দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে সোমবার (২০ অক্টোবর) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে পর্যটন মৌসুম। কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটি থেকে তিনটি যাত্রীবাহী জাহাজে করে প্রথম দিনে দ্বীপে গেছেন ১,১৭৪ জন পর্যটক। সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে পর্যায়ক্রমে জাহাজগুলো কক্সবাজার ছেড়ে যায়; দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে দ্বীপে পৌঁছানোর কথা ছিল।
বাংলাদেশ সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসেন ইসলাম বাহাদুর সাংবাদিকদের জানান, সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলকারী তিনটি জাহাজে করে সকালে ১,১৭৪ জন পর্যটক দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ভোর ৬টা থেকেই জাহাজে পর্যটকদের ওঠা শুরু হয়েছিল।
উদ্বোধনী দিনের আয়োজনে সরকারের ১২ দফা নির্দেশনা পালন নিশ্চিত করতে জেটিতে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা। দ্বীপের পর্যটন পরিচালনায় এই ১২ দফা নির্দেশনাই এবারের মূল কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
এই মৌসুমের সবচেয়ে কঠোর নিয়মটি হলো বাধ্যতামূলক অনলাইন রেজিস্ট্রেশন। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া টিকিট বিক্রির অভিযোগে উদ্বোধনী দিনেই 'কেয়ারি সিন্দাবাদ' নামের জাহাজটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। প্রথম দিনেই এই জরিমানার বার্তা স্পষ্ট: নিয়ম মানার ব্যাপারে প্রশাসন এবার কোনো ছাড় দেবে না।
থাকার নিয়মও এবার স্পষ্ট করে দিয়েছে প্রশাসন। উদ্বোধনী দিন সোমবার থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দ্বীপে রাত্রিযাপনের অনুমতি থাকছে। তবে দৈনিক সর্বোচ্চ ২,০০০ পর্যটকের সীমা বহাল থাকবে। অর্থাৎ শীতের পুরো মৌসুমজুড়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটকই দ্বীপে যেতে পারবেন।
সীমা মানা হচ্ছে কিনা, তা তদারকি করবে জেলা প্রশাসনের গঠিত মনিটরিং কমিটি। কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নীলুফা ইয়াসমিন চৌধুরী, যিনি এই কমিটির আহ্বায়ক, জানিয়েছেন সরকার নির্ধারিত দৈনিক সীমার বেশি পর্যটক যাতে দ্বীপে যেতে না পারেন, সেজন্য কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় এবার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একবার-ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে জাহাজে ওঠার আগে প্রত্যেক পর্যটককে বিনামূল্যে অ্যালুমিনিয়ামের পানির বোতল বিতরণ করা হয়েছে। অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, নুনিয়াছড়া জেটিতেই পর্যটকদের হাতে এই বোতল তুলে দেওয়া হয়।
এই উদ্যোগের পেছনে আছে দ্বীপের সংরক্ষিত মর্যাদা। ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিনকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি দ্বীপসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১,৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। প্রবাল, কচ্ছপ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যাতায়াতের সূচিও জানিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। জাহাজগুলো প্রতিদিন সকাল ৭টায় কক্সবাজার ছেড়ে যাবে এবং পরদিন বিকাল ৩টায় দ্বীপ থেকে ফিরবে। এই সার্ভিস চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। অর্থাৎ শীত মৌসুমের পুরোটা জুড়ে প্রতিদিন সকালে দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করা যাবে।
কেন এই সিজন-ওপেন গুরুত্বপূর্ণ? শীতের মাসগুলোই সেন্টমার্টিনের পর্যটন-অর্থনীতির প্রাণ। জাহাজ, হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় দোকান মিলিয়ে হাজারো মানুষের জীবিকা এই মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। প্রথম দিনের ১,১৭৪ পর্যটক আর কঠোর নিয়ম-প্রয়োগ মিলিয়ে বার্তা স্পষ্ট: এবারের মৌসুমে পর্যটন চলবে, তবে পরিবেশের বিনিময়ে নয়।
যেতে চাইলে আগেই প্রস্তুতি নিন। বাধ্যতামূলক অনলাইন রেজিস্ট্রেশন সেরে টিকিট কাটুন, ভোরে জেটিতে পৌঁছান, নিজের পানির বোতল সঙ্গে নিন। জাহাজের ভাড়া ও সময়সূচি মৌসুমভেদে বদলাতে পারে, তাই যাত্রার আগে অপারেটরের কাছ থেকে হালনাগাদ তথ্য জেনে নিন। সাইটের সেন্টমার্টিন ভ্রমণ গাইডে রুট, থাকা ও খরচের বিস্তারিত ধারণা পাবেন।
