কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সরাসরি নিজের ভয়ের কথা বললেন বলিউড অভিনেত্রী কৃতি শ্যানন। তাঁর মতে, এআই দিয়ে ব্যক্তিগত অধিকার ও ছবি অপব্যবহারের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোচ্ছে, সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনও বদলানো জরুরি। এই বক্তব্য তিনি দিয়েছেন সম্প্রতি এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিট ২০২৬-এ, দ্য মেকিং অব আ মডার্ন স্টার শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিয়ে।
কৃতির উদ্বেগের কেন্দ্রে আছে একটি সহজ প্রশ্ন: অনলাইনে দেখা কোনো ছবি আসল, আর কোনটি এআই দিয়ে তৈরি, তা কীভাবে বোঝা যাবে। তাঁর ভাষায়, আসল ছবি দেখতে যেমন, এআই দিয়ে তৈরি ছবিও ঠিক একই রকম। দুটির মধ্যে পার্থক্য সামান্যই। সে কারণে এআই ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, তার জন্য আমরা প্রস্তুত নই। এই প্রস্তুতির ঘাটতিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে কৃতি একটি রূপক ব্যবহার করেছেন, যা তাঁর বক্তব্যের সারাংশকে স্পষ্ট করে। তিনি বলেছেন, এআই তাঁকে ভয় দেখায়। তাঁর মনে হয়, অনেকেই এতে ভয় পান। তবে তিনি মনে করেন, এটি একটি হাতিয়ার, গন্তব্য নয়। হাতিয়ার যত ধারালো হয়, সেটি তত বিপজ্জনকও হতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তিকে তিনি অস্বীকার করছেন না, বরং তার ব্যবহারের সীমা ও সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
ব্যক্তিগত অধিকারের প্রশ্নটি কৃতির কাছে শুধু তত্ত্ব নয়, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেছেন, এআই দিয়ে আসলে কী কী করা সম্ভব, তার জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত, তা জানি না। ব্যক্তিগত অধিকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি তাঁর কাছে খুবই ভীতিকর। অনলাইনে যা দেখা যায়, তা সত্যিই ভয় পাওয়ার মতো। একজন জনপ্রিয় তারকার কাছে এই ভয় আরও বাস্তব। কারণ, তাঁদের ছবি, মুখ ও পরিচয় অনলাইনে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে থাকে, আর সেগুলো নিয়েই অপব্যবহারের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কৃতি স্পষ্ট অভিযোগ তুলেছেন। ইনস্টাগ্রামের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সেখানে এমন কোনো বিকল্প নেই, যেখানে বলা যাবে, এটি এআই দিয়ে তৈরি আমার ছবি, তাই এটি রিপোর্ট করে সরিয়ে দেওয়া উচিত। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা এখনো তত দ্রুত এগোতে পারছি না। এই ফাঁকটাই তাঁর মতে সবচেয়ে বড় সমস্যা। ছবি তৈরি করা যত সহজ হচ্ছে, ভুয়া ছবি সরানো তত সহজ হচ্ছে না।
তবে কৃতি প্রযুক্তিবিরোধী অবস্থান নেননি। তিনি বলেছেন, সে জন্য এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনও যুগোপযোগী করতে হবে। তিনি প্রযুক্তি ও নতুন উদ্ভাবনের পক্ষে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির সঙ্গে আইনকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এই ভারসাম্যটাই তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা। উদ্ভাবন থামিয়ে দেওয়া নয়, উদ্ভাবনের সঙ্গে সুরক্ষাকেও এগিয়ে নেওয়া।
কৃতি শ্যাননের নিজের যাত্রাটাও এই আলোচনার পটভূমি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালে তেলুগু চলচ্চিত্র ১: নেনোক্কাদিন দিয়ে বড়পর্দায় পা রাখার পর একই বছর হিরোপন্তি সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর থেকে তিনি একের পর এক সফল সিনেমা উপহার দিয়ে বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম শীর্ষ তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একজন শীর্ষ তারকার মুখ থেকে এআই নিয়ে এই সতর্কবার্তা আসায় বিষয়টি আরও জোরালো হয়েছে।
কেন এই বক্তব্য এখন গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তর লুকিয়ে আছে দর্শকের অভিজ্ঞতায়। আজ একজন সাধারণ দর্শকও অনলাইনে প্রতিদিন অসংখ্য ছবি ও ভিডিও দেখেন। কোনটি আসল, কোনটি বানানো, তা বোঝা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। এই বিভ্রান্তি শুধু তারকাদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে। কৃতির বক্তব্য তাই শুধু বলিউডের আলোচনা নয়, বরং ডিজিটাল যুগে সবার ব্যক্তিগত অধিকার নিয়ে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন।
এরপর কী হবে, তা নির্ভর করবে আইন প্রণেতা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক মাধ্যমের ওপর। কৃতি যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, সেগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে তিন দিক থেকেই: এআই ছবি শনাক্ত করার ব্যবস্থা, ভুয়া ছবি সরানোর সহজ পথ, আর ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষায় স্পষ্ট আইন। এই তিনটি জায়গায় অগ্রগতি না হলে ভয়টা শুধু বক্তব্যেই থেকে যাবে। আর অগ্রগতি হলে প্রযুক্তি ও সুরক্ষা একসঙ্গে এগোতে পারবে, যা কৃতি নিজেও চান।
