শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে শেষ দলের পর্যটকরাও সাজেক ছেড়েছেন। প্রথম আলোর ভিডিও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ এসকর্টে আজ সকালে বাকি পর্যটকদের সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে সরিয়ে আনার কাজ চলেছে। এর মধ্য দিয়ে শীত মৌসুমের আগেই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পাহাড়ি গন্তব্যটি কার্যত পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ল। রিসোর্ট ও কটেজ মালিকদের সংগঠন অনির্দিষ্টকালের জন্য সাজেকের সব রিসোর্ট বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। রাঙামাটির জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবৎ, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকবে।
যাঁরা এই শীতেই সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন, তাঁদের প্রশ্ন এখন একটাই: সাজেক কি এখন খোলা, আর পর্যটকরা কবে ফিরতে পারবেন। সোজা উত্তর হলো, এখনই নয়। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীর স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ২১ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ। এই নির্দেশনার আগেই সেখানে থাকা সব পর্যটককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, ফলে নতুন করে কেউ সাজেকে ঢুকতে পারছেন না। শীতের সকালে মেঘের ভেলায় ভাসা সাজেক এখন নীরব।
কীভাবে এ পর্যায়ে এলো সাজেক, তা বুঝতে গত কয়েক সপ্তাহের টাইমলাইন দেখা দরকার। ১১ অক্টোবর সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। তাদের অভিযোগ, পার্বত্য জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু গ্রুপ) সশস্ত্র সদস্যরা সাজেকের মাচলং, থালকুম্ভো, চিল্ল্যাতুলিসহ বিভিন্ন গ্রামে প্রকাশ্যে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে, এতে শতাধিক সাধারণ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। প্রথম দিনেই অবরোধে এক হাজারের বেশি পর্যটক আটকা পড়েন, যাঁদের পরে নিরাপত্তাব্যবস্থায় সরিয়ে নেওয়া হয়।
দুর্গাপূজার কারণে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ কর্মসূচি শিথিল রাখা হয়েছিল। পূজার ছুটিতে সাজেকে ঢল নামে পর্যটকের। বাঘাইহাট ও মাচলং বাজার দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির অনুরোধে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই বিরতি দেওয়া হয় বলে সংগঠন দুটি জানায়। কিন্তু দাবি পূরণ না হওয়ায় ২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় তারা ফের অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। একই সন্ধ্যায় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জেলা প্রশাসন সাজেকে পর্যটক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে সবাইকে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
এরপর ২২ অক্টোবর সকাল থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যায়। সকাল ৬টা থেকে অবরোধকারীরা সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং শুরু করে। সকাল ৯টায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় প্রায় দুই হাজার পর্যটক সাজেক ছাড়েন, কিন্তু আধা ঘণ্টার মধ্যেই বাঘাইছড়ির উজো বাজারে অবরোধকারীদের সামনে পড়ে গাড়িবহর। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অবরোধকারীরা ইটপাটকেল ছোড়ে, পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে। সকাল ১১টার দিকে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে, সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলি ছুড়লে তারা সরে যায়।
গুলি বিনিময়ের মধ্যেই বিকেলের মধ্যে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে দেওয়া হয়। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানান, সব পর্যটক নিরাপদে ফিরেছেন। আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী ঘটনায় কোনো হতাহত হয়নি। সাজেক থানার সহকারী উপপরিদর্শক মো. কাওছার প্রথম আলোকে জানান, উজো বাজারে গাড়ি আটকে দেওয়ার খবর মিলেছে, কিন্তু নেটওয়ার্ক সমস্যায় তাৎক্ষণিক অবস্থা জানা যাচ্ছিল না।
