বাংলাদেশের প্রতিদিনের বিনোদন পোর্টাল
বিনোদন ঝলক

দেশি-বিদেশি নাটক, সিনেমা ও সিরিজের প্রতিদিনের বিনোদন খবর

ভ্রমণ

বিরিশিরি ভ্রমণ গাইড ২০২৬: সোমেশ্বরী নদী আর সাদা মাটির পাহাড়ের দেশ

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৮ অক্টোবর ২০২৬5 মিনিটে পড়ুন
বিরিশিরি ভ্রমণ গাইডের থাম্বনেইল
ছবি: বিনোদন ঝলক

ঢাকার কোলাহল থেকে মাত্র এক রাতের দূরত্বে এমন এক জনপদ আছে, যেখানে নদীর জল পাহাড় ছুঁয়ে আসে, আর মাটির রঙ সাদা। নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি সেই জায়গা। সোমেশ্বরী নদীর তীরে দাঁড়িয়ে উত্তরে তাকালে মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের সবুজ ঢাল চোখে পড়ে, আর বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড় দেখলে মনে হয় কেউ যেন পাহাড়ের গায়ে চুনের আঁচড় কেটেছে। শহরের ভিড়, যানজট আর কংক্রিটের বাইরে দুই দিনের শান্ত ভ্রমণের জন্য বিরিশিরি এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে কম ভিড়ের গন্তব্যগুলোর একটি।

কেন যাবেন, এই প্রশ্নের উত্তর বিরিশিরিতে একাধিক। প্রথমত, সোমেশ্বরী নদী। বর্ষায় এই নদী ভরা থাকে, শীতে তার জল নেমে আসে স্বচ্ছ হয়ে। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখা, নৌকায় পারাপার, কিংবা শুধু বালুচরে বসে থাকা, সবই এখানে আলাদা অভিজ্ঞতা। দ্বিতীয়ত, বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড়। সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে পরিচিত চায়না ক্লে বা সাদা মাটির এই টিলাগুলো বিরিশিরির সবচেয়ে চেনা ছবি। টিলার গায়ে নীলচে সবুজ জলের ছোট ছোট জলাশয় জমে থাকে, যা দেখতে দূর থেকে অনেকটা পাহাড়ি লেকের মতো লাগে। তৃতীয়ত, মানুষ আর সংস্কৃতি। এই অঞ্চলে গারো সম্প্রদায়ের বসবাস, আছে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি, আর রানীখংয়ের মিশন এলাকার শান্ত পরিবেশ। ইতিহাস, প্রকৃতি আর স্থানীয় জীবন, তিনটাই এক ভ্রমণে মেলে বলেই বিরিশিরি আলাদা।

সেরা সময় নিয়ে ভাবলে শীতকালই সবচেয়ে নিরাপদ পছন্দ। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবহাওয়া শুষ্ক আর মনোরম থাকে, নদী পারাপার সহজ হয়, পাহাড়ি পথে হাঁটা আরামদায়ক হয়। বর্ষায় (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) সোমেশ্বরী ভরা থাকে, চারপাশ সবুজে ভরে ওঠে, কিন্তু নদীর স্রোত বাড়ে আর কাঁচা পথ কাদা হয়। তাই বর্ষায় গেলে স্থানীয়দের পরামর্শ নিয়ে, স্রোতের অবস্থা জেনে তবেই নদীতে নামা উচিত। গরমের সময় (মার্চ থেকে মে) দিনের বেলা রোদ কড়া থাকে, তাই সকাল আর বিকেলের দিকে ঘোরাঘুরি সাজানো ভালো।

কীভাবে যাবেন, সেটা সহজ। ঢাকা থেকে প্রথমে নেত্রকোনা বা ময়মনসিংহ হয়ে দুর্গাপুর যেতে হয়। ঢাকার মহাখালী থেকে নেত্রকোনা ও দুর্গাপুরের দিকে বাস চলে, আর ট্রেনে ময়মনসিংহ বা নেত্রকোনা নেমে সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে দুর্গাপুর যাওয়া যায়। দুর্গাপুর শহর থেকে বিরিশিরি খুব দূরে নয়, স্থানীয় রিকশা, অটো বা ভাড়া করা গাড়িতে পৌঁছানো যায়। সোমেশ্বরী পার হতে নৌকা ব্যবহার করতে হয়, আর বিজয়পুরের টিলা পর্যন্ত যাওয়ার পথে স্থানীয় গাইড নিলে সুবিধা হয়, কারণ কোন টিলায় ওঠা নিরাপদ আর কোনটা খনির এলাকা, সেটা স্থানীয়রাই ভালো জানেন। একদিনে ঘুরে আসা সম্ভব হলেও এক রাত থাকলে ভ্রমণটা আরামদায়ক হয়।

