বিনোদন ঝলক
তারকা

ফিডব্যাকের ৫০ বছর: '৫০ নট আউট' নিয়ে কী ঘোষণা এলো, কনসার্ট কোথায় শুরু হবে

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৪ অক্টোবর ২০২৬5 মিনিটে পড়ুন
ফিডব্যাকের ৫০ বছর উদযাপন নিয়ে নিজের বানানো গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে যে কয়টি নাম না নিলেই নয়, ফিডব্যাক তার একটি। ১৯৭৭ সালের অক্টোবরে যাত্রা শুরু করা ব্যান্ডটি এখন ৫০ বছরে পা দিয়েছে। এই মাইলফলককে সামনে রেখে ব্যান্ডটি ঘোষণা করেছে বছরজুড়ে চলা এক বিশেষ আয়োজন, যার নাম 'ফিডব্যাক: ৫০ নট আউট'। নতুন গান, পুরোনো জনপ্রিয় গানের নতুন সংস্করণ আর দেশজুড়ে কনসার্ট, সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ উদযাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে ব্যান্ডটি।

শনিবার দ্য ডেইলি স্টারের এ এস মাহমুদ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। সেখানে ব্যান্ডের সদস্যরা ছাড়াও দেশের ব্যান্ড অঙ্গনের পরিচিত মুখেরা উপস্থিত ছিলেন। ব্যান্ডের প্রবীণ সদস্য ফোয়াদ নাসের বাবু বলেন, পাঁচ দশক ধরে শ্রোতাদের হৃদয়ে থাকা সত্যিই আনন্দের বিষয়। তাঁর ভাষায়, এই যাত্রা শুধু ব্যান্ডের নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন অসংখ্য সদস্য, গীতিকার, সুরকার এবং সর্বোপরি লাখো ভক্ত ও শ্রোতা।

পঞ্চাশ বছর ধরে কিবোর্ড বাজিয়ে আসা বাবুর এই মন্তব্যের মধ্যেই ফিডব্যাকের গল্পের সারাংশ লুকিয়ে আছে। একটি ব্যান্ড টিকে থাকে শুধু কয়েকজন শিল্পীর কারণে নয়, টিকে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা শ্রোতাগোষ্ঠীর ভালোবাসায়। ফিডব্যাকের ক্ষেত্রে সেই ভালোবাসা এসেছে মঞ্চ থেকে, রেডিও থেকে, ক্যাসেট আর সিডির যুগ পেরিয়ে এখনকার স্ট্রিমিং যুগ পর্যন্ত।

উদযাপন শুরু হবে চট্টগ্রাম থেকে। বাবু জানিয়েছেন, চট্টগ্রামকে বেছে নেওয়ার কারণ সেখানে ব্যান্ডের ভক্ত বেশি বলে তাঁদের মনে হয়। এরপর সারা দেশে কনসার্ট করার পরিকল্পনা আছে। একই সঙ্গে পুরোনো সদস্যদের এক মঞ্চে আনার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি। যাঁরা ব্যান্ডের বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের সবাইকে নিয়ে এই মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে তোলাই লক্ষ্য।

গিটারিস্ট লাবু রহমান এই উদযাপনের বার্তাটি আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ফিডব্যাক এখনো আউট নয়, ব্যান্ড আরও বহুদিন চলবে। তাঁর মতে, এই পেশায় অবসরের কোনো ধারণা নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম গিটারিস্টদের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠা লাবু রহমানের এই কথাটি শুধু একটি ঘোষণা নয়, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ধারাবাহিকতারও ঘোষণা।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের ব্যান্ড ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও উঠে আসে। মাইলসের ফ্রন্টম্যান হামিন আহমেদ স্মরণ করেন, দুটি ব্যান্ডের যাত্রা শুরু হয়েছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে। একই অ্যামপ্লিফায়ার ভাগ করে নেওয়ার ভ্রাতৃত্বের কথা বলেন তিনি। মাইলস যখন বাংলা গান প্রকাশের কথা ভাবছিল, তখন সবার আগে ফিডব্যাকের কথাই তাদের মনে এসেছিল বলে জানান হামিন।

এই স্মৃতিচারণ বোঝায়, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের প্রথম দিকের দিনগুলোতে প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতাই বেশি ছিল। মঞ্চ ভাগাভাগি, যন্ত্র ভাগাভাগি আর একে অপরের গান থেকে শেখা, এইভাবেই গড়ে উঠেছিল একটি অঙ্গন। ফিডব্যাক আর মাইলসের মতো ব্যান্ডগুলো সেই অঙ্গনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।

