'মনে হচ্ছে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি।' অবরোধের মুখে সাজেক থেকে ফিরে এভাবেই বলেছেন নারায়ণগঞ্জ থেকে ভ্রমণে যাওয়া মোহাম্মদ নাঈম। তাঁর মতো ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটক নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি ফিরেছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেরার পথে বাঘাইছড়ির উজোবাজার (গঙ্গারাম) এলাকায় অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়েন তাঁরা। সে সময় গোলাগুলির ঘটনা ঘটলে পর্যটকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকা অবরোধের কারণে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। সেই নির্দেশনা এখনো বহাল আছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতা এমন: দুই সংগঠনের তৃতীয় দফায় ডাকা অবরোধের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল থেকে উজো বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা পর্যটকবাহী গাড়ির বহর চলাচলে বাধা দেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের সরিয়ে দিলে গাড়িবহর সামনে এগিয়ে যায়।
এরপর বেলা ১১টার দিকে সেখানে গোলাগুলি শুরু হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালিয়েছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ। গুলি বিনিময়ের মধ্যেই সাজেকে আটকে পড়া ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে বৃহস্পতিবার বেলা একটার দিকে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে দেওয়া হয়।
অবরোধ কর্মসূচি এখনো চলছে। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা জানান, সাজেকের ১০ নম্বর ও ১৪ কিলোমিটার এলাকায় তাদের কর্মীরা পিকেটিং করছেন। সড়কে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদেরও হেঁটে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।
অবরোধের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে পর্যটন-অর্থনীতিতে। সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, বর্তমানে সাজেকে পর্যটক নেই বললেই চলে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আগাম বুকিং দেওয়া পর্যটকদের অনেকে তা বাতিল করেছেন। সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটকদের যাতায়াতও সম্ভব হচ্ছে না।
যাঁরা আগাম বুকিং দিয়েছিলেন, তাঁদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন, টাকার কী হবে। অবরোধ ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার মতো পরিস্থিতিতে প্রথমে বুকিং দেওয়া রিসোর্ট বা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে লিখিতভাবে যোগাযোগ করে পুনঃসূচি বা ফেরতের সুযোগ আছে কি না জানতে চাওয়াই নিরাপদ পথ। পেমেন্টের রসিদ ও যোগাযোগের সব প্রমাণ সংরক্ষণ করে রাখুন, যাতে পরে কোনো বিরোধ হলে তথ্য হাতে থাকে।
কবে খুলবে সাজেক, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, আগের দিনের মতো পরিস্থিতি বর্তমানে নেই। তবে এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি প্রশাসন পর্যবেক্ষণ করছে। সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা কবে প্রত্যাহার হবে, তা এখনো জানা যায়নি।
শীত মৌসুমের মুখে সাজেক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকায় পর্যটকদের আলোচনায় এখন বিকল্প গন্তব্যের নাম উঠে এসেছে। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, শ্রীমঙ্গলের মতো গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। সাজেক যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
এদিকে গতকালের গোলাগুলির পর পার্বত্য দুই জেলায় সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ঘোষণা এসেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করছে অবরোধকারীদের কর্মসূচি ও প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
ভ্রমণ-নিরাপত্তা এখন বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। গত বুধবার কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে গোসলে নেমে ৪ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছিল। সাজেকের অবরোধ-গোলাগুলি আর হিমছড়ির দুর্ঘটনা, দুটি ঘটনাই দেখিয়ে দিচ্ছে, ভ্রমণের আগে নিরাপত্তা-তথ্য জেনে নেওয়া এখন অপরিহার্য।
শীত মৌসুমের মুখে পর্যটকদের আলোচনায় এখন বিকল্প গন্তব্যের নাম। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, শ্রীমঙ্গলের মতো গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। তবে যেখানেই যান, স্থানীয় পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা-নির্দেশনা জেনে নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
