বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

সেন্টমার্টিনে রাতযাপন নিয়ে বিভ্রান্তি কাটল: ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পুরো মৌসুমেই থাকা যাবে

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৭ অক্টোবর ২০২৬5 মিনিটে পড়ুন
সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমণ নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

সেন্টমার্টিন ভ্রমণ নিয়ে গত কয়েক দিনের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তিটা অবশেষে কাটল। ২৭ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত নির্দেশনায় পরিষ্কার করা হয়েছে, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত পুরো সময়ই পর্যটকেরা সেন্টমার্টিনে যাতায়াতের পাশাপাশি রাতযাপনও করতে পারবেন। অর্থাৎ নভেম্বর মাসে শুধু দিনের বেলায় গিয়ে সেদিনই ফিরে আসতে হবে, এমন নিয়ম আর থাকছে না। একইভাবে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, সেটাও দূর হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, নভেম্বর ও ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে দ্বীপে থাকা নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, সেখানে সংশোধন আনা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এখন পুরো সময়ই পর্যটকেরা দ্বীপে থাকতে পারবেন। এই একটি বাক্যই আসলে এ মৌসুমের ভ্রমণ পরিকল্পনা বদলে দিয়েছে, কারণ এতদিন অনেকেই নভেম্বরের টিকিট আর হোটেল বুকিং নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন।

বিভ্রান্তিটা কোথা থেকে এসেছিল, সেটা বুঝতে হলে পেছনের কয়েকটা তারিখ মনে রাখতে হবে। গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত নিয়ে একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ২৫ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনায় ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা বহাল রাখা হয়েছিল।

ওই পুরোনো প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নভেম্বর মাসে পর্যটকেরা শুধু দিনের বেলায় সেন্টমার্টিনে যেতে পারবেন, একই দিন ফিরে আসতে হবে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে দ্বীপে রাতযাপনের সুযোগ থাকবে। ফলে এবার পর্যটকদের যাতায়াতের সময়সীমা বাড়লেও রাতযাপনের ক্ষেত্রে গত বছরের নিয়মই বহাল থাকছে বলে ধারণা তৈরি হয়। এই ধারণা থেকেই পর্যটক, হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিক এবং জাহাজমালিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। প্রথম আলোয় খবর প্রকাশের পর রাতযাপনের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা তৈরি হয়। তারপরই ২৭ অক্টোবর সংশোধিত সিদ্ধান্ত আসে।

নতুন সিদ্ধান্তে যা বদলায়নি, সেটাও জানা জরুরি। এবার দ্বীপে পর্যটক যাওয়ার দৈনিক সর্বোচ্চ সীমা সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের ঘাট থেকে আগের মতোই পর্যটকবাহী জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। অর্থাৎ যাত্রার পথ আর দৈনিক সীমা নিয়ে নতুন করে কোনো বদল আসেনি, বদল এসেছে শুধু রাতযাপনের অনুমতিতে।

এবারও সেন্টমার্টিনে যেতে পর্যটকদের ট্রাভেল পাস নিতে হবে। গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, গতবারের মতো এবারও ট্রাভেল পাস নিয়ে পর্যটকদের দ্বীপে যেতে হবে এবং এ বিষয়ে কারিগরি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাই যাঁরা ১ নভেম্বরের আশপাশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো যাত্রার আগে ট্রাভেল পাসের হালনাগাদ অবস্থা জেনে নেওয়া। পাস ছাড়া যাত্রা শুরু করলে ঘাটে গিয়ে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

পরিবেশ রক্ষার পুরোনো বিধিনিষেধগুলোও মনে রাখতে হবে, কারণ রাতযাপনের অনুমতি মানেই দ্বীপে যা খুশি করা যাবে, তা নয়। গত বছরের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, রাতে সমুদ্রসৈকত ও তৎসংলগ্ন এলাকায় আলো জ্বালানো যাবে না। শব্দ সৃষ্টি করা ও বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে না। কেয়াবনে প্রবেশ এবং কেয়া ফল সংগ্রহ, ক্রয় ও বিক্রয় নিষিদ্ধ। সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সমুদ্রসৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকের মতো যানবাহন চালানোও নিষিদ্ধ।

