সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা যাঁদের আজকের, তাঁদের জন্য দুপুরের খবরটা আগের চেয়ে আরও পরিষ্কার, আর সেই পরিষ্কার খবরটা সুখের নয়। রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার পাল্টা সড়ক অবরোধ পালন করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি। এতে খাগড়াছড়ি, দীঘিনালা, সাজেক আর বাঘাইছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ শিথিলের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে আজ সকাল থেকে সাজেক সড়কে গাড়ি চলছে না।
মাঠের চিত্রটা সবচেয়ে বেশি বোঝা যাচ্ছে খাগড়াছড়ি শহর থেকে। রোববার সকাল থেকে অবরোধের কারণে খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। এতে কর্মজীবী মানুষ আর দূরপাল্লার যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। খাগড়াছড়ি জেলা শহরের ন্যান্সী বাজার এলাকার দীঘিনালা থেকে খাগড়াছড়ি স্টেশনে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে যাত্রীদের জটলা দেখা যায়। যানবাহন না পেয়ে অনেকে হতাশা প্রকাশ করেন। যাঁরা সকাল সকাল রওনা দেওয়ার আশায় স্টেশনে এসেছিলেন, তাঁরা গাড়ি না পেয়ে আটকে থাকেন।
এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো, তা বুঝতে দুটি ঘোষণা পাশাপাশি রাখতে হবে। গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক ইস্যুতে থেমে থেমে সড়কে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে আসছিল সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। শুক্রবার সংগঠন দুটির নেতা বাবুধন চাকমা ও নতুনজয় চাকমা এক বার্তায় রোববারের জন্য অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দেন। সাজেক এলাকার সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মাসব্যাপী কঠিন চীবর দান উৎসবের কথা বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান তাঁরা।
কিন্তু অবরোধ এক দিনের জন্য শিথিল করার ঘোষণায় অসন্তোষ জানিয়ে শনিবার রাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিন্দু লাল চাকমা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা অবরোধের ডাক দেন। সেই ডাকেই আজ সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার অবরোধ পালিত হচ্ছে। সকালের মাঠের চিত্র বলছে, পাল্টা অবরোধের পক্ষই আজ সড়কে কার্যকর হয়েছে, শিথিলের ঘোষণা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ক্ষোভও আজ সামনে এসেছে। পরিবহন শ্রমিক জসীম উদ্দিন বলেছেন, দুটি সংগঠন পর্যটনের ভরা মৌসুমে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য পুরো পরিবহন খাতকে জিম্মি করে ফেলেছে। তাঁর ভাষায়, এক দিনের জন্য অবরোধ শিথিলের ঘোষণা তাঁরা মানেন না, তাই পাল্টা সর্বাত্মক সাজেক অবরোধের পথে নেমেছেন তাঁরা। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শিথিল আর পাল্টা অবরোধের দ্বন্দ্বটা শুধু কাগজের ঘোষণায় আটকে নেই, সড়কে তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
খাগড়াছড়ির পরিবহন নেতা মীর হোসেন ও আয়ুস কান্তি চাকমা বলেছেন, এই অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে চলমান আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। তাঁদের আশঙ্কা, স্থায়ী সমাধান না হলে চলমান পর্যটন মৌসুমে সব ধরনের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হাজারো মানুষের জীবিকা সংকটে পড়বে। পর্যটন মৌসুমের ঠিক মুখে এই অচলাবস্থা তাই শুধু যাত্রীদের এক দিনের ভোগান্তি নয়, হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন আর স্থানীয় ব্যবসার ওপরও চাপ তৈরি করছে।
পেছনের গল্পটা আরও লম্বা। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, সাজেক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে। এই দাবিতে ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। এর মধ্যে শনিবার ৩১ অক্টোবর দুপুরে কলাবুনিয়া এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা গোলাগুলি হয়, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক পর্যটন ভ্যালিতে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞাও বহাল রয়েছে।
পর্যটকদের জন্য আজকের বার্তাটা তাই একটাই: শিথিলের খবর শুনে রওনা দেওয়া যাবে না। আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পাল্টা অবরোধ চলবে, আর তার পরও মূল অনির্দিষ্টকালের অবরোধ আবার কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে, কারণ শিথিলের ঘোষণা ছিল শুধু আজকের এক দিনের জন্য। সোমবার থেকে আবার আগের মতো অবরোধ চলার আশঙ্কা তাই থেকেই যাচ্ছে। যাঁদের সাজেকের বুকিং আছে, তাঁদের উচিত রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসন, রিসোর্ট বা পরিবহন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে আজকের সড়কের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করা। সড়কের অবস্থা বদলালে, বা সন্ধ্যার পর নতুন কোনো সিদ্ধান্ত এলে, সেই আপডেটও জানিয়ে দেওয়া হবে।
