ভূমিকা: এখন কেন রইদ নিয়ে কথা হচ্ছে বাংলাদেশের সিনেমার আন্তর্জাতিক যাত্রায় ২০২৬ সালটা মেজবাউর রহমান সুমনের ছবি রইদের নামে অনেকটাই লেখা হয়ে গেছে। বছরের শুরুতে রটারডামে বিশ্ব প্রিমিয়ার, মাঝামাঝি সময়ে দেশে ঈদে মুক্তি, তারপর অস্ট্রেলিয়া আর মেলবোর্নে প্রদর্শনী, সিয়াটল আর ইনসব্রুকে নির্বাচন, ভ্যাঙ্কুভারে প্রদর্শনী, সবশেষে বার্সেলোনায় সেরা ছবির পুরস্কার। এর মধ্যে বাংলাদেশের অস্কার প্রতিনিধি হিসেবে ছবিটির নির্বাচন আর গোয়ার আইএফএফআইতে জায়গা পাওয়া খবরটিকে আরও এগিয়ে দিয়েছে। এই লেখায় রইদের গল্প, কাস্ট, নির্মাতা, নির্মাণের পরিশ্রম, উৎসব যাত্রা, অস্কার প্রসঙ্গ আর কোথায় দেখা যাবে, সবটা এক জায়গায় সাজানো হয়েছে, যাতে ছবিটি সম্পর্কে জানতে চাওয়া পাঠক একবার পড়েই মূল বিষয়গুলো বুঝতে পারেন।
রইদ কোনো সাধারণ গ্রামীণ গল্পের সরল বর্ণনা নয়। এটি একটি পুরোনো লোককথাকে আজকের ভাষায় নতুন করে বলার চেষ্টা, যেখানে ইচ্ছা আর আসক্তি, বাস্তব আর জাদুবাস্তবতা, পুরাণ আর প্রতীক একসঙ্গে মিশে আছে। ছবিটির দৈর্ঘ্য ১০৯ মিনিট, ভাষা বাংলা, ইংরেজি সাবটাইটেলসহ, আর ভ্যাঙ্কুভার উৎসবের তথ্য অনুযায়ী এটি ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য নির্ধারিত। এই পরিচয়ই বলে দেয়, ছবিটি দর্শকের কাছ থেকে মনোযোগ চায়, তাড়াহুড়ো করে দেখার ছবি এটি নয়। বার্সেলোনায় জুরি ছবিটির গ্রামীণ বাংলাদেশের বিশ্বস্ত আর কাব্যিক চিত্রায়ণ, এর কিংবদন্তি আর সংস্কৃতি এবং জাদুবাস্তবতার প্রশংসা করেছে, আর এই স্বীকৃতিই ছবিটিকে শুধু একটি উৎসবের ছবি থেকে বাংলাদেশের সিনেমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত করেছে।
গল্প: কী নিয়ে রইদ রইদের কেন্দ্রে আছেন সাদু, চল্লিশের কোঠায় থাকা এক পরিশ্রমী আর একাকী মানুষ। তিনি দূরের এক গ্রামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন। স্ত্রীর আচরণ মানসিকভাবে অস্থির আর খানিকটা উদ্ভট ধরনের, আর সেই আচরণ গ্রামের জীবনে বারবার অস্থিরতা তৈরি করে। এক পর্যায়ে সাদু স্ত্রীকে ছেড়ে দেন, কিন্তু স্ত্রী বারবার ফিরে আসেন। প্রতিবার ফেরার সঙ্গে মিলে যায় পাকা তাল পড়ার মুহূর্ত। তাদের বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি তালগাছ, আর সেই গাছটি গল্পে শুধু একটি গাছ হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে ফেরা, সময় আর নিয়তির এক নীরব সাক্ষী।
ছবিটি একটি বহু পুরোনো লোককথাকে সমকালীন ভাষায় নতুন করে বলেছে। তার ভেতরের ইচ্ছা, টান আর ছেড়ে যাওয়া আর ফিরে আসার চক্রটিকে আজকের গ্রামীণ জীবনের মধ্যে বসানো হয়েছে। এই কারণে রইদ একদিকে যেমন একটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্প, অন্যদিকে তেমনি একটি বৃহত্তর ভাবনার গল্পও বটে। সাদুর একাকীত্ব আর পরিশ্রমের জীবন, স্ত্রীর অস্থির আচরণ, গ্রামের মানুষের প্রতিক্রিয়া, ছেড়ে দেওয়া আর বারবার ফিরে আসা, সব মিলিয়ে গল্পটি একটি চক্রের মতো এগোয়, যেখানে শেষ বলে কিছু স্থির থাকে না।
গল্পের মূল ভাবনায় আছে ইচ্ছা আর আসক্তি। সাদুর জীবনে স্ত্রীর ফিরে আসা শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি একটি টানের প্রকাশ, যে টান থেকে মুক্তি চাইলেও মুক্তি মেলে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাদুবাস্তবতা, পুরাণ আর সমৃদ্ধ প্রতীক। পাকা তাল পড়া, তালগাছের উপস্থিতি, ফেরার পুনরাবৃত্তি, সবকিছুই গল্পে সরাসরি ব্যাখ্যার বাইরে একটি অর্থ তৈরি করে। দর্শক চাইলে এটিকে একটি সম্পর্কের গল্প হিসেবে দেখতে পারেন, আবার চাইলে লোককথার ভেতর দিয়ে মানুষের ইচ্ছা আর নিয়তির দিকে তাকানো একটি ভাবনার ছবি হিসেবেও পড়তে পারেন।
কাস্ট ও চরিত্র: কারা আছেন রইদে সাদুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। চল্লিশের কোঠায় থাকা এক পরিশ্রমী আর একাকী মানুষের ভেতরের চাপ, ক্লান্তি আর টান ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। সাদু এমন একজন মানুষ, যার জীবনে স্ত্রীর উপস্থিতি আর অনুপস্থিতি, দুটোই সমানভাবে ভারী হয়ে ওঠে। তাঁর বিপরীতে স্ত্রীর চরিত্রে আছেন নাজিফা তুষি। ভ্যাঙ্কুভার উৎসবের তথ্য অনুযায়ী তাঁর অভিনয় এই ছবির একটি বিশেষ দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্ত্রীর চরিত্রটি গল্পের ভারসাম্য বদলে দেয়। তাঁর আচরণে অস্থিরতা আছে, আবার সেই আচরণের ভেতর দিয়ে গল্পের জাদুবাস্তবতার দিকটিও সামনে আসে। সাদু তাঁকে ছেড়ে দিতে চান, কিন্তু তিনি ফিরে আসেন, আর প্রতিটি ফেরা গল্পে নতুন করে প্রশ্ন তোলে, এই ফেরা কি শুধুই একজন মানুষের ফেরা, নাকি একটি চক্রের ভেতর আটকে থাকা জীবনেরই প্রকাশ। নাজিফা তুষির কাজ এখানে তাই শুধু একটি চরিত্রে অভিনয় নয়, গল্পের মূল টানটিকে ধরে রাখার কাজও বটে।
সহশিল্পীদের মধ্যে আছেন আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ, গাজী রাকায়েত আর টুটুল ফকির। তাঁদের উপস্থিতি গ্রামের জীবন আর সাদুর চারপাশের জগৎটিকে পূর্ণ করে তোলে। চিত্রনাট্য লিখেছেন মেজবাউর রহমান সুমন, জাহীন ফারুক আমিন, সিদ্দিক আহমেদ আর সুকর্ণ শাহেদ ধীমান। গল্প সুমন আর সেলিনা বানু মনির। প্রযোজনায় বঙ্গ আর ফেসকার্ড। চিত্রগ্রহণে জোহের মোসাভ্বির জ্যোতি, সম্পাদনায় সাজাল আলোক, আর সংগীতে রশীদ শরীফ শোয়েব। এই দলটি মিলেই রইদের দৃশ্য, শব্দ আর ছন্দ তৈরি করেছে।
নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন: হাওয়া থেকে রইদ রইদ বুঝতে হলে মেজবাউর রহমান সুমনের আগের যাত্রাটি জানা দরকার। তিনি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, ভিজ্যুয়াল শিল্পী আর সংগীতশিল্পী, এবং বাংলাদেশের নিউ ওয়েভের একজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রতিষ্ঠান ফেসকার্ড ২০১১ সাল থেকে টেলিভিশন বিজ্ঞাপন তৈরি করে আসছে। তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি হাওয়া ২০২২ সালে মুক্তি পায়। সেটি যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিসের তালিকায় জায়গা পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি ছবি হিসেবে পরিচিত হয়, আর সেই বছর বাংলাদেশের অস্কার প্রতিনিধি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিল।
পরিচালক জানিয়েছেন, রইদের গল্পের শিকড় তাঁর শৈশবে। বড় হওয়ার সময় তাঁর চেনা দুটি চরিত্রের মধ্যেই এই গল্পের সূত্র লুকিয়ে ছিল। তাঁর মা এই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যিনি ছোটবেলা থেকেই তাঁকে এই গল্প শুনিয়েছেন। সুমন বলেছেন, হাওয়া ছিল জল আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে একটি যাত্রা, আর স্থলে রইদ তৈরি করা ছিল স্পষ্টভাবে আলাদা আর চ্যালেঞ্জিং এক অভিজ্ঞতা। এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি, কারণ হাওয়া যেখানে জলের বিস্তার আর ভাসমান জীবন নিয়ে কাজ করেছিল, রইদ সেখানে মাটি, গাছ, বাড়ি আর গ্রামের স্থির জীবনের ভেতর দিয়ে গল্প বলে।
হাওয়া থেকে রইদ পর্যন্ত সুমনের এই যাত্রা তাই শুধু একটি ছবি থেকে আরেকটি ছবিতে যাওয়া নয়। এটি একজন নির্মাতার নিজের শৈশব, স্মৃতি আর শোনা গল্পের দিকে ফিরে যাওয়া, আর সেই ফিরে যাওয়াকে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবির ভাষায় রূপ দেওয়া। বাংলাদেশের নিউ ওয়েভের প্রসঙ্গে তাঁর নাম এ কারণেই বারবার আসে, কারণ তিনি গল্পের সঙ্গে জায়গা, মানুষ আর সংস্কৃতিকে একসঙ্গে দেখতে চান।
