রোববার বিকেলে সাজেক আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে যুগান্তর জানিয়েছে, ১ নভেম্বর বিকেল ৪টা থেকে প্রায় ৫টা পর্যন্ত সাজেকের ঝুরঝুরি ছড়ার লাঙ্গলমারা এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলে। ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে সময়টা কিছুটা এগিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে পৌনে ৪টা থেকে সোয়া ৫টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টাব্যাপী থেমে থেমে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। দুই প্রতিবেদনেই মূল ঘটনা এক: রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের এই দুর্গম এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
দুর্গম এলাকা হওয়ায় এই ঘটনায় হতাহতের কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ইত্তেফাক জানিয়েছে, সন্ধ্যা পৌনে ৭টা পর্যন্ত হতাহতের কোনো সংবাদ পাওয়া যায়নি। সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন গোলাগুলির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন এবং জানিয়েছেন, বর্তমানে গোলাগুলি থেমে গেছে, পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। তবে শান্ত থাকার এই খবরকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলে ভুল করার সুযোগ নেই, কারণ একই এলাকায় টানা দুদিন গোলাগুলির ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।
গোলাগুলিতে নিজেদের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে উভয় পক্ষ। ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেছেন, তাদের দলের কেউ এ ধরনের গোলাগুলিতে জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না। একইভাবে জেএসএসের কেন্দ্রীয় সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেছেন, তাদের সংগঠনের কোনো সদস্য এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নন। অন্যদিকে সাজেক ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য পরিচয় চাকমা জানিয়েছেন, ঝুরঝুরি ছড়া ও লাঙ্গলমারা সীমানা এলাকায় দুই সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি হয়েছে এবং এতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ভুগছেন।
এই ঘটনা একা ঘটেনি। এর আগের দিন শনিবারও সাজেকের মাচলং এলাকার দুর্গম কলাবুনিয়া ও ভাঙামুড়া এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী গোলাগুলি হয়েছিল। পর পর দুদিনের এই ঘটনা সাজেকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পর্যটকদের কাছে সাজেক মেঘের রাজ্য হিসেবে পরিচিত হলেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানকার খবর মূলত অবরোধ, সড়ক বন্ধ আর সংঘর্ষের।
অবরোধের দিকটাও রোববার জটিল মোড় নিয়েছে। পাঁচ দফা দাবিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ১১তম দিন ছিল রোববার। সংগঠন দুটি এদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবরোধ শিথিল রাখার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সেই শিথিলতা কার্যত কাজ করেনি। যুগান্তর জানিয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির ব্যানারে খাগড়াছড়ির অপর একটি সংগঠন পাল্টা অবরোধ ডাকায় শিথিলতা তেমন কার্যকর হয়নি। ফলে কয়েকটি মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চলাচল করলেও অন্য যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ ছিল।
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে আরো একটি স্তর যুক্ত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি সাজেক সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালক শ্রমিকরা বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে এদিন কর্মবিরতি পালন করেছেন, আর পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা একদিনের জন্য নয়, স্থায়ীভাবে সাজেক খুলে দেওয়ার দাবিতে ধর্মঘট ডেকেছেন। দিঘীনালা বাস স্টেশনের লাইনম্যান স্বপন চাকমা জানিয়েছেন, খাগড়াছড়ি থেকে দিঘীনালা এবং দিঘীনালা থেকে মারিশ্যা ও সাজেক সড়কে এই ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে অবরোধ শিথিলের ঘোষণা, অন্যদিকে পাল্টা অবরোধ ও ধর্মঘট, এই তিনটি টানাপোড়েনে রোববার সাজেক সড়কে কার্যত কোনো স্বাভাবিক যান চলাচল হয়নি।
এর সরাসরি ক্ষতি পোহাচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও কৃষকরা। ইত্তেফাক জানিয়েছে, সাজেক এলাকার অধিকাংশ মানুষ জুমচাষসহ বিভিন্ন চাষাবাদ করে এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু গাড়ি না চলায় উৎপাদিত কলা, পেঁপেসহ নানা কৃষিপণ্য খেতেই পেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পর্যটন বন্ধ থাকায় রিসোর্ট, পরিবহন ও দোকানপাটের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আয়ও থমকে আছে।
এবার সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন: সোমবার থেকে কী হবে? যুগান্তর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন সোমবার থেকে আবার অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলবে। সংগঠন দুটির নেতা বাবুধন চাকমা ও নতুনজয় চাকমা জানিয়েছেন, সোমবার থেকে আগের মতো সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহতভাবে চলতে থাকবে। অর্থাৎ রোববারের একদিনের শিথিলতা ছিল ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।
পর্যটকদের জন্য এর মানে পরিষ্কার। সোমবার থেকে সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে তা আপাতত স্থগিত রাখাই নিরাপদ সিদ্ধান্ত। সড়ক বন্ধ থাকলে খাগড়াছড়ি থেকে দিঘীনালা হয়ে সাজেক যাওয়ার পথে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকবে, আর সংঘর্ষের খবর থাকা এলাকায় যাওয়া কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। যারা ইতিমধ্যে বুকিং দিয়েছেন, তাদের উচিত রিসোর্ট বা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুকিং পেছানো বা অর্থ ফেরতের বিষয়টি আগেই নিশ্চিত করা। স্থানীয় প্রশাসন বা থানার কাছ থেকে সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নেওয়াও জরুরি, কারণ সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো শিথিলতার খবর পুরো ছবি দেয় না।
এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আলোচনা চলছে, কিন্তু মূল দাবিতে সমঝোতা না হওয়ায় অবরোধ বারবার ফিরে আসছে। যতক্ষণ না স্থায়ী সমাধান আসে, ততক্ষণ সাজেকের পর্যটন অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবে। পরিস্থিতির নতুন কোনো মোড় এলে বিনোদন ঝলক সেই খবর সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।
