সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা যাদের আজ, রোববার ১ নভেম্বর, তাদের জন্য সকালটা শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি দিয়ে। একই দিন, একই সময়, সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত, সাজেক সড়কে দুটি বিপরীত ঘোষণা কার্যকর। এক পক্ষ বলছে, এই ১২ ঘণ্টা অবরোধ শিথিল থাকবে। আরেক পক্ষ বলছে, ঠিক এই ১২ ঘণ্টাই নতুন করে অবরোধ পালন করা হবে। ফলে প্রশ্নটা আর শুধু সড়ক খোলা না বন্ধ, তা নয়। প্রশ্নটা এখন, কোন ঘোষণা মাঠে কার্যকর হবে, আর পর্যটকদের জন্য আজকের সাজেক যাত্রা আদৌ নিরাপদ কি না।
নতুন করে অবরোধের ঘোষণা এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে। শনিবার ৩১ অক্টোবর রাতে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সাজেকে ১২ ঘণ্টার অবরোধ পালন করা হবে। বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন কমিটির সদস্য সচিব বিন্দু লাল চাকমা। বিজ্ঞপ্তিতে সাজেকে সহিংসতা, সশস্ত্র তৎপরতা, ভাইবোনছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় সশস্ত্র মহড়া এবং পর্যটকদের জিম্মি করে হামলার প্রতিবাদে এই কর্মসূচি ঘোষণার কথা বলা হয়েছে। এই অভিযোগগুলো সংগঠনটির নিজস্ব বক্তব্য হিসেবেই প্রতিবেদনে এসেছে।
একই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গত ১১ অক্টোবর থেকে সাজেকে অবরোধ চললেও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বন্ধ হয়নি। বরং ৩১ অক্টোবর কলাবুনিয়া এলাকায় নতুন করে গোলাগুলির ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতেই এই কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। অর্থাৎ তাদের ভাষায়, এটি শুধু সড়ক বন্ধের কর্মসূচি নয়, নিরাপত্তার দাবিতে প্রতিবাদের কর্মসূচি।
অন্যদিকে, শিথিলের ঘোষণাটি এসেছিল তার আগের দিন, শুক্রবার ৩০ অক্টোবর রাতে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা এক ভিডিও বার্তায় জানান, রোববার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের জন্য যানবাহন চলাচলে বাধা থাকবে না। কঠিন চীবর দান উপলক্ষে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের যাতায়াতের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়। তবে সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিহার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে অবরোধকারী সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, আলোচনা সাপেক্ষে যানবাহন চলাচলের সুযোগ দেওয়া হবে।
এই দুটি ঘোষণা পাশাপাশি রাখলেই বিভ্রান্তির জায়গাটা পরিষ্কার হয়। শিথিলের ঘোষণা মূলত পণ্য পরিবহন আর ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাতায়াতের সুবিধার কথা বলছে। পাল্টা অবরোধের ঘোষণা বলছে, কর্মসূচি চলাকালে সড়কে যানবাহন না চালানোর জন্য যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, পর্যটক এবং সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে। তবে এই অবরোধে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও সংবাদকর্মীদের যানবাহন আওতামুক্ত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
পেছনের গল্পটা আরও লম্বা। গত ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে সাজেক সড়কে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে এই কর্মসূচি চলছে। তাদের দাবি, সাজেক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নিতে হবে, কারণ এসব সশস্ত্র সদস্যের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে, খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধের সংকট বাড়ছে, আর পর্যটন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।
সমাধানের চেষ্টাও হয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর উজো বাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়নি। এরপর ৩০ অক্টোবর শিথিলের ঘোষণা আসে, আর ৩১ অক্টোবর কলাবুনিয়ায় গোলাগুলির খবর আসে। এই ধারাবাহিকতায় ৩১ অক্টোবর রাতের পাল্টা অবরোধের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পর্যটকদের জন্য এর মানে কী, সেটা সরাসরি বলা দরকার। প্রথমত, আজ সাজেক সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক, এই ধারণা নিয়ে রওনা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ শিথিলের ঘোষণা থাকলেও একই সময়ে অবরোধের ঘোষণাও রয়েছে। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক পর্যটন ভ্যালিতে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো নতুন ঘোষণা এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তৃতীয়ত, ১ নভেম্বরের পর থেকে আগের মতো অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকার কথা আগেই জানিয়েছিল আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো।
তাই আজ যারা সাজেক যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাদের জন্য নিরাপদ পথ একটাই। রওনা দেওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবহন সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আজকের সড়কের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেওয়া, বুকিং থাকলে রিসোর্ট বা পরিবহন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি নিশ্চিত করা, আর কোনোভাবেই শুধু শিথিলের খবর শুনে যাত্রা শুরু না করা। খাদ্য ও ওষুধের সংকটের কথা মাথায় রেখে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তির দিকটাও এই সময়ে বোঝা জরুরি। সাজেকের এই অচলাবস্থা কবে কাটবে, তা এখন নির্ভর করছে মূল দাবি নিয়ে সমঝোতা হয় কি না, তার ওপর। পরের আপডেট এলে বিনোদন ঝলক সেটা জানিয়ে দেবে।