নির্মাণ: গাছ, বাড়ি আর লোকেশন রইদের নির্মাণের সবচেয়ে চোখে পড়ার দিকটি হলো লোকেশন তৈরির পরিশ্রম। একটি খালি জায়গায় প্রায় ৫০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছিল, আর সেগুলোকে কমপক্ষে ছয় মাস ধরে যত্ন করে বড় করা হয়েছিল। এই তথ্য ডেইলি স্টারের ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ছবির কেন্দ্রীয় বাড়িটিও শুটিংয়ের জন্য নতুন করে তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ, ক্যামেরার সামনে যা দেখা যায়, তার অনেকটাই তৈরি করা পরিবেশ, হঠাৎ খুঁজে পাওয়া কোনো প্রস্তুত লোকেশন নয়।
এই পরিশ্রমের পেছনে একটি স্পষ্ট ভাবনা ছিল, লোকেশনকে গল্পের অংশ করে তোলা, শুধু পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করা নয়। গাছ, বাড়ি আর চারপাশের জায়গা এখানে গল্পের ভেতরে ঢুকে আছে। তালগাছের কথা ভাবলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়, গাছটি সাদুর বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে গল্পের ফেরা আর পাকা তাল পড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। এমন একটি জগৎ তৈরি করতে সময় লাগে, আর সেই সময়টাই ছবির নির্মাণে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। ছয় মাস ধরে গাছ বড় করার বিষয়টি শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি নির্মাতাদের ধৈর্য আর পরিকল্পনারও প্রমাণ।
স্থলে ছবি করার চ্যালেঞ্জের কথাও এখানে মনে রাখা দরকার। জলের ওপর ভাসমান জীবন আর স্থলের স্থির জীবন, দুটির দৃশ্যভাষা এক নয়। রইদের নির্মাণ সেই স্থির জীবনের ভেতরেই গল্প খুঁজেছে, আর সেজন্য জায়গাটিকে আগে তৈরি করে নেওয়া হয়েছিল, যাতে গল্প আর জায়গা একসঙ্গে শ্বাস নিতে পারে।
উৎসব-যাত্রা: রটারডাম থেকে বার্সেলোনা রইদের বিশ্ব প্রিমিয়ার হয় ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, ৫৫তম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল রটারডামের টাইগার প্রতিযোগিতায়। এটি উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা, আর সেখানে জায়গা পাওয়াই ছবিটির জন্য একটি বড় স্বীকৃতি ছিল। উৎসবটি চলেছিল ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। একই বছর রটারডামে তিনটি বাংলাদেশি ছবি একসঙ্গে জায়গা পেয়েছিল, যা একটি বড় আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রথমবারের মতো ঘটেছিল। ডেলুপি ছিল ব্রাইট ফিউচার বিভাগে, রইদ টাইগার প্রতিযোগিতায়, আর মাস্টার ছিল বিগ স্ক্রিন প্রতিযোগিতায়। এই তথ্য ডেইলি স্টারের ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে।
রটারডামের পর ছবিটি দেশে মুক্তি পায় ২০২৬ সালের ২৮ মে, ঈদুল আজহায়। সেদিন একসঙ্গে আরও কয়েকটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল, যার মধ্যে ছিল রকস্টার, মালিক, মাসুদ রানা, বনলতা সেন, পিনিক, তসনস আর অফিসার। এরপর অস্ট্রেলিয়ায় ২০২৬ সালের ৫ জুন থেকে ছয়টি শহরে ছবিটির প্রদর্শনী হয়। মেলবোর্নের ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটি দেখানো হয় ২০২৬ সালের ১৬ আগস্ট। একই বছরে ছবিটি সিয়াটল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আর ইনসব্রুক উৎসবেও নির্বাচিত হয়েছিল। ভ্যাঙ্কুভার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রইদ দেখানো হয় ২০২৬ সালের ৪ অক্টোবর।
