বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

সাজেক অবরোধে ২০ কোটি টাকার ক্ষতির শঙ্কা: ৪৮ ঘণ্টায় খোলার দাবিতে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৪ অক্টোবর ২০২৬4 মিনিটে পড়ুন
সাজেক ভ্যালিতে সূর্যোদয়
সাজেক ভ্যালি (ছবি: Rocky Masum) (ছবি: Rocky Masum, CC BY-SA 4.0)

আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সড়ক ও নৌপথে আধাবেলা অবরোধ পালন করছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। বৃহস্পতিবার সাজেকে অবরোধকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ডাকা হয়েছে এই কর্মসূচি। এদিকে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধই রয়েছে। অবরোধ ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার ধাক্কায় পর্যটন অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে, ব্যবসায়ীরা বলছেন ক্ষতি ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত গড়াতে পারে। এর মধ্যে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক খুলে দেওয়ার দাবিতে শুক্রবার বিকালে খাগড়াছড়ি শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে আঞ্চলিক সংগঠনের অবরোধ কর্মসূচি ঘিরে পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত। বৃহস্পতিবার অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে গোলাগুলির পর থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আটকা পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপত্তা দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে আজ রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। এতে পাহাড়ের পর্যটন, জনজীবন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

অবরোধের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে পর্যটন অর্থনীতিতে। সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, এখন পর্যটনের ভরা মৌসুম। অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সব বুকিং বাতিল করে পর্যটকদের টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতির শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি পর্যটকবাহী জিপ চলাচল করত, বর্তমানে সেগুলো বন্ধ। শুধু পর্যটন নয়, সড়ক অবরোধে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহণ এবং জুমের ফসল বাজারজাতকরণও ব্যাহত হচ্ছে। খাদ্যসামগ্রী আনা-নেওয়া করতে না পেরে স্থানীয় সাধারণ মানুষও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা বলেন, কোটি কোটি টাকার আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা। পর্যটন বন্ধ থাকায় কটেজ মালিকদের পাশাপাশি পরিবহণ খাত, স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকাও চরম সংকটে পড়েছে। একই কথা জানান সাজেক পর্যটন ভ্যালির কুঁড়েঘর রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী যতেন ত্রিপুরা।

পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুলে দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ব্যবসায়ীরা। শুক্রবার বিকালে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের সরকারি কলেজ গেটের সামনে থেকে মিছিল বের হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাপলা চত্বরে এসে শেষ হয়। যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা বলেন, পর্যটন এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। পর্যটন বন্ধ হলে অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে। দ্রুত সাজেক খুলে দেওয়ার দাবি জানান তিনি। ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ইটাব) সদস্য উজ্জ্বল দে বলেন, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধের কারণে পর্যটকরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন। দ্রুত অবরোধ প্রত্যাহার না করলে আমরা বড় আন্দোলনে যাব।

বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর সাজেকের গঙ্গারাম এলাকায় জনশূন্যতা দেখা দিয়েছে। আতঙ্কে বাড়িঘর, দোকানপাট ছেড়ে সাধারণ মানুষজন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন বলে জানান সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা। শুক্রবারও সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলে। সকাল থেকে বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার ও গাছের গুঁড়ি জ্বালিয়ে কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে শুক্রবার সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

গোলাগুলির ঘটনা নিয়ে এখনো দাবি-পাল্টা দাবি চলছে। সেনাবাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালালে আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি চালানো হয়। তবে ইউপিডিএফ এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, নিরাপত্তা বাহিনীই একতরফা গুলি চালিয়েছে। অবরোধকারী সংগঠনগুলোকে ইউপিডিএফ-ঘনিষ্ঠ হিসাবে বিভিন্ন মহল থেকে উল্লেখ করা হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ, কারা গুলি চালিয়েছে এবং সহিংসতা কীভাবে শুরু হয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব বলেন, বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এলাকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদারের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং যৌথবাহিনীর (পুলিশ ও সেনাবাহিনী) অভিযান চলছে। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া বা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।

ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ৬টায়। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ শুরু করে। সাজেক থেকে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল দাবির মধ্যে। সকালের দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির দিকে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে গাড়িবহর বাধার মুখে পড়ে। ব্যারিকেড সরিয়ে পর্যটকদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং অবরোধকারীদের সঙ্গে উত্তেজনার একপর্যায়ে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

সাজেক কবে খুলবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। জেলা প্রশাসনের সাময়িক বন্ধের নির্দেশনা কবে প্রত্যাহার হবে, তা এখনো জানা যায়নি। যাঁদের আগাম বুকিং ছিল, তাঁদের রিসোর্ট বা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে রিফান্ড বা পুনঃসূচির বিষয়টি নিশ্চিত করে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন অভিজ্ঞ ভ্রমণকারীরা। শীত মৌসুমের মুখে সাজেক বন্ধ থাকায় অনেকেই কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান বা শ্রীমঙ্গলের মতো বিকল্প গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছেন।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার