বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

ষষ্ঠ দিনেও অবরুদ্ধ সাজেক: আলোচনা ব্যর্থ, ৪ দাবিতে সমঝোতা হলেও মূল দাবিতে আটকে, পর্যটকদের কী করণীয়

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৭ অক্টোবর ২০২৬4 মিনিটে পড়ুন
ষষ্ঠ দিনে অবরুদ্ধ সাজেকের খবরের গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ষষ্ঠ দিনের মতো রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্রের সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। গত ২২ অক্টোবর থেকে তৃতীয় দফায় এই কর্মসূচি পালন করছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। সংকট নিরসনে প্রশাসনের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দীর্ঘ বৈঠক হলেও অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে সমঝোতা হয়নি, আর দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

মঙ্গলবার সকালে সাজেক সড়কে অবরোধের সমর্থনে কোনো পিকেটারকে অবস্থান করতে দেখা যায়নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি ছিল। নিরাপত্তার কারণে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পর্যটকদের যাতায়াত ও পর্যটননির্ভর ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ রাস্তায় সেদিন পিকেটিং চোখে না পড়লেও সাজেক এখনো পর্যটকদের জন্য খোলেনি, এই পার্থক্যটা বুঝে রাখা জরুরি।

সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল সোমবার, ২৬ অক্টোবর। সেদিন বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা পৌনে ৬টা পর্যন্ত সাজেক ইউনিয়নের উজোবাজারে প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর নেতাদের বৈঠক হয়। বৈঠকের পর খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, পাঁচ দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু তাতেও অবরোধ ওঠেনি, কারণ পঞ্চম ও প্রধান দাবিটাই অমীমাংসিত থেকে গেছে।

প্রধান দাবিটি হলো সাজেক এলাকা থেকে জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া। এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহারের পথ তৈরি হয়নি। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য স্পষ্ট, মূল দাবিতে নিশ্চিত আশ্বাস না মিললে শুধু বাকি দাবিতে সমঝোতা দিয়ে কর্মসূচি থামবে না। এখানেই আটকে আছে পুরো আলোচনা।

সোমবার রাতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচারে আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা বৈঠকের ভেতরের হিসাবটা জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার প্রধান দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে নির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে পারেনি। এ দাবি পূরণে সরকার প্রথমে এক মাস সময় চাইলেও আন্দোলনকারীরা তিন দিন সময় দিতে রাজি ছিলেন। পরে সরকার ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চাইলে আন্দোলনকারীরা আরও পাঁচ দিন অপেক্ষা করতে সম্মত হন। কিন্তু প্রধান দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে নিশ্চিত আশ্বাস না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সরকার আবার আলোচনায় বসতে চাইলে তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

আন্দোলনকারীদের পাঁচ দাবির মধ্যে রয়েছে ২২ অক্টোবর অবরোধ চলাকালে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত, উজোবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ এবং সেখান থেকে সেনা ও পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার, হামলায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ, সাজেক থেকে সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া এবং চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধে ব্যবস্থা, পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার, হয়রানি ও বাড়িঘর এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি বন্ধ করা। এই তালিকা থেকেই বোঝা যায়, আন্দোলনটা শুধু একটা ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা আর দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

এই সংকটের শুরুটা আরও আগের। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন গত ১১ অক্টোবর থেকে আন্দোলন শুরু করে। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত রাখার পর দাবি আদায় না হওয়ায় সংগঠন দুটি ২২ অক্টোবর থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। অর্থাৎ ষষ্ঠ দিনের এই অবরোধ হঠাৎ শুরু হওয়া কোনো কর্মসূচি নয়, প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলা একটা টানাপোড়েনের নতুন অধ্যায়।

গত বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, রাঙামাটির সাজেক পর্যটন সড়কে স্থানীয় দুটি সংগঠনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অবরোধকারী এবং দুই সংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। অবরোধের কারণে সাজেক ভ্যালিতে প্রায় ২,৯৩৩ জন পর্যটক আটকা পড়েন। বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সাজেক থেকে পর্যটকদের গাড়ি বহরকে নিরাপত্তা দিয়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে নিয়ে রওনা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পর্যটক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কনভয়টি সাজেকের উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে আন্দোলনকারী ও পিকেটাররা সড়কে ব্যারিকেড ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে তাদের পথরোধ করে। দীর্ঘ সময় আলোচনার পরও অবরোধকারীরা পথ ছাড়তে রাজি না হওয়ায় উত্তেজনা তৈরি হয়।

পর্যটকদের জন্য আজকের বার্তাটা পরিষ্কার। সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ, সড়কে যাতায়াত বন্ধ, আর অবরোধ প্রত্যাহারের কোনো ঘোষণা আসেনি। তাই সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে রওনা দেওয়ার আগে সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। হোটেল বা রিসোর্টে বুকিং থাকলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুকিং স্থগিত বা পরিবর্তনের সুযোগ আছে কিনা জেনে নিন, আর ট্যুর অপারেটরের কাছ থেকে লিখিতভাবে সর্বশেষ তথ্য চেয়ে নিন। শীতের মৌসুমের মুখে সাজেকের এই অচলাবস্থা পর্যটন ব্যবসায়ীদের জন্যও বড় ধাক্কা, কারণ এই সময়টাতেই পাহাড়ে পর্যটকের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে।

এরপর কী হবে, তা নির্ভর করছে পরের বৈঠকের ওপর। সরকার ৫ নভেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছে, আন্দোলনকারীরা আরও পাঁচ দিন অপেক্ষায় সম্মত হয়েছেন, কিন্তু মূল দাবিতে নিশ্চিত আশ্বাস ছাড়া অবরোধ উঠছে না। সরকার আবার আলোচনায় বসতে চাইলে আন্দোলনকারীরা প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন, ফলে যেকোনো দিন নতুন বৈঠকের খবর আসতে পারে। তবে আজকের অবস্থা বদলায়নি, সাজেক এখনো অবরুদ্ধ। তাই সাজেক খুলেছে বা অবরোধ শেষ, এমন কোনো খবর যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করবেন না, পরের আপডেটের জন্য চোখ রাখুন।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার