বিশ্ব চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর অস্কারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী চলচ্চিত্র নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে। কালের কণ্ঠের ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের অধীনে অস্কারের জন্য চলচ্চিত্র বাছাইয়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, সদস্য সংগঠনগুলোর মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করেই প্রতিবছর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চলচ্চিত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে আছেন বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটিজ ফেডারেশনের সভাপতি বড়ুয়া মনোজিত ধীমন। তিনি বলেছেন, অস্কারের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী চলচ্চিত্র নির্বাচনে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর ভাষায়, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক কর্তৃত্বের সুযোগ থাকা উচিত নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এখানে একটি কথা পরিষ্কার রাখা দরকার: এগুলো অভিযোগ, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়নি।
প্রশ্নটা কেন এত স্পর্শকাতর, সেটা বুঝতে হলে অস্কারের নিয়মটা জানা দরকার। আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম বিভাগে প্রতিটি দেশ বা অঞ্চল একটি করে চলচ্চিত্র জমা দিতে পারে। সেই একটি ছবি বাছাইয়ের দায়িত্ব থাকে একাডেমি অনুমোদিত জাতীয় কমিটির হাতে। বাংলাদেশে এই কাজটি করে থাকে অস্কার বাংলাদেশ কমিটি, যেটি বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ একটি ছবির নাম ঘোষণা হওয়া মানেই সেটি গোটা দেশের প্রতিনিধি হয়ে যাওয়া। তাই বাছাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটা শুধু একটি ছবির বিষয় থাকে না, গোটা দেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনের আস্থার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এবারের বিতর্কের পটভূমিতে আছে মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত 'রইদ'। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে 'রইদ'কে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের ৯৯তম আসরে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক জমা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রথম আলোর সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবার অস্কারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের জন্য মোট পাঁচটি সিনেমা জমা পড়েছিল: নূরুল আলম আতিকের 'মানুষের বাগান', মেজবাউর রহমান সুমনের 'রইদ', রেদওয়ান রনির 'দম', মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের 'দেলুপি' এবং মনিরুল আকাশ হকের 'দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল'। প্রাথমিক বাছাইয়ের পর চারটি সিনেমা বিবেচনায় আসে, সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে বেছে নেওয়া হয় 'রইদ'কে।
'রইদ' মূলত এক সাধু ও তাঁর স্ত্রীর সম্পর্কের গল্প। প্রেম ও নীরবতার মধ্য দিয়ে মানবজীবনের চিরন্তন এক আদিম প্রেমের আখ্যান তুলে ধরেছে ছবিটি। গুরুত্বপূর্ণ দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান ও নাজিফা তুষি। চিত্রনাট্য লিখেছেন সিদ্দিক আহমেদ, মেজবাউর রহমান সুমন, জাহিন ফারুক ও শুকর্ণ শাহেদ ধীমান। ঘোষণার দিন প্রথম আলোকে পরিচালক সুমন বলেছিলেন, এটা আমাদের গল্প, আমাদের এই অঞ্চলের গল্প। তাঁর কথায়, সিনেমা শুধু বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখার বিষয় নয়, এর একাডেমিক ও নান্দনিক দিকও আছে, আর 'রইদ' এর মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
সুমনের জন্য এটি প্রথমবার নয়। তাঁর আগের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'হাওয়া' ২০২২ সালে বাংলাদেশের অস্কার জমা হয়েছিল। 'রইদ' নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিনি দ্বিতীয়বার দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফিচার বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পেলেন। প্রথম আলোকে সেদিন তিনি এটাও বলেছিলেন, একটা সময় অস্কারে বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার মতো ছবি সেভাবে ছিল না, কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে ভালো মানের ছবি দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে, এটা বাংলাদেশের সিনেমার জন্য আশার দিক।
এখন সামনে কী? প্রথমত, একটি দেশের আনুষ্ঠানিক জমা হওয়া মানেই চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া নয়, এটা অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। জমা দেওয়ার পর একাডেমির যোগ্যতা যাচাই, তারপর সংক্ষিপ্ত তালিকা, তারপর চূড়ান্ত মনোনয়নের ধাপ পেরোতে হয়। 'রইদ' এখনো সেই যাত্রার শুরুর দিকেই আছে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব এখন কমিটি ও মন্ত্রণালয়ের দিকেই তাকিয়ে আছে চলচ্চিত্র অঙ্গন। প্রক্রিয়াটা কীভাবে চলে, কারা সিদ্ধান্ত নেন, সদস্য সংগঠনগুলোর ভূমিকা কী, এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাব এলে বিতর্ক থামবে, না এলে 'রইদ' এর আন্তর্জাতিক যাত্রার পাশাপাশি এই বিতর্কও চলতে থাকবে।
দর্শক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য আপাতত দুটো বিষয় আলাদা করে মনে রাখাই নিরাপদ। এক, 'রইদ' বাংলাদেশের অস্কার জমা হিসেবে নির্বাচিত, এটা ঘোষিত সত্য। দুই, সেই নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, এটা এখনো অভিযোগই। অভিযোগের তদন্ত হলে বা কমিটির পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা এলে সেই আপডেটই হবে এই খবরের পরের অধ্যায়।
