলাদা, তবে তাঁরা ভালোভাবে মিলে যান। মহড়ায় দুজনের প্রস্তুতির ধরন আলাদা হওয়ায় বিষয়টি মজার হয়ে উঠেছিল। সুনেরাহ নিজেই ইরফানকে ধাপগুলো শিখিয়েছেন, বারবার মহড়া দিতে হয়েছে, আর তাতে তাঁর নিজের পরিবেশনাও আরও ভালো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সেই সন্ধ্যার আরেকটি বড় প্রাপ্তি ছিল 'দাগি' ছবির পিপলস চয়েস পুরস্কার। দর্শকদের ভালোবাসায় ছবিটি এই স্বীকৃতি পেয়েছে। সুনেরাহ জানান, ছবি মুক্তির পর থেকে দর্শকরা তাঁকে একই প্রশ্ন করে আসছেন, কেন তিনি মনোনয়ন পাননি, কেন পুরস্কার পাচ্ছেন না। তাঁর অভিনয় নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, এটা তিনি নিজেও টের পেয়েছেন।
এই প্রশ্নের জবাবে সুনেরাহর অবস্থান স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, স্বীকৃতি শুধু পুরস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অবশ্যই তিনি চান ছবিটি ভালো করুক, কারণ সেই ছবিতে তাঁর চরিত্র আছে, ছবির সাফল্য তাঁর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পুরস্কার না পাওয়া মানেই কাজের মূল্য কমে যাওয়া নয়। এই মনোভাব একজন শিল্পীর পরিণত মানসিকতার পরিচয় দেয়।
এরপর সুনেরাহর যাত্রা যায় ভেনিসে। রুবাইয়াত হোসেনের 'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড' ছবির প্রিমিয়ারে তিনি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, দর্শকরা ছবিটি সত্যিই উপভোগ করেছেন, গল্প, নির্মাণ আর অভিনয় সবকিছুই তাঁদের ভালো লেগেছে।
ভেনিসের অভিজ্ঞতার আরেকটি দিক ছিল সাজসজ্জার কষ্ট। ছবিতে তাঁকে ভারী লেহেঙ্গা, পূর্ণাঙ্গ কনের সাজ আর হাত পায়ে আলতার মতো দেখতে কাপড় পরতে হয়েছে। প্রতিদিন সাজতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত। মাথায় ঘোমটা আটকে গেলে শুটিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাথরুমেও যেতে পারতেন না। এই কষ্টের পরেও পর্দায় চেহারাটা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে বলে তিনি খুশি।
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে সুনেরাহ কথা বলেন দর্শকের বদলে যাওয়া অভ্যাস নিয়ে। তাঁর মতে, দর্শক এখন দ্রুত কনটেন্ট চান, রিল দেখে দেখে তাঁরা পরের ভিডিওতে চলে যেতে অভ্যস্ত। ইউটিউব নাটকের সহজলভ্যতাও এই অভ্যাসকে বাড়িয়েছে। অন্যদিকে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোকে এমন কনটেন্ট দিতে হবে, যা দর্শক বসে দেখতে চান, যেমন নেটফ্লিক্সের মতো সেবায় দেখা যায়।
তাঁর এই পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশের বিনোদন শিল্পের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়। কখনো ছবি, কখনো সিরিজ, কখনো টেলিভিশন নাটক, প্রতিটি মাধ্যমের দর্শক আলাদা, আর প্রতিটির জন্যই আলাদা ধরনের কাজ দরকার বলে মনে করেন সুনেরাহ। একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর এই বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে আলাদা করে।
সব মিলিয়ে সুনেরাহর গল্পটি শুধু একটি সাক্ষাৎকার নয়, একজন শিল্পীর ধীরে ধীরে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প। প্রথম আসরের লাজুক সঞ্চালক থেকে পঞ্চম আসরের আত্মবিশ্বাসী পরিবেশক, 'দাগি'র দর্শকপ্রিয়তা থেকে ভেনিসের পর্দা, এই পথে পুরস্কার, প্রশ্ন আর পরিশ্রম সবই আছে। আর আছে পরের কাজের জন্য একটি পরিষ্কার বার্তা, স্বীকৃতি যেভাবেই আসুক, কাজের মানই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