অনুষ্ঠানে ফিডব্যাকের প্রথম গিটারিস্ট সেলিম হায়দারের প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাঁর অবদানকে ব্যান্ডের ইতিহাসের অংশ হিসেবে স্মরণ করা হয়। রেনেসাঁর পিলু খান বলেন, ১৯৭০-এর দশকে সেরা সংগীতশিল্পীরা যেন এক ব্যান্ডেই ছিলেন, আর সেই ব্যান্ডটি ছিল ফিডব্যাক। শিল্পী হিসেবে তাঁদের গুণের পাশাপাশি মানুষ হিসেবেও তাঁরা সেরা বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অবসকিওর সায়েদ হাসান টিপু জানান, তরুণ সংগীতশিল্পী হিসেবে তাঁরা যখন ঢাকায় আসেন, তখন অনেক কিছুই জানতেন না। বেসিক বিষয়গুলো তাঁরা ফিডব্যাকের কাছ থেকেই শিখেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ফিডব্যাক তখন অবসকিওরের জন্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছিল। একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডের কাছ থেকে এমন সহায়তা পাওয়া তরুণদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এই কথাতেই বোঝা যায়।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন হাসিবুল হোসেন উপল। তিনি মাইলস ও ফিডব্যাকের সংগীতগত অবদান, সংগীতায়োজন আর বাজনার মানের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, এই দুটি ব্যান্ড শুধু জনপ্রিয় গান দেয়নি, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের মানদণ্ডও তৈরি করেছে।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ফিডব্যাক নিজস্ব একটি ধারা গড়ে তোলে, যেখানে লোকসংগীত, পপ আর আধুনিক রকের মিশেল ছিল। এই মিশেলই বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের বিবর্তনে ব্যান্ডটিকে আলাদা জায়গা দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে মাকসুদুল হক, পিয়ারো খান ও লাবু রহমানের মতো সংগীতশিল্পীরা ব্যান্ডের এই যাত্রায় অবদান রেখেছেন।

ফিডব্যাকের গানের তালিকায় আছে 'মেলায় যাইরে', 'এই দিন চিরদিন রবে', 'এক ঝাঁক প্রজাপতি', 'ঝাউ বনে', 'উদাসী', 'মৌসুমী', 'চিঠি', 'সুখী মানুষের ভিড়ে' আর 'গীতিকবিতা'। এর মধ্যে 'মেলায় যাইরে' বাংলা নববর্ষের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে গেছে যে অনেকেই একে ওই উৎসবের অনানুষ্ঠানিক সংগীত বলে মনে করেন। একটি গান যখন উৎসবের অংশ হয়ে যায়, তখন তা আর শুধু ব্যান্ডের থাকে না, হয়ে যায় সবার।

এখন প্রশ্ন হলো, ৫০ বছরের উদযাপনে শ্রোতারা আসলে কী পাবেন। ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন গান আসবে, পুরোনো গান নতুনভাবে শোনা যাবে, আর দেশের বিভিন্ন জায়গায় কনসার্ট হবে। পুরোনো সদস্যদের ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা থাকায় এই কনসার্টগুলো শুধু গানের অনুষ্ঠান হবে না, হয়ে উঠবে স্মৃতিচারণের মঞ্চও। যাঁরা ফিডব্যাকের গান শুনে বড় হয়েছেন, তাঁদের জন্য এটি একটি আবেগের মুহূর্ত।

আর যাঁরা নতুন প্রজন্মের শ্রোতা, তাঁদের জন্য ৫০ নট আউট হতে পারে ফিডব্যাককে নতুন করে চেনার সুযোগ। পঞ্চাশ বছরের একটি ব্যান্ড কীভাবে এখনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে নতুন গানের কথা বলে, সেটাই এই উদযাপনের সবচেয়ে বড় বার্তা। ব্যান্ডটি থামতে চায় না, বরং অতীতকে সম্মান জানিয়ে সামনে এগোতে চায়।

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে পঞ্চাশ বছর টিকে থাকা সহজ নয়। ব্যান্ড ভাঙে, সদস্য বদলায়, শ্রোতার রুচি বদলায়। এর মধ্যেও ফিডব্যাক টিকে আছে, আর এখন সেই টিকে থাকাকেই উদযাপন করতে চাইছে। '৫০ নট আউট' নামটিই বলে দিচ্ছে, ইনিংস এখনো শেষ হয়নি।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার