বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাঙামাটির সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় সড়ক অবরোধ ঘিরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যরা পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে। এতে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাজেকে ভ্রমণরত প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। আইএসপিআর জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
অবরোধের পেছনের কারণ সম্পর্কে বাংলা ট্রিবিউন জানিয়েছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক দুই রাজনৈতিক সংগঠনের দ্বন্দ্বের জেরে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন সাজেক সড়কে অবরোধের ডাক দেয়। বৃহস্পতিবার সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় প্রায় তিন হাজার পর্যটক সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা হন। তবে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সাজেক থেকে ছেড়ে আসা পর্যটকবাহী গাড়িগুলো বাঘাইছড়ির উজোবাজার এলাকায় এসে অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়ে। অবরোধকারীরা উজোবাজারে অবস্থান নেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ঘটনার ধারাবাহিকতা ছিল এমন: সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। আলোচনা চলাকালে সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫ মিনিটে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় অবরোধকারীরা হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা নেয়।
এর কিছুক্ষণ পর, বেলা ১১টার দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলি ছুড়লে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। আইএসপিআর আরও জানিয়েছে, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী এই অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
উদ্ধার কার্যক্রমের বিষয়ে আইএসপিআর জানিয়েছে, আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পর্যটকরা নিরাপদে দিঘীনালার কাছাকাছি পৌঁছেছেন। রাঙামাটির পুলিশ সুপার আব্দুর রবিক বলেন, থেমে থেমে গোলাগুলির খবর পেয়েছি। তবে ভ্রমণে যাওয়া পর্যটকরা নিরাপদে সাজেক ছেড়েছে।
তবে সব অভিযোগ একতরফা নয়। জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, এসব ইউপিডিএফের ষড়যন্ত্রমূলক অপপ্রচার। তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সাজেকে ইউপিডিএফ যে তৎপরতা ও জনগণের ওপর শোষণ-পীড়ন চালাচ্ছে, সেখান থেকে নজর সরাতেই তারা এমন কাজ করেছে।
আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের একটি অংশ পর্যটন এলাকায় অবস্থান নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। বিজ্ঞপ্তিতে নিরীহ পর্যটকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা এবং সাধারণ জনগণকে জোরপূর্বক অবরোধ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
যারা সামনে সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ একটি সতর্কবার্তা। ঘটনার দিন সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা এসকর্টে সরিয়ে নিতে হয়েছে। তাই রওনা হওয়ার আগে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির জেলা প্রশাসন এবং পুলিশের সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া, সড়কের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ট্যুর অপারেটর বা হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা, এবং নিরাপত্তা এসকর্টের সময়সূচি নিশ্চিত করা জরুরি। পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে সফর কয়েক দিন পিছিয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মনে রাখতে হবে, সাজেকের পর্যটন পুরোপুরি নির্ভর করে এই একটি পাহাড়ি সড়কের ওপর, তাই অবরোধ বা অস্থিরতার খবর থাকলে ঝুঁকি নেওয়া ঠিক নয়।
আইএসপিআর বলেছে, এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয় জনগণ ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। সাজেকগামী পর্যটকদের জন্য পরিস্থিতির পরবর্তী আপডেটের দিকেই এখন সবার নজর থাকবে।