এরপরও থেকে যাওয়া অল্প কিছু পর্যটককে আজ সকালের এসকর্টে বের করে আনা হয়। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা প্রথম আলোর ভিডিও প্রতিবেদনে জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রিসোর্ট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, পূজার ছুটিতে সকাল-বিকেল মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি পর্যটক সাজেকে প্রবেশ করেছিলেন, হঠাৎ বন্ধের কর্মসূচিতে সবাইকে নিরাপদে বের করার বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
ক্ষতির খতিয়ানটা ভয়াবহ। অবরোধের কারণে ছুটি শেষ হওয়ার আগেই পর্যটকরা সাজেক ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মন বলেন, এতে পর্যটক ও ব্যবসায়ী সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আগাম বুকিং বাতিলের ঢল নেমেছে, শীত মৌসুমের সবচেয়ে লাভজনক সময়টা হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। শুধু পর্যটন নয়, পরিবহন বন্ধ থাকায় পাহাড়ের কৃষকরা জুমের ফসল বাজারে নিতে পারছেন না, খাদ্যপণ্য পরিবহনও থমকে গেছে। অবরোধে লুসাই, ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ হাজার মানুষ যাতায়াত ও খাদ্য সংকটের মুখে পড়েছেন বলে জানা গেছে।
ফিরে আসা পর্যটকদের ভোগান্তিও কম নয়। খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে অনেকেই হোটেলের কক্ষ খালি পাননি। ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, 'আমাদের পরিবারের ছোট-বড় মিলিয়ে শুক্রবার পর্যন্ত সাজেকে থাকার কথা ছিল। সে অনুযায়ী শুক্রবার রাতে ঢাকা যাওয়ার টিকিট করেছি। এখন খাগড়াছড়ি এসে শহরের দুইটি ভালো হোটেলে রুম খালি না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কী করব বুঝতে পারছি না।' অনেক পর্যটক খাগড়াছড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, অনেকে এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন।
এই সংকটের মূলে তিন দফা দাবি। আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপের কোম্পানি কমান্ডার চিনু মারমা ও সাইমন চাকমার নেতৃত্বে সাজেকের বিভিন্ন গ্রামে প্রকাশ্যে সশস্ত্র তৎপরতা চলছে। তাদের দাবি, সশস্ত্র সদস্যদের দ্রুত অপসারণ ও পাহাড়ি অধিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে জেএসএস। সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা দাবি করেন, সাজেকে সাধারণ মানুষের ওপর ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের নিপীড়নের ঘটনা ধামাচাপা দিতেই জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।
সাজেক বন্ধের ধাক্কা পড়েছে শীত মৌসুমের পুরো ভ্রমণ-পরিকল্পনায়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে পাহাড় ও সমুদ্র ভ্রমণের সেরা সময়, আর এই সময়ে সাজেক থাকে সবচেয়ে হট গন্তব্য। সোশ্যাল মিডিয়ার ভ্রমণ গ্রুপগুলোতে এখন 'সাজেক কবে খুলবে' প্রশ্নের পাশাপাশি বিকল্প গন্তব্যের আলোচনা তুঙ্গে। অনেকেই কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান বা শ্রীমঙ্গলের দিকে ঝুঁকছেন। ভ্রমণ-বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এই মৌসুমে পাহাড়ি গন্তব্যে যাওয়ার আগে জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা ও স্থানীয় পরিস্থিতি যাচাই করে নেওয়া উচিত, আর রিসোর্ট বুকিংয়ের আগে বাতিল-নীতি জেনে রাখা জরুরি।
সাজেক কবে খুলবে, তার উত্তর এখনো কারো কাছে নেই। জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা 'পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত' বলবৎ, আর রিসোর্ট মালিকদের ঘোষণা অনির্দিষ্টকালের। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে আলোচনার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। আপাতত যাঁদের সাজেকের টিকিট বা বুকিং আছে, তাঁদের উচিত সংশ্লিষ্ট রিসোর্ট ও পরিবহন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে বুকিংয়ের অবস্থা নিশ্চিত করা। সাজেকের সর্বশেষ খবরের দিকে চোখ রাখুন, নতুন নির্দেশনা এলেই জানিয়ে দেওয়া হবে।
