শাকিব খানের সিনেমা নিয়ে কথা উঠলে যে কয়টি নাম বারবার ফিরে আসে, প্রিয়তমা তার একটি। ২০২৩ সালের ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া এই ছবি শুধু হলের ভিড়ের কারণে নয়, শেষের টুইস্ট আর গানগুলোর কারণেও দর্শকের মনে থেকে গেছে। অনেকেই এখনো খোঁজেন, সুমন আর ইতির গল্পের শেষটা আসলে কী হয়েছিল, আর ছবিটি এখন বৈধভাবে কোথায় দেখা যায়। এই গাইডে সেই প্রশ্নগুলোর যাচাই করা উত্তর একসঙ্গে রাখা হলো, সঙ্গে কাস্ট, গান, হলের প্রতিক্রিয়া আর সমালোচকদের মূল্যায়ন।
প্রিয়তমা পরিচালনা করেছেন হিমেল আশরাফ। ছবির গল্প লিখেছেন প্রয়াত ফারুক হোসেন, আর চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন ফারুক হোসেন ও হিমেল আশরাফ একসঙ্গে। প্রযোজনা করেছে ভার্সেটাইল মিডিয়া, প্রযোজক আরশাদ আদনান। প্রধান চরিত্রে আছেন শাকিব খান ও ইধিকা পাল, সঙ্গে শহীদুজ্জামান সেলিম, লুৎফর রহমান জর্জ, কাজী হায়াৎ, এলিনা শাম্মী, ডন ও শিবা শানু। প্রথম আলোর ছবি সংক্রান্ত তথ্যে ছবির ব্যাপ্তি ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট, চিত্রগ্রহণে সাইফুল শাহীন। মুক্তির তারিখ ২৯ জুন ২০২৩, ঈদুল আজহার দিন।
গল্পের শুরুটা রোমান্টিক ছবির মতো নয়, বরং একটি মৃত্যু দিয়ে। সুমনের ভাই সুজন আর তার ম্যানেজার শুরুতে মারা যান। সুজনের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলা হলেও সুমন বিশ্বাস করে, তার ভাইকে খুন করা হয়েছে। এরপর ভাইয়ের ব্যবসার পাওনা টাকা উদ্ধার আর মৃত্যুর রহস্য ভেদ করতে সুমন কক্সবাজারে আসে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে পাওনা টাকার অঙ্ক পাঁচ কোটি বলে উল্লেখ আছে। এই যাত্রাতেই ইতির সঙ্গে তার পরিচয় হয়, আর সেখান থেকে শুরু হয় দুজনের দুষ্টুমি, খুনসুটি আর প্রেম।
সুমন চরিত্রে শাকিব খানকে এখানে দুটি বয়সে দেখা যায়, তরুণ সুমন আর বহু বছর পরের বৃদ্ধ সুমন। এই দ্বৈত উপস্থিতিই গল্পের কাঠামোকে ধরে রাখে। ছবির শুরুতে বৃদ্ধ মানুষটির একাকিত্ব দেখা যায়, আর তারপর ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে যাওয়া হয় তরুণ সুমনের জীবনে। দর্শক প্রথমে বোঝেন না, এই বৃদ্ধ মানুষটির অতীতে কী এমন ঘটেছিল যার জন্য তিনি একা হয়ে গেলেন। উত্তরটা আসে ধীরে ধীরে, আর শেষের দিকে এসে পুরো গল্পের মোড় ঘুরে যায়।
ইতি চরিত্রে ইধিকা পালের এটি ছিল বাংলাদেশের ছবিতে প্রথম কাজ। কলকাতার এই অভিনেত্রীকে এখানে সরল, প্রাণবন্ত এক তরুণী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার ভুলভাল ইংরেজি বলা, চোখ বড় করে তাকানো আর সুমনের সঙ্গে খুনসুটি দর্শকের পছন্দ হয়েছিল বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ইধিকার চরিত্রটি শুধু নায়িকার ভূমিকায় সীমাবদ্ধ নয়, গল্পের আবেগের কেন্দ্রও সে। সুমনের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ইতির মাধ্যমেই।
শহীদুজ্জামান সেলিম এখানে ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ ও খল চরিত্রের ধাঁচে আছেন, যার সঙ্গে সুমনের পরিবারের পাওনা আর দ্বন্দ্ব জড়িয়ে। প্রথম আলোর মূল্যায়নে সেলিমের অভিনয় সাবলীল ছিল, এমনকি তার মুখে আধো আধো কক্সবাজারের আঞ্চলিক বুলি শুনে দর্শক বিনোদিত হয়েছিলেন বলেও লেখা হয়েছে। লুৎফর রহমান জর্জ ইতির বাবার চরিত্রে, কাজী হায়াৎ সুমনের বাবার চরিত্রে, আর এলিনা শাম্মী সুমনের ভাইয়ের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। পার্শ্ব চরিত্রগুলো গল্পের পারিবারিক ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বকে এগিয়ে নেয়।
