বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

সাজেক আন্দোলনে পাঁচ দফা দাবি, অস্ত্র হাতে মহড়ার ভিডিও ভাইরাল: সমন্বয় সভায় মধ্যস্থতার প্রস্তাব

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৫ অক্টোবর ২০২৬6 মিনিটে পড়ুন
সাজেক ভ্যালিতে সূর্যোদয়
সাজেক ভ্যালি: পর্যটনকেন্দ্র এখনো বন্ধ, সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে (ফাইল ছবি) (ছবি: Rocky Masum, CC BY-SA 4.0)

সাজেককে ঘিরে অস্থিরতা কাটেনি, বরং আন্দোলনের পরিধি আরও বড় হয়েছে। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক পর্যটনকেন্দ্রের সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় অর্ধবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ। আন্দোলনকারীরা এবার আগের তিন দফার জায়গায় পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে অস্ত্র হাতে মোটরসাইকেলে মহড়া দেওয়ার একটি ড্রোন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শনিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ পালন করে ইউপিডিএফ সমর্থিত ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। তাদের ভাষ্য, ২২ অক্টোবর সাজেকে অবরোধ চলাকালে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং বাড়িঘর ও দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদেই এই কর্মসূচি। অবরোধ চলাকালে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল জোরদার করা হয়।

অবরোধের প্রভাব পড়ে দূরপাল্লার যাত্রীদের ওপর। শনিবার সকাল থেকে খাগড়াছড়ির সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলায়ও সড়কে যানবাহন কম চলেছে। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের ফায়ার সার্ভিস এলাকায় টায়ারে আগুন দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন পিকেটাররা, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে তারা দৌড়ে পালিয়ে যান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এছাড়া খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কের বাইল্ল্যাছড়ি, পানছড়ি সড়ক এবং সাজেক সড়কের বিভিন্ন স্থানে কাঠের গুঁড়ি ও টায়ারে আগুন দেওয়া হয়।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা একটি ড্রোন ভিডিওকে ঘিরে। সেনাবাহিনীর মাটিরাঙা জোনের ড্রোন ভিডিওতে দেখা যায়, সড়কের ওপর আগুন জ্বলছে, আর আগুনের পাশ দিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে এক ব্যক্তি মোটরসাইকেলে টহল দিচ্ছেন। তার সঙ্গে থাকা দুটি মোটরসাইকেলে আরও কয়েকজন ছিলেন। ড্রোনের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা গ্রামের ভেতরে ঢুকে যান। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অস্ত্র হাতে থাকা ওই ব্যক্তির নাম ও পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করছে।

অবরোধে আটকে পড়া মানুষের ভোগান্তির চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ঢাকা থেকে আসা ব্যবসায়ী মো. বায়েজিদ মাগুরা থেকে মারিশ্যা যাচ্ছিলেন, কিন্তু অবরোধের কারণে ৫০ কিলোমিটার পথ কীভাবে যাবেন, তা নিয়ে চরম ঝামেলায় পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দা গণেশ ত্রিপুরা মাটিরাঙা যেতে চেয়েও কোনো গাড়ি পাননি। তিনি জানিয়েছেন, তারা এ ধরনের অবরোধ চান না, শান্তি চান। আর পর্যটক দেওয়ান ঐশী মূলত সাজেক যাওয়ার জন্য বুধবার খাগড়াছড়ি শহরে এসেছিলেন, সাজেক বন্ধ থাকায় রাঙামাটি শহরে পৌঁছেও আবার খাগড়াছড়ি ফিরে এসেছেন। তিন দিন ধরে আটকে থাকার পর তিনি জানিয়েছেন, অবরোধ শেষ হলে ঢাকায় চলে যাবেন।

তবে অর্ধবেলা অবরোধ শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়ি, শববাহী যানবাহন, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত ছিল। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে এবং রাঙামাটি থেকে নৌপথসংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে যাত্রীবাহী লঞ্চসহ সব ধরনের যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করেছে।

এদিকে সাজেকের সড়ক অবরোধের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। শনিবার ছিল কর্মসূচির তৃতীয় দিন, সকাল থেকে মাচালং, শুকনাছড়িসহ সাজেকের বিভিন্ন স্থানে অবরোধের সমর্থনে পিকেটিং করা হয়। সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ২২ অক্টোবর থেকে সড়কটিতে অনির্দিষ্টকালের এই অবরোধ পালন করছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানিয়েছেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকবে। ফলে ওই সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চলছে না, আর সাজেক এখনো পর্যটকশূন্য।

দাবি প্রসঙ্গে আন্দোলনকারীরা এখন পাঁচ দফার কথা বলছেন। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে এলাকা থেকে সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া, সাধারণ মানুষকে হুমকি বন্ধ করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা এবং ঘরবাড়িতে তল্লাশি ও হয়রানি বন্ধ করা। সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা জানিয়েছেন, দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। তাদের ভাষ্য, এর আগে গত ১১ ও ১৫ অক্টোবর অবরোধ করা হলেও প্রশাসনের আশ্বাসে এবং দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে সাময়িক স্থগিত রাখা হয়েছিল, কিন্তু দাবি পূরণ না হওয়ায় ২২ অক্টোবর থেকে তারা পুনরায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করেন।

ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ঊষাতন চাকমা জানিয়েছেন, ২২ অক্টোবর সাজেকে শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল, যা নির্ধারিত সময়ে শান্তিপূর্ণ ও সর্বাত্মকভাবে পালিত হয়েছে। তার দাবি, সাজেকের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন আন্দোলনরত জনগণের দাবি মেনে নিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি, আর এই ব্যর্থতা ঢাকতে ২২ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে শান্তিপূর্ণ অবরোধ পালনকারী জনগণের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেছেন, ওই হামলায় অন্তত ৭৮ জন নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধ আহত হয়েছেন। এই অভিযোগগুলো আন্দোলনকারীদের ভাষ্য হিসেবে এসেছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্যও রয়েছে।

রাঙামাটির কোতোয়ালি থানার ওসি জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন স্থানে পুলিশি টহল জোরদার ছিল, অবরোধের কারণে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। খাগড়াছড়ি সড়ক ছাড়া জেলার অন্য সব রুটে সড়ক ও নৌপথে যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করেছে।

অবরোধের আঁচ এখন পাহাড়ের জনজীবনেও পড়ছে। নিরাপত্তা সংকট ও আতঙ্কে সাজেকের গঙ্গারাম এলাকার অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ভরমৌসুমে বন্ধ রয়েছে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র, ধস নেমেছে পর্যটননির্ভর ব্যবসায়, অর্থনৈতিক সংকটও তীব্র হয়ে উঠছে। পর্যটনসংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দ্রুত অবরোধ প্রত্যাহার ও সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া ২২ অক্টোবর সাজেকের গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় অবরোধ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে, আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি হয়। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।

আন্দোলনের সমর্থনে শনিবার সন্ধ্যায় বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলীতে মশাল মিছিল করেছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। মিছিলের পর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন যুব প্রতিনিধি রত্ন জ্যোতি চাকমা ও সমাজসেবক লক্ষ্মী চাকমা। আর সাজেক সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করা ও এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শনিবার বেলা ১১টায় খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের সম্মেলন কক্ষে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, বেসামরিক প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং সাজেকের পর্যটনসংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সমন্বয় সভায় প্রস্তাব অনুযায়ী, সংকট নিরসনে স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং বেসামরিক প্রশাসনের মাধ্যমে অবরোধকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের লক্ষ্যে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির নিরাপত্তা বাহিনী, জেলা পরিষদ এবং বেসামরিক প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ মধ্যস্থতাকারী দল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার নেতৃত্বে থাকবেন সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া।

পর্যটকদের জন্য বার্তাটা এখনো একই: সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ, সাজেক সড়কে সাধারণ যান চলাচল নেই, আগের সব বুকিং বাতিলের পরিস্থিতি বহাল। সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে যাত্রার আগে জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি। এরপর কী হবে, তা নির্ভর করছে মধ্যস্থতা উদ্যোগের ফলাফলের ওপর: আলোচনা শুরু হলে অবরোধ উঠতে পারে, না হলে পাহাড়ের এই অস্থিরতা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার