বৃহস্পতিবারের (২২ অক্টোবর) রক্তক্ষয়ী গোলাগুলির পর রাঙামাটির সাজেক ভ্যালিতে এখনো থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সড়ক অবরোধ কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যদের সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর আট সদস্যসহ উভয়পক্ষের অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন। পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটায় নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, ইটপাটকেলের আঘাতে পাঁচ সেনা সদস্য ও তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তবে আটকে পড়া দুই হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে যৌথ বাহিনীর সহায়তায় নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলাকালে অবরোধকারীরা বাঘাইছড়ি-সাজেক সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের গুঁড়ি ফেলে যান চলাচলে বাধা দেন। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়িতে নেওয়ার পথে উজোবাজার এলাকায় গাড়িবহর আটকে দেন অবরোধকারীরা। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ ও ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়।
পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার পর বেলা ১১টার দিকে একই এলাকায় টহলরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালান বলে জানান পুলিশ সুপার। বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। দুপুর ১টা পর্যন্ত কয়েক দফায় থেমে থেমে গোলাগুলি চলে। একপর্যায়ে সশস্ত্র ব্যক্তিরা পিছু হটলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। হামলার ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তদন্ত শুরু হয়েছে এবং এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান পুলিশ সুপার।
এ ঘটনায় দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানায়, গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয় জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশগ্রহণে বাধ্য করে এবং তাদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ ও পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সকাল ১০টার দিকে অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল তাদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। সকাল পৌনে ১১টার দিকে অবরোধকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরে সকাল ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সেনাবাহিনী পাল্টা গুলি চালালে তারা ঘটনাস্থল থেকে সরে যায়। সেনাবাহিনীর দাবি, এ ধরনের সহিংসতা পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা, পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে সব অভিযোগ একতরফা নয়। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমার দাবি, তাদের শান্তিপূর্ণ অবরোধে পুলিশ ও সেনাবাহিনী বিনা উসকানিতে গুলি, লাঠিচার্জ ও মারধর করেছে। এতে তাদের ৫০ থেকে ৫৫ জন আহত হয়েছেন। অবরোধকারীদের ওপর হামলা এবং সংগঠনটির সদস্য সচিব বিজয় কান্তি চাকমার বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগও তুলেছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটির সভাপতি উষাতন চাকমা বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, সাজেকবাসীর দাবি মেনে চিহ্নিত সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে না দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালানো নিন্দনীয়। তিনি হামলা বন্ধ, আহতদের সুচিকিৎসা এবং সাজেকবাসীর দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির খবর অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ। সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা এক বিবৃতিতে দাবি করেন, তাদের কাছে এমন ঘটনার সত্যতার প্রমাণ নেই। তার অভিযোগ, সাজেক থেকে জেএসএসের সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে চলা অবরোধ বানচাল করতে নিরাপত্তা বাহিনী একতরফা গুলি করেছে। তিনি অবরোধকারীদের ওপর হামলা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের নিন্দা জানান।
এই ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় সড়ক ও নৌপথে আধাবেলা অবরোধের ডাক দিয়েছে। সংগঠনটির ঘোষণা অনুযায়ী, শনিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই অবরোধ চলবে। কর্মসূচি সফল করতে দুই জেলার যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনসহ গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর সহযোগিতা চেয়েছেন সভাপতি উষাতন চাকমা। তবে অ্যাম্বুলেন্স, রোগীবাহী গাড়ি, শববাহী যান, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে।
অবরোধকারীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চিহ্নিত সশস্ত্র সদস্যদের এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। এর আগে ১১ ও ১৫ অক্টোবর একই দাবিতে অবরোধ করা হলেও প্রশাসনের আশ্বাস ও দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে তা সাময়িক স্থগিত রাখা হয়েছিল। দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে বৃহস্পতিবার থেকে আবার অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়, যার জেরে এই সংঘর্ষ।
পর্যটকদের জন্য এখন পরিস্থিতি অনিশ্চিত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের সেখানে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবারের সংঘর্ষের পর সাজেকে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যানবাহন চলছে না, দোকানপাট বন্ধ। স্থানীয়দের অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন। যারা আগামী দিনে সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদের বুকিং বাতিল বা পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
