শনিবার দুপুরে রাঙামাটির সাজেকের দুর্গম পাহাড়ে আবার গুলির শব্দ শোনা গেছে। বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের মাচলং এলাকার কলাবুনিয়া ও কজোইছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যদের মধ্যে থেমে থেমে গোলাগুলি হয়েছে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘর্ষে আশপাশের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত হতাহতের কোনো নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি।
গোলাগুলি কখন শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে সূত্রগুলোর সময়ে সামান্য পার্থক্য আছে। কোনো প্রতিবেদনে দুপুর সাড়ে ১২টা, কোনোটিতে পৌনে ১টা, আবার কোনোটিতে দুপুর ১টার কথা বলা হয়েছে। সব সূত্র একমত যে ঘটনাটি শনিবার দুপুরের দিকে শুরু হয় এবং দফায় দফায় চলে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা গেছে, বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্তও সংঘর্ষ চলছিল। এলাকাটি এতটাই দুর্গম যে ঘটনার পরপরই সেখানে পৌঁছাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, কলাবুনিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যে গোলাগুলির খবর পেয়েছেন তারা। তবে দুর্গম এলাকা হওয়ায় পুলিশের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পুলিশ ও যৌথ নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং দূর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিবও দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির খবর পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে তার বক্তব্যে একটি সতর্কতা আছে: কাদের মধ্যে এই গোলাগুলি হচ্ছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে তিনি জানিয়েছেন। অর্থাৎ ঘটনা ঘটেছে, এটা পুলিশ নিশ্চিত করছে, কিন্তু দুর্গম এলাকা থেকে পুরো তথ্য এখনো আসেনি। এই কারণেই হতাহতের বিষয়েও কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি। দুই সংগঠনের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই সংঘর্ষের পেছনে আছে পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। জেএসএসের সন্তু লারমা গ্রুপ ও ইউপিডিএফের প্রসীত খীসা গ্রুপের মধ্যে সাজেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা চলছে অনেকদিন ধরেই। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের অভিযোগ, সন্তু লারমা সমর্থিত জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা সাজেকের বিভিন্ন গ্রামে অবস্থান নিয়ে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছেন। অন্যদিকে জেএসএসের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সদস্যদের দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও হয়রানির বিষয়টি আড়াল করতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
এই বিরোধের জেরেই সাজেক সড়কে এখন তৃতীয় দফার অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলছে। গত ২২ অক্টোবর থেকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে এই অবরোধ শুরু হয়। শনিবার ছিল অবরোধের দশম দিন। অবরোধের কারণে সাজেকের সঙ্গে বাঘাইছড়ি ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন। পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচল বন্ধ, স্থানীয় বাসিন্দাদের খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহেও ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ীরাও চরম ক্ষতির মুখে।
অবরোধের ইতিহাসটা সংক্ষেপে এরকম: গত ১১ অক্টোবর প্রথম দফায় অবরোধ শুরু হলে প্রায় দেড় হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফা শুরু হয়, দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর তা স্থগিত ছিল। বিরতি শেষে ২২ অক্টোবর থেকে শুরু হয় তৃতীয় দফার অনির্দিষ্টকালের অবরোধ। সেদিনই সাজেক পর্যটন ভ্যালি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় রাঙামাটি জেলা প্রশাসন।
গত ২৬ অক্টোবর উজোবাজারে সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠক হয়। সেখানে পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে সমাধান হয়নি। ফলে অবরোধ প্রত্যাহার করেনি সংগঠন দুটি। এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর সাজেকের চাইল্যাতলী এলাকায় একই ধরনের গোলাগুলিতে সঞ্জিতা ত্রিপুরা নামে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। সে ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে, মামলাটি এখনো তদন্তাধীন।
এই পরিস্থিতিতেই রবিবার, ১ নভেম্বর সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার জন্য অবরোধ শিথিলের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। শুক্রবার রাতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা ও কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে এই ঘোষণা দেন। তাদের ভাষ্য, সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা, অর্থাৎ খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে এক দিনের জন্য এই শিথিলতা। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের কঠিন চীবর দানোৎসব নির্বিঘ্নে পালনের জন্য ভিক্ষুদের চলাচলেও আলোচনা সাপেক্ষে বিশেষ ছাড়ের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এই ১২ ঘণ্টার শিথিলতাকে সাজেক খুলে যাওয়া ভাবলে ভুল হবে। বিজ্ঞপ্তিতেই স্পষ্ট বলা আছে, রবিবারের পর থেকে, অর্থাৎ ২ নভেম্বর থেকে পূর্বঘোষিত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ আবার চলবে। আর শনিবার দুপুরের গোলাগুলির পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। তাই যারা ১ নভেম্বর বা তার পর সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য বার্তাটা পরিষ্কার: রওনা দেওয়ার আগে অবশ্যই স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নিন। পর্যটন ভ্যালি বন্ধের নির্দেশনা বহাল আছে কিনা, সড়কে যান চলাচল আসলেই স্বাভাবিক হয়েছে কিনা, তা যাচাই না করে যাত্রা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
এরপর কী হবে, তা নির্ভর করছে দুটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, পুলিশ ও যৌথ বাহিনী কলাবুনিয়ায় পৌঁছে হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির আসল চিত্র জানাতে পারবে কিনা। দ্বিতীয়ত, ১ নভেম্বরের ১২ ঘণ্টার শিথিলতা শান্তিপূর্ণভাবে কাটে কিনা এবং ২ নভেম্বর থেকে আবার শুরু হওয়া অবরোধ নিয়ে নতুন করে কোনো আলোচনা হয় কিনা। নতুন তথ্য এলেই এই খবর আপডেট করা হবে।