এই নিয়মগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা কঠিন নয়। সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এখানকার প্রবাল, কাছিম, পাখি আর সমুদ্রঘাসের ওপরই দ্বীপের সৌন্দর্য টিকে আছে। রাতের আলো আর শব্দ কাছিমের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, কেয়াবন নষ্ট হলে দ্বীপের প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমে যায়। তাই রাতযাপনের সুযোগ পেলেও পর্যটকদের দায়িত্ব আসলে বেড়েছে, কমেনি। হোটেল বেছে নেওয়ার সময়ও পরিবেশবান্ধব আচরণ করে এমন জায়গাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো।

বাস্তব পরিকল্পনার দিক থেকে এই সিদ্ধান্তের অর্থ বেশ পরিষ্কার। নভেম্বরে যাঁরা দিনের ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁরা এখন চাইলে এক রাত বা বেশি দিন থেকে ধীরে দ্বীপ ঘুরতে পারবেন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারির ভিড়ের চাপে যাঁরা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য নভেম্বর বা ফেব্রুয়ারি ও মার্চের শুরু এখন আরও আকর্ষণীয় বিকল্প হতে পারে। তবে দৈনিক সাড়ে তিন হাজারের সীমা মনে রাখতে হবে। এই সীমার কারণে ছুটির দিনগুলোতে জাহাজ আর থাকার জায়গা আগেভাগে শেষ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক।

খরচের হিসাব করার সময়ও সতর্ক থাকা ভালো। এই সংশোধিত সিদ্ধান্তের খবরে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি ১০০ টাকার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু জাহাজের টিকিট বা হোটেলের ভাড়া নিয়ে কোনো নতুন অঙ্ক এখানে দেওয়া হয়নি। মৌসুমভেদে জাহাজ ও হোটেলের দাম বদলায়, ছুটির দিনে চাপ বাড়লে দামও বাড়তে পারে। তাই বুকিংয়ের আগে সংশ্লিষ্ট জাহাজ সংস্থা আর হোটেল থেকে হালনাগাদ দাম জেনে নেওয়াই নিরাপদ। এই লেখায় কোনো টিকিট বা হোটেলের দাম ধরে নেওয়া হয়নি, যাতে পাঠক ভুল তথ্য নিয়ে যাত্রা শুরু না করেন।

আগের নির্দেশনা আর এই সংশোধনীকে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়। সেন্টমার্টিন নিয়ে আমাদের সাইটের আগের গাইডে নভেম্বরে শুধু দিনের ভ্রমণের কথা বলা হয়েছিল, কারণ সেটাই তখনকার নির্দেশনা ছিল। ২৭ অক্টোবরের সংশোধনীর পর সেই অংশটি আর কার্যকর নয়। নতুন তথ্য হলো, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পুরো সময়ই রাতযাপন করা যাবে। পুরোনো গাইড পড়ে কেউ যদি এখনো নভেম্বরে ফিরে আসার পরিকল্পনা করেন, তাহলে তিনি অযথা নিজের ভ্রমণ ছোট করবেন।

শেষ কথা হলো, সিদ্ধান্ত এসেছে, কিন্তু ভ্রমণের আগে যাচাইয়ের দায়িত্ব থেকে যায়। ট্রাভেল পাসের কারিগরি প্রস্তুতি, জাহাজের সময়সূচি আর থাকার ব্যবস্থা যাত্রার কয়েক দিন আগে আবার মিলিয়ে নেওয়া উচিত। সরকারি নির্দেশনা বদলাতে পারে, আবহাওয়াও যাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়ম মেনে, পরিবেশের ক্ষতি না করে আর স্থানীয় মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ঘুরলে সেন্টমার্টিনের এই মৌসুমটা সবার জন্যই সুন্দর হবে।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার