সাজেকের সড়ক অবরোধ আজ, বৃহস্পতিবার ২৯ অক্টোবর, অষ্টম দিনে পড়ল। ২২ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের এই অবরোধের কারণে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ, আর এখন তার প্রভাব স্পষ্টভাবে পড়েছে পাশের জেলা খাগড়াছড়িতেও। যুগান্তরের আজকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাজেককে কেন্দ্র করে আসা পর্যটকরা খাগড়াছড়িতেও ঘুরতেন, আর খাগড়াছড়ি থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে পর্যটকরা সাজেকে যেতেন। সেই চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবহণ শ্রমিক, হোটেল মোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিপাকে পড়েছেন।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লেগেছে পরিবহণ শ্রমিকদের ওপর। পার্বত্য যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা জানিয়েছেন, সাজেকে পরিবহণ বন্ধ হওয়ার কারণে প্রায় তিন হাজার গাড়িচালক ও তাঁদের সহকারী বেকার আছেন। তাঁর ভাষায়, গাড়িগুলো এখনো বসা, আর চলাফেরায় খুবই কষ্ট হচ্ছে। প্রশাসনের কাছে তাঁর অনুরোধ, সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া হোক, যাতে পর্যটকরা নিরাপদে ঘুরে ফিরে আসতে পারেন।
সংখ্যাগুলো দেখলেই বোঝা যায় কেন এই সংকট এত গভীর। খাগড়াছড়ির সাজেক কাউন্টারের ব্যবস্থাপক আরিফ উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রতিদিন তাঁদের কাউন্টার থেকে অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ সাজেকের উদ্দেশে ছাড়ত। কিন্তু অবরোধ শুরু হওয়ার পর ২২ অক্টোবর থেকে কোনো পরিবহণ সাজেকের উদ্দেশে ছাড়েনি। খাগড়াছড়ির পিকআপচালক প্রদীপ ত্রিপুরা জানিয়েছেন, পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ পিকআপ সাজেক যাতায়াত করত, আর মৌসুমের আগে অনেকে ঋণ করে কিস্তিতে গাড়ি কিনেছিলেন। তাঁদের ভাষায়, সাত দিন ধরে গাড়ির চাকা ঘুরছে না, চালক ও সহকারীরা এখন দিশেহারা।
খাগড়াছড়ি সাজেক সড়কের মাহেন্দ্রচালক মনসুর আলী জানিয়েছেন, খাগড়াছড়িতে ৪৫০টি মাহেন্দ্র আছে, আর সাত দিন ধরে কোনো আয় নেই। সারা দিনে উপজেলাগুলোতে একটা ট্রিপ মারতে পারলেও জ্বালানি তেলের খরচ ওঠে না। সাজেক রোডের সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক হারুনের কথায় সংকটের আরেকটা দিক ধরা পড়ে: কিস্তি আছে, ধারদেনা আছে, গাড়ি চালিয়েই ভাত খেতে হয়, কিন্তু গাড়িগুলো বন্ধ। সারা বছর এই সময়ে পর্যটক বাড়বে বলে আশা করেন তাঁরা, আর এখন চান সমস্যার সমাধান হোক। মালিকদের বিকল্প আয়ের উৎস থাকলেও শ্রমিকরা আয়শূন্য হয়ে দিশেহারা, এই পার্থক্যটাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বুধবার সরেজমিনে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক, আলুটিলা পর্যটনকেন্দ্র, রিছাং ঝরনা ও মায়াবিনী লেকসহ জেলার বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, পর্যটকদের আনাগোনা নেই। অর্থাৎ শুধু সাজেক নয়, সাজেকে যেতে না পারার আশঙ্কায় অনেকে খাগড়াছড়িতে ভ্রমণও বাতিল করছেন। ফলে সাজেকের পাশাপাশি খাগড়াছড়িও পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। পর্যটন মৌসুমের ঠিক আগে এই চিত্র হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ আর ছোট দোকানগুলোর জন্যও বড় ধাক্কা।
অবরোধ কেন চলছে, সেই পটভূমিটাও আজকের খবরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা এটি তৃতীয় দফার অবরোধ। আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে চারটিতে সমঝোতা হলেও একটি দাবিতে মতপার্থক্য রয়ে গেছে: সাজেক থেকে জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া। এই একটি দাবির মীমাংসা না হওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহারের পথ খুলছে না, আর দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সংগঠন দুটি।
গত কয়েক দিনের চিত্রও একই রকম ছিল। ২৮ অক্টোবর সকালে সাজেক সড়কে কয়েকটি জায়গায় গাছের গুঁড়ি ফেলে আগুন দেওয়া হয়, আর সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব তখন বলেছিলেন, সাজেকের পরিস্থিতি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে, আর সহসাই এর সমাধান হবে। কিন্তু আজ অষ্টম দিন পর্যন্ত অবরোধ উঠে যাওয়ার নতুন খবর পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সাজেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট আর জুমচাষিদের ফসল বাজারে নিতে না পারার ভোগান্তির কথাও উঠে এসেছে, আর রুইলুই পাড়ার দোকানগুলোতে মজুত শেষের পথে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পর্যটকদের জন্য এখনকার বার্তাটা পরিষ্কার: সাজেক এখনো বন্ধ, আর সাজেকের উদ্দেশে কোনো পরিবহণ ছাড়ছে না। তাই সাজেক বা খাগড়াছড়ি ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে যাত্রার আগে হোটেল, পরিবহণ কাউন্টার ও স্থানীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়াই নিরাপদ। অগ্রিম টাকা দেওয়ার আগে বাতিল ও ফেরতের শর্তটাও লিখিতভাবে জেনে নেওয়া ভালো, কারণ অবরোধ কবে উঠবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। নতুন কোনো সমঝোতা বা সড়ক খোলার ঘোষণা এলে সেটাই হবে পরের বড় খবর, আর তখনই আবার সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা করা যাবে নিশ্চিন্তে।