গল্পের মাঝামাঝি অংশে দুটি সুতো একসঙ্গে চলে, ভাইয়ের খুনিকে খোঁজা আর সুমন ও ইতির প্রেম। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই দুই গল্প সমান্তরালে না টানলেও শেষের দিকে এসে পরিচালক সব পুষিয়ে দিয়েছেন। বিরতির আগে ছবি কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছিল, কিন্তু বিরতির পর দর্শক আর আগে থেকে আন্দাজ করতে পারছিলেন না ঘটনা কোন দিকে মোড় নেবে। বাণিজ্যিক বাংলা ছবিতে এমন অনিশ্চয়তা ধরে রাখা সহজ নয়, আর এখানেই পরিচালকের মুন্সিয়ানা দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
এবার শেষের অংশ, যেখানে স্পয়লার আছে। যারা ছবিটি এখনো দেখেননি, তারা এই অনুচ্ছেদটি এড়িয়ে যেতে পারেন। সুমন আর ইতির প্রেম যখন গভীর হয়, তখনই আসে বিচ্ছেদ। ইতি হঠাৎ সরে যায়, আর সুমন জানতে পারে সে অন্য কাউকে বিয়ে করতে যাচ্ছে। কিন্তু আসল সত্য অন্যরকম। ইতি একটি দুরারোগ্য অসুখে ভুগছিল, আর সুমনকে কষ্ট থেকে বাঁচাতে সে নিজের অসুখের কথা লুকিয়ে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সুমন যখন সত্যটা জানতে পারে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইতির মৃত্যুর পর সুমন তার স্মৃতি নিয়েই বাকি জীবন কাটিয়ে দেয়, আর ছবির শেষ দৃশ্যে বৃদ্ধ সুমনের একাকিত্ব সেই অপেক্ষারই প্রতিচ্ছবি।
এই শেষটাই প্রিয়তমাকে শুধু প্রেমের ছবি থেকে ট্র্যাজেডিতে বদলে দেয়। দর্শকের মনে থেকে যাওয়া দৃশ্যগুলোর একটি হলো শেষের গান, যেখানে ঈশ্বর কি তোমার আমার মিলন লিখতে পারত না লাইনটি বাজে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, এই গানের সময় অনেক দর্শকের চোখে পানি দেখা গেছে, আর ছবি শেষ হওয়ার পরও লাইনটি কানে বেজেছে। প্রেম, বিচ্ছেদ আর অপেক্ষা, এই তিনটি অনুভূতিই শেষের অংশে একসঙ্গে কাজ করে।
গান প্রিয়তমার আরেকটি বড় শক্তি। টাইটেল গান ও প্রিয়তমা বালাম ও কোনালের কণ্ঠে, গীতিকার আসিফ ইকবাল, সুরকার আকাশ সেন, মুক্তির আগেই ও পরে তুমুল জনপ্রিয় হয়। কোরবানি কোরবানি গানটি শাকিব খানের এন্ট্রি আর উৎসবের আবহকে জমিয়ে তোলে। আর শেষের ঈশ্বর গানটি ছবির আবেগের চূড়ান্ত মুহূর্তকে ধরে রাখে। গানগুলো শুধু ছবির ভেতরে নয়, ছবির বাইরেও দর্শকের মুখে মুখে ফিরেছে, আর এটাই প্রিয়তমার দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তার একটি কারণ।
হলের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রিয়তমার সাফল্যের সবচেয়ে চোখে পড়ার দিক। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে মধুমিতা হলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা লেখা হয়েছে, যেখানে ছয়টার শো শুরুর এক ঘণ্টা আগেই টিকিট শেষ হয়ে গিয়েছিল, আর শো শুরুর পাঁচ মিনিট আগে তিন গুণ দামে টিকিট মিলেছিল। যশোরের মণিহার প্রেক্ষাগৃহেও ছবি চলার খবর প্রতিবেদনে আছে। ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, মুক্তির অনেক সপ্তাহ পরও ছবিটি বাংলাদেশের পঞ্চাশটির বেশি হলে চলছিল, আর যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড ও ভারতসহ বিদেশেও প্রদর্শিত হচ্ছিল।