কী কী দেখবেন, তার তালিকাটা ছোট কিন্তু প্রতিটা জায়গাই মনে রাখার মতো। সোমেশ্বরী নদীর ঘাট আর বালুচর দিয়ে শুরু করুন। ভোরে নদীর পাড়ে দাঁড়ালে পাহাড়ের ওপর মেঘ জমতে দেখা যায়। এরপর বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড়। টিলার ওপর থেকে চারপাশের দৃশ্য দেখা যায়, তবে খনি এলাকায় সাবধানে চলতে হবে, ভেজা মাটিতে পা পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। রানীখং মিশন এলাকা শান্ত আর গাছপালায় ঘেরা, গির্জা আর মিশনের চারপাশ ঘুরে দেখা যায়। বিরিশিরি উপজাতীয় কালচারাল একাডেমিতে গারো সংস্কৃতির নানা নিদর্শন দেখা যায়, খোলা থাকলে সেটা অবশ্যই দেখে নেওয়া উচিত। সময় থাকলে দুর্গাপুরের পুরোনো জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ আর স্থানীয় হাট ঘুরে দেখুন, সেখানে এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আসল ছবিটা ধরা পড়ে।

কোথায় থাকবেন, এই প্রশ্নে বিরিশিরি বিলাসী গন্তব্য নয়, এটা মেনে নিয়ে পরিকল্পনা করাই ভালো। দুর্গাপুর শহরে সাধারণ মানের হোটেল আর গেস্ট হাউস আছে, আর বিরিশিরি এলাকায় কিছু ছোট আবাসন আছে। বড় শহরের মতো এসি রুম, রেস্টুরেন্ট আর সব সুবিধা এখানে আশা করা ঠিক নয়। যাঁরা আরাম চান, তাঁরা নেত্রকোনা শহরে থেকে দিনের বেলা বিরিশিরি ঘুরে আসতে পারেন। ভ্রমণের মৌসুমে, বিশেষ করে শীতের ছুটির দিনে, আগে থেকে থাকার জায়গা ঠিক করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ ভালো অপশন কম আর চাহিদা বেশি থাকে।

খাওয়া নিয়ে চিন্তা কম। দুর্গাপুর বাজারে স্থানীয় হোটেলে ভাত, মাছ, ডাল, সবজির সাধারণ বাঙালি খাবার মেলে। বিরিশিরি এলাকায় ছোট দোকানে চা, বিস্কুট, স্থানীয় খাবার পাওয়া যায়। যাঁরা বিশেষ কিছু খেতে চান, তাঁরা স্থানীয় বাজারে গারো সম্প্রদায়ের খাবারের খোঁজ নিতে পারেন, তবে সেটা আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো। সঙ্গে শুকনো খাবার আর পানি রাখুন, কারণ ঘোরাঘুরির জায়গাগুলোতে সবসময় দোকান মেলে না।

জনপ্রতি খরচের আনুমানিক রেঞ্জ এভাবে ধরা যায়। ঢাকা থেকে দুই দিনের ভ্রমণে বাজেট ধারায় খরচ পড়তে পারে জনপ্রতি ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে, যেখানে বাস ভাড়া, সাধারণ থাকা, স্থানীয় যাতায়াত আর সাধারণ খাবার ধরা আছে। মাঝারি ধারায়, ভালো থাকা আর ভাড়া গাড়ি মিলিয়ে, খরচ হতে পারে জনপ্রতি ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকা। তবে এই অঙ্ক মৌসুমভেদে বদলায়, ছুটির দিনে ভাড়া আর হোটেলের দাম বাড়ে। তাই যাওয়ার আগে বাস ভাড়া আর থাকার ভাড়া যাচাই করে নিন, আর হাতে কিছু বাড়তি টাকা রাখুন। বাজেট টিপস হিসেবে দল বেঁধে যাওয়া সবচেয়ে কার্যকর, কারণ গাড়ি আর থাকার খরচ ভাগ হয়ে যায়। অফ সিজনে গেলে খরচ কমে, আর স্থানীয় দোকানে খেলে খাবারের খরচও কমে।

নিরাপত্তা পরামর্শগুলো ছোট কিন্তু জরুরি। নদীতে নামার আগে স্রোতের অবস্থা স্থানীয়দের কাছে জেনে নিন, বর্ষায় সোমেশ্বরীতে স্রোত শক্তিশালী হয়। সাদা মাটির টিলায় ওঠার সময় শক্ত জুতো পরুন, ভেজা মাটি পিচ্ছিল হয়। সন্ধ্যার পর নির্জন পাহাড়ি পথে না ঘোরাই ভালো। সঙ্গে পরিচয়পত্র, পানি, প্রাথমিক ওষুধ আর মোবাইলে চার্জ রাখুন, কারণ সব জায়গায় নেটওয়ার্ক ভালো পাওয়া যায় না। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করুন, তাঁদের জমি, ফসল আর উপাসনালয়ের প্রতি সম্মান দেখান, ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন। এই কয়েকটা নিয়ম মানলেই বিরিশিরি ভ্রমণ হবে নিরাপদ আর মনে রাখার মতো।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার
← সব খবর দেখুন