সাজেকের বাসিন্দা ও স্থানীয় সংগঠনগুলো ২২ অক্টোবরের ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। সোমবার দেওয়া ওই স্মারকলিপিতে ওই ঘটনার জন্য দায়ীদের শাস্তি, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়েছে। ঢাকা ট্রিবিউনের ২৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে এই স্মারকলিপির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। স্মারকলিপিটি দিয়েছে সাজেক পাবলিক রাইটস প্রোটেকশন কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন।
স্মারকলিপিতে আরও দাবি জানানো হয়েছে, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে। স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন সাজেক পাবলিক রাইটস প্রোটেকশন কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা, সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা, ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদের উষাতন চাকমা, সাজেক পাবলিক রাইটস প্রোটেকশন কমিটির জিকো চাকমা এবং সাজেক মহিলা সমিতির সাধনা দেবী চাকমা। অর্থাৎ এটি কোনো একক ব্যক্তির বক্তব্য নয়, স্থানীয় কয়েকটি সংগঠনের যৌথ দাবি হিসেবে সরকারের কাছে পৌঁছেছে।
স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ওই সশস্ত্র গোষ্ঠী এলাকার বাসিন্দাদের ভয় দেখাচ্ছে, নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে এবং জুম চাষিদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে, যার ফলে বেশ কয়েকটি গ্রামে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গোষ্ঠীটি ৩১ আগস্ট থেকে এলাকায় সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু করে। প্রতি একর জুম জমির জন্য ১ হাজার টাকা দাবি করা, ধান ভাঙানোর মেশিন, হলুদ গুঁড়ো করার মেশিন এবং ইঞ্জিনচালিত নৌকার মালিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও স্মারকলিপিতে তোলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, গুলিতে ৯ বছর বয়সী কসমিতা ত্রিপুরা নামের এক শিশু আহত হয়েছে। এগুলো স্মারকলিপিতে তোলা অভিযোগ হিসেবেই পড়তে হবে, কারণ ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে এগুলো স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা বারবার স্থানীয় সামরিক প্রশাসনকে ওই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন, কিন্তু কার্যকর কোনো সাড়া পাননি। এরপর তারা ১১ অক্টোবর অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ শুরু করেন। সেনাবাহিনী অতিরিক্ত সময় চাওয়ার পর অবরোধ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরে ১৫ অক্টোবর অবরোধ আবার শুরু হয়, দুর্গাপূজার সময় তা স্থগিত রাখা হয় এবং ২২ অক্টোবর আবার চালু করা হয়। এই টাইমলাইন থেকে বোঝা যায়, সাজেকের অচলাবস্থা হঠাৎ এক দিনের ঘটনা নয়, বরং কয়েক সপ্তাহ ধরে ধাপে ধাপে তৈরি হওয়া সংকটেরই ধারাবাহিকতা।
স্মারকলিপিতে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি ২২ অক্টোবরকে ঘিরে। অভিযোগে বলা হয়েছে, আটকে পড়া পর্যটকদের যেতে দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিনা উসকানিতে লাঠিচার্জ করেন। এরপর সেনা সদস্যরা গুলি চালান, উজোপাজারে দোকান ও বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করেন এবং বেশ কয়েকজনকে আহত করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে, পরে সেনা ও পুলিশ সদস্যরা অবরোধে অংশ নেওয়ার কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থী ঝর্ণা চাকমাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেন। এই অভিযোগগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাই এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়, স্মারকলিপিতে তোলা দাবি ও অভিযোগ হিসেবেই বোঝা জরুরি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা মনে রাখতে হবে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ বা অভিযুক্ত গোষ্ঠীর কোনো বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ পাঠকের সামনে এখন পর্যন্ত আছে এক পক্ষের লিখিত দাবি, অন্য পক্ষের জবাব এখনো এই প্রতিবেদনে নেই। ঠিক এই কারণেই স্মারকলিপিতে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিটি আলাদা গুরুত্ব পায়। একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হলে ২২ অক্টোবর আসলে কী ঘটেছিল, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন এবং দায় কার, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মিলতে পারে। তদন্ত ছাড়া অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই আটকে থাকবে সাজেকের এই বিতর্ক।
পর্যটকদের দিক থেকে এই খবরটির মানে খুবই সরাসরি। সাজেক বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পাহাড়ি গন্তব্য, আর শীতের মৌসুম সামনে। কিন্তু এই প্রতিবেদন থেকে অবরোধ প্রত্যাহার হয়েছে বা সাজেক পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তাই সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে আগের বুকিং, হোটেল বা রিসোর্ট এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যাত্রার আগে অবশ্যই বর্তমান অবস্থা যাচাই করে নেওয়া উচিত। সড়কে চলাচল, থাকার ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে রওনা দেওয়া ঠিক হবে না। যাদের বুকিং ইতিমধ্যে আছে, তাদের উচিত সংশ্লিষ্ট হোটেল বা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাতিল বা তারিখ বদলের নীতি জেনে নেওয়া।
এরপর কী হতে পারে, সেটা এখন নির্ভর করছে সরকারের সাড়ার ওপর। স্মারকলিপির দাবিগুলো মানা হবে কি না, নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না, ক্ষতিপূরণ ও মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। একই সঙ্গে অবরোধের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটাও এই প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। নতুন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত, তদন্ত ঘোষণা বা অবরোধ সংক্রান্ত আপডেট এলে সেটাই হবে সাজেক নিয়ে পরের গুরুত্বপূর্ণ খবর। ততক্ষণ পর্যন্ত সাজেক নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনুমোদিত সংবাদমাধ্যমের নতুন প্রতিবেদন এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যই ভরসা।