বার্সেলোনায় ছবিটি তার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিটি পায়। ১৪তম এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বার্সেলোনা ২০২৬ এর অফিসিয়াল সিলেকশনে রইদ সেরা ছবির পুরস্কার জেতে। উৎসবটি চলেছিল ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত, যেখানে ২৫টি দেশের ১২৮টি ছবি দেখানো হয়েছিল, আর বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয় ২ নভেম্বর। জুরি ছবিটির গ্রামীণ বাংলাদেশের বিশ্বস্ত আর কাব্যিক চিত্রায়ণ, এর কিংবদন্তি আর সংস্কৃতি এবং জাদুবাস্তবতার প্রশংসা করেছে। একই উৎসবে ডেলুপি আদার ন্যারেটিভস বিভাগে বিশেষ উল্লেখ পেয়েছিল।
বার্সেলোনার পরের খবরটি আসে গোয়া থেকে। রইদ ৫৭তম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়ার ইমার্জিং ফিল্মমেকারস বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। নয়টি ছবির তালিকাটি প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর, আর উৎসবটি গোয়ায় চলবে ২০২৬ সালের ২০ থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত। এই নির্বাচন ছবিটির উৎসব যাত্রায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ যোগ করেছে, কারণ রটারডাম, বার্সেলোনা আর গোয়া, তিনটি ভিন্ন জায়গার স্বীকৃতি একসঙ্গে ছবিটির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি স্পষ্ট ছবি তৈরি করে।
অস্কার-যাত্রা ও বিতর্ক: যা জানা গেছে রইদ ৯৯তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি বিভাগে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। ঘোষণাটি আসে ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে। ডেইলি সানের ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচটি ছবি জমা পড়েছিল, আর তার মধ্যে চারটি সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পেয়েছিল। হাওয়া এর পর সুমনের ছবির এই অস্কার প্রতিনিধিত্ব তাঁর যাত্রায় একটি নতুন মাইলফলক যোগ করেছে, কারণ হাওয়াও ২০২২ সালে বাংলাদেশের অস্কার প্রতিনিধি ছিল।
নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম আর অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে, আর ফেডারেশনের সভাপতি মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। এই অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগ হিসেবেই রয়েছে, প্রমাণিত সত্য হিসেবে নয়, তাই পাঠকের উচিত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা করা।
কোথায় দেখবেন: এখন কী অবস্থা বাংলাদেশে রইদের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর্ব শেষ হয়ে গেছে। ছবিটি দেশে মুক্তি পেয়েছিল ২০২৬ সালের ২৮ মে, ঈদুল আজহায়, আর সেই প্রেক্ষাগৃহের পর্ব এখন আর চলছে না। ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ছবিটির স্ট্রিমিং বা বাড়িতে দেখার কোনো যাচাই করা তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। বঙ্গের আনুষ্ঠানিক পেজে ছবিটির ট্রেলার রয়েছে, সেখান থেকে ছবির ধারণা পাওয়া যায়। গোয়ার আইএফএফআইতে ছবিটির প্রদর্শনী ২০২৬ সালের ২০ থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত গোয়ায় উৎসবের প্রতিনিধিদের জন্য নির্ধারিত। তাই আপাতত অপেক্ষা করাই বাস্তবসম্মত, আর স্ট্রিমিং বা নতুন প্রদর্শনীর কোনো তারিখ ঘোষণা হলে তা আনুষ্ঠানিক সূত্র থেকেই জানা যাবে। কোনো ফ্রি ডাউনলোডের প্রতিশ্রুতি এই লেখায় দেওয়া হচ্ছে না।
প্রশ্নোত্তর: রইদ নিয়ে যা জানতে চান নিচে রইদ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসা করা প্রশ্নগুলোর সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া হলো, যাতে পাঠক দ্রুত মূল বিষয়গুলো জেনে নিতে পারেন।
রইদ কী নিয়ে? রইদ একটি পুরোনো লোককথাকে সমকালীন ভাষায় নতুন করে বলা ছবি। সাদু নামের এক একাকী মানুষ, তাঁর অস্থির আচরণের স্ত্রী, স্ত্রীর বারবার ফিরে আসা আর পাকা তাল পড়ার মুহূর্তকে কেন্দ্র করে গল্পটি এগোয়, যার ভেতরে আছে ইচ্ছা, আসক্তি, জাদুবাস্তবতা, পুরাণ আর প্রতীক।
সাদু কে? সাদু রইদের প্রধান চরিত্র, চল্লিশের কোঠায় থাকা এক পরিশ্রমী আর একাকী মানুষ। তিনি দূরের এক গ্রামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন, আর স্ত্রীর আচরণ গ্রামের জীবনে অস্থিরতা তৈরি করে। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান।
নাজিফা তুষি কোন চরিত্রে? নাজিফা তুষি সাদুর স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর চরিত্রের আচরণ মানসিকভাবে অস্থির আর খানিকটা উদ্ভট ধরনের, আর সেই আচরণই গল্পে বারবার অস্থিরতা তৈরি করে। ভ্যাঙ্কুভার উৎসবের তথ্য অনুযায়ী তাঁর অভিনয় ছবির একটি বিশেষ দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রইদ কোথায় দেখা যাবে? বাংলাদেশে ছবিটির প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর্ব শেষ হয়ে গেছে, ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ২০২৬ সালের ২৮ মে। ২০২৬ সালের ৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে স্ট্রিমিং বা বাড়িতে দেখার কোনো যাচাই করা তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। বঙ্গের আনুষ্ঠানিক পেজে ছবিটির ট্রেলার দেখা যায়।
অস্কারে কী হলো? রইদ ৯৯তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি বিভাগে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। ঘোষণাটি আসে ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে। পাঁচটি ছবি জমা পড়েছিল, আর তার মধ্যে চারটি সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা পেয়েছিল।
বার্সেলোনায় কী পুরস্কার পেল? রইদ ১৪তম এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল বার্সেলোনা ২০২৬ এর অফিসিয়াল সিলেকশনে সেরা ছবির পুরস্কার জিতেছে। বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয় ২০২৬ সালের ২ নভেম্বর। জুরি ছবিটির গ্রামীণ বাংলাদেশের বিশ্বস্ত আর কাব্যিক চিত্রায়ণ, এর কিংবদন্তি আর সংস্কৃতি এবং জাদুবাস্তবতার প্রশংসা করেছে।
গোয়ায় কবে দেখা যাবে? রইদ ৫৭তম ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়ার ইমার্জিং ফিল্মমেকারস বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। উৎসবটি গোয়ায় চলবে ২০২৬ সালের ২০ থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত, আর সেখানকার প্রদর্শনী উৎসবের প্রতিনিধিদের জন্য নির্ধারিত। নয়টি ছবির তালিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর।
হাওয়া কি একই পরিচালকের? হ্যাঁ, হাওয়া আর রইদ, দুটি ছবির পরিচালকই মেজবাউর রহমান সুমন। হাওয়া ছিল তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি, যা ২০২২ সালে মুক্তি পায়, আর সেটি যুক্তরাষ্ট্রের বক্স অফিসের তালিকায় জায়গা পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি ছবি হিসেবে পরিচিত হয়। হাওয়াও সেই বছর বাংলাদেশের অস্কার প্রতিনিধি ছিল।
রইদ কি সত্যি ঘটনা? না, রইদ কোনো সত্য ঘটনার সরাসরি বর্ণনা নয়। এটি একটি বহু পুরোনো লোককথাকে সমকালীন ভাষায় নতুন করে বলা ছবি। পরিচালক জানিয়েছেন, গল্পের শিকড় তাঁর শৈশবে, আর তাঁর চেনা দুটি চরিত্র আর মায়ের শোনানো গল্পের মধ্যেই এর সূত্র রয়েছে।
শেষ কথা রইদের গল্প এখনো শেষ হয়নি। বার্সেলোনার পুরস্কার, গোয়ার আইএফএফআইতে নির্বাচন আর অস্কার প্রতিনিধিত্ব, সব মিলিয়ে ছবিটি বাংলাদেশের সিনেমার আন্তর্জাতিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হয়ে উঠেছে। যাঁরা ছবিটি দেখতে চান, তাঁদের জন্য আপাতত আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিকে নজর রাখাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।
