ঢাকা শহরের বয়স চারশো বছরের বেশি, আর সেই পুরোনো শহরটা এখনো বেঁচে আছে বুড়িগঙ্গার পাড়ে। পুরান ঢাকা মানে শুধু কয়েকটা পুরোনো বাড়ি নয়, এটা একটা জীবন্ত এলাকা, যেখানে সকালে শাঁখারিরা শাঁখ কাটেন, দুপুরে চকবাজারে ভিড় জমে, সন্ধ্যায় বিরিয়ানির দোকানে লাইন পড়ে, আর রাতে সদরঘাটের লঞ্চের ভোঁ শোনা যায়। নতুন ঢাকার ফ্লাইওভার আর শপিং মলের বাইরে ঢাকার আসল চেহারাটা দেখতে চাইলে একদিন পুরান ঢাকায় হাঁটতে হবে।
কেন যাবেন, তার কারণ অনেক। পুরান ঢাকায় ইতিহাস বইয়ের পাতায় পড়া জায়গাগুলো চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লালবাগ কেল্লা মুঘল আমলের অসমাপ্ত দুর্গ, আহসান মঞ্জিল নবাবদের গোলাপি প্রাসাদ, দুটোই পুরান ঢাকার সীমানার মধ্যেই। তারামসজিদ নামে পরিচিত তারা মসজিদের নীল তারার কারুকাজ, আরমানিটোলার আর্মেনিয়ান গির্জা, আর ঢাকেশ্বরী মন্দির, এই তিন ধর্মের তিন স্থাপনা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ঢাকার বহু সংস্কৃতির ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়। এর সঙ্গে আছে শাঁখারি বাজার, যেখানে এখনো হাতে শাঁখা বানানো হয়, আর সদরঘাট, যেখানে সারাদিন নদী আর মানুষের ব্যস্ততা চলে। ইতিহাস, স্থাপত্য, খাবার আর মানুষের জীবন, সব একদিনে মেলে বলেই পুরান ঢাকা ঢাকার সেরা দিনের ভ্রমণ।
সেরা সময় শীতকাল। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবহাওয়া সহনীয় থাকে, হাঁটতে কষ্ট কম হয়। পুরান ঢাকার ঘোরাঘুরি মানেই অনেকটা হাঁটা, তাই গরমে বা বর্ষায় এটা কষ্টকর হয়। সকালের দিকে শুরু করা ভালো, কারণ বেলা বাড়লে রাস্তায় ভিড় আর রিকশার চাপ বাড়ে। শুক্রবার অনেক জায়গায় ভিড় বেশি থাকে, আর জাদুঘর ধরনের স্থাপনার খোলার দিন আলাদা হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে খোলা আছে কি না যাচাই করে নেওয়া ভালো। রমজান মাসে চকবাজারের ইফতার বাজার আলাদা আকর্ষণ, তবে তখন ভিড়ও অনেক বেশি থাকে।
কীভাবে যাবেন, সেটা ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজ। বাস, সিএনজি বা রাইড শেয়ারিংয়ে গুলিস্তান, সদরঘাট বা লালবাগ এলাকায় পৌঁছে সেখান থেকে রিকশায় ঘোরা সবচেয়ে সুবিধাজনক। পুরান ঢাকার গলি সরু আর একমুখী অনেক জায়গায়, তাই গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢোকা ঝামেলার। ভালো পরিকল্পনা হলো এক জায়গায় গাড়ি রেখে রিকশা আর হাঁটার মিশেলে ঘোরা। সদরঘাট থেকে শুরু করে আহসান মঞ্জিল, তারপর শাঁখারি বাজার, তারা মসজিদ, লালবাগ কেল্লা, এই ক্রমে ঘুরলে পথের দূরত্ব কম হয়। সঙ্গে একজন স্থানীয় গাইড থাকলে গলির ইতিহাস আর গল্পগুলো অনেক বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে।
কী কী দেখবেন, তার একটা দিনের রুট এভাবে সাজানো যায়। শুরু করুন সদরঘাটে, বুড়িগঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে লঞ্চ আর নৌকার ব্যস্ততা দেখুন, চাইলে ছোট নৌকায় নদীতে এক চক্কর দিন। এরপর আহসান মঞ্জিল, গোলাপি প্রাসাদের ভেতরে নবাবদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র, ছবি আর আসবাব দেখা যায়, নদীর দিকের বারান্দা থেকে বুড়িগঙ্গার দৃশ্য সুন্দর। সেখান থেকে শাঁখারি বাজার, সরু গলির দুই পাশে শাঁখার দোকান, কারিগরদের হাতের কাজ দেখতে দেখতে হাঁটা যায়। আরমানিটোলায় তারা মসজিদ দেখুন, নীল আর সাদা টাইলসের তারার নকশা এখানকার বিশেষত্ব, আর কাছেই আর্মেনিয়ান গির্জার শান্ত প্রাঙ্গণ। দুপুরের পর লালবাগ কেল্লা, মুঘল স্থাপত্যের দেয়াল, মসজিদ আর পরী বিবির সমাধি ঘুরে দেখুন। সময় থাকলে ঢাকেশ্বরী মন্দির আর চকবাজার ঘুরে দিন শেষ করুন।
কোথায় থাকবেন, সেটা নির্ভর করে পরিকল্পনার ওপর। পুরান ঢাকায় দিনের ভ্রমণই সবচেয়ে জনপ্রিয়, ঢাকার অন্য এলাকা থেকে সকালে এসে সন্ধ্যায় ফিরে যাওয়া যায়। থাকতে চাইলে পুরান ঢাকা এলাকায় সাধারণ মানের হোটেল আছে, আর বিলাসী থাকার জন্য নতুন ঢাকার দিকে হোটেল বেছে নিয়ে দিনের বেলা পুরান ঢাকায় আসা যায়। যাঁরা ঢাকার বাইরে থেকে আসছেন, তাঁদের জন্য সদরঘাট বা গুলিস্তানের কাছাকাছি থাকা সুবিধাজনক, কারণ সেখান থেকে পুরান ঢাকার সব জায়গায় যাতায়াত সহজ।
খাওয়া পুরান ঢাকা ভ্রমণের অর্ধেক আনন্দ। কাচ্চি বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও, তেহারি, এখানকার চেনা খাবার, আর পুরোনো দোকানগুলোতে সকালের নাস্তায় বাকরখানি আর চা অনেকের পছন্দ। চকবাজারে নানা ধরনের কাবাব, লাচ্ছি আর মিষ্টি পাওয়া যায়। তবে রাস্তার খাবার খাওয়ার সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দোকান বেছে নিন, আর পানি কিনে খান। যাঁদের পেট সংবেদনশীল, তাঁরা ঝাল আর তেলের মাত্রা দেখে খাবেন। খাবারের দোকানে দাম আগে জেনে নেওয়া ভালো, বিশেষ করে ভিড়ের জায়গায়।
জনপ্রতি খরচের আনুমানিক রেঞ্জ এভাবে ধরা যায়। ঢাকার ভেতর থেকে একদিনের ভ্রমণে বাজেট ধারায় খরচ হতে পারে জনপ্রতি ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা, যেখানে যাতায়াত, স্থাপনার টিকিট আর সাধারণ খাবার ধরা আছে। মাঝারি ধারায়, ভাড়া গাড়ি বা গাইড আর ভালো রেস্টুরেন্টের খাবার মিলিয়ে, খরচ হতে পারে জনপ্রতি ২০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা। তবে এই অঙ্ক মৌসুমভেদে আর ভিড়ভেদে বদলায়, ছুটির দিনে রিকশা ভাড়া বেশি চাওয়া হয়। তাই যাওয়ার আগে ভাড়া দরদাম করে নিন, আর হাতে বাড়তি টাকা রাখুন। বাজেট টিপস হিসেবে দল বেঁধে যাওয়া ভালো, কারণ গাইড আর গাড়ির খরচ ভাগ হয়, আর সকাল সকাল শুরু করলে একদিনে বেশি জায়গা ঘোরা যায়।
নিরাপত্তা পরামর্শ পুরান ঢাকায় বিশেষভাবে জরুরি, কারণ এখানে ভিড় বেশি। ভিড়ের জায়গায় ব্যাগ সামনে রাখুন, মোবাইল আর মানিব্যাগ সাবধানে রাখুন। সরু গলিতে রিকশা আর মানুষের চাপ থাকে, তাই হাঁটার সময় চারপাশে খেয়াল রাখুন। ধর্মীয় স্থাপনায় ঢোকার সময় শালীন পোশাক পরুন, জুতো খোলার নিয়ম মানুন, ছবি তোলার আগে নিয়ম জেনে নিন। বর্ষায় আর গরমে সঙ্গে পানি রাখুন, আর গরমে দুপুরের রোদ এড়িয়ে ছায়ায় বিশ্রাম নিন। স্থানীয় দোকানদার আর বাসিন্দাদের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করুন, দরদাম হাসিমুখে করুন। এই নিয়মগুলো মানলে পুরান ঢাকার একদিনের ভ্রমণ হবে নিরাপদ, আর ঢাকার চারশো বছরের গল্পটা অনেক কাছ থেকে ছোঁয়া যাবে।