সমালোচকদের মূল্যায়ন মিশ্র হলেও ইতিবাচক দিকগুলো স্পষ্ট। প্রথম আলোর শিরোনামেই ছিল পয়সা উশুল সিনেমা প্রিয়তমা। প্রতিবেদনে শাকিব খানের নতুন লুক, এক্সপ্রেশন ও সংলাপের প্রশংসা করা হয়েছে, আর বলা হয়েছে এ যেন পরিপূর্ণ এক শাকিব খান। ইধিকা পালের প্রথম ছবি হিসেবে অভিনয়েরও প্রশংসা করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে, রোজার ঈদের পর শুটিং শুরু করে কোরবানির ঈদে ছবি মুক্তি দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, তাই ছবিতে ছোটখাটো কিছু ভুল ছিল। সেই ভুলগুলো উপেক্ষা করলে ছবিটি দর্শককে বিনোদন দেওয়ার মতো পরিপূর্ণ কাজ বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।
প্রিয়তমার সাফল্যের পেছনে সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে শাকিব খানের ক্যারিয়ারে এটি একটি মোড় ঘোরানো ছবি হিসেবে আলোচিত হয়। দীর্ঘদিন পর এমন একটি ট্র্যাজিক প্রেমের গল্পে তাকে ভিন্ন লুকে দেখা গিয়েছিল, আর ইধিকা পালের আগমন নতুন জুটির আগ্রহ তৈরি করেছিল। ছবির গল্প পরিচিত মনে হলেও শেষের টুইস্ট আর গানগুলো দর্শককে হলে ধরে রেখেছিল। এই কারণেই প্রিয়তমা শুধু একটি ঈদের ছবি হয়ে থাকেনি, বরং পরের বছরগুলোতেও খোঁজা হতে থাকে।
কোথায় দেখবেন, এই প্রশ্নের যাচাই করা উত্তরটি ইতিহাসের দিক থেকে স্পষ্ট, আর বর্তমান অবস্থার দিক থেকে সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া উচিত। ডেইলি স্টার ২০২৩ সালের আগস্টে জানিয়েছিল, প্রিয়তমা ওটিটিতে আসছে, আর বায়োস্কোপ প্ল্যাটফর্মে ছবিটির অভিষেক হবে বলে তখন ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ছবিটির বৈধ ওটিটি অভিষেক হয়েছিল বায়োস্কোপে। তবে ২০২৬ সালে এসে কোনো প্ল্যাটফর্মের ক্যাটালগ বদলে যেতে পারে, তাই এখন দেখতে চাইলে সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার আগে বায়োস্কোপের বর্তমান ক্যাটালগে ছবিটি আছে কিনা যাচাই করে নেওয়াই নিরাপদ। পাইরেসি সাইট, টরেন্ট বা টেলিগ্রাম লিংক থেকে ছবি দেখা বৈধ নয়, আর এই গাইডে সেসবের কোনো সন্ধান দেওয়া হয়নি।
প্রিয়তমা দেখার আগে কয়েকটি বিষয় মনে রাখলে অভিজ্ঞতা ভালো হবে। প্রথমত, এটি সরাসরি প্রেমের ছবি নয়, শেষটা ট্র্যাজিক, তাই হালকা মেজাজের ছবি আশা করে বসলে শেষের অংশ ভারী লাগতে পারে। দ্বিতীয়ত, গল্পের প্রথম অংশে ভাইয়ের মৃত্যুর রহস্য আর ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের দিকে মনোযোগ দিলে শেষের টুইস্ট বেশি অর্থবহ হয়। তৃতীয়ত, গানগুলো ছবির আবেগের অংশ, তাই গান এড়িয়ে গেলে শেষের মুহূর্তের অনেকটাই হারিয়ে যায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর এখানে রাখা হলো। প্রিয়তমা কবে মুক্তি পায়, ২৯ জুন ২০২৩, ঈদুল আজহায়। পরিচালক কে, হিমেল আশরাফ। নায়িকা কে, ইধিকা পাল, ইতির চরিত্রে, এটি তার বাংলাদেশের ছবিতে প্রথম কাজ। শেষে কী হয়, ইতির লুকানো অসুখের সত্য জানার পর তার মৃত্যু হয়, আর সুমন তার স্মৃতি নিয়ে একা জীবন কাটায়। ছবিটি কতক্ষণের, প্রথম আলোর তথ্যে ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট। কোথায় বৈধভাবে দেখা গিয়েছিল, ২০২৩ সালে বায়োস্কোপে ওটিটি অভিষেক হয়েছিল, বর্তমান ক্যাটালগ যাচাই করে নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে প্রিয়তমা একটি সহজ গল্পের ছবি, যার শক্তি তার শেষের মোড় আর গানে। শাকিব খানের ভিন্ন লুক, ইধিকা পালের অভিষেক, সুমন ও ইতির প্রেম, আর বিচ্ছেদের পর দীর্ঘ অপেক্ষা, এই উপাদানগুলো মিলেই ছবিটিকে মনে রাখার মতো করেছে। যারা এখনো দেখেননি, তারা বৈধ প্ল্যাটফর্মে ছবিটি দেখে নিজেরাই বিচার করতে পারেন, শেষের গানটি কেন এতদিন পরও দর্শকের কানে বাজে।
