বিনোদন ঝলক
তারকা

৩৪-এ পরীমনি: তারকাখ্যাতি আছে, তবু সুপারস্টার হওয়ার পথে বাধা কোথায়

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৫ অক্টোবর ২০২৬6 মিনিটে পড়ুন
পরীমনির জন্মদিন ও ক্যারিয়ার নিয়ে গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

শুক্রবার দিবাগত রাত বারোটা পেরোতেই দুই সন্তানকে পাশে নিয়ে জন্মদিনের কেক কাটলেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। চব্বিশে অক্টোবর তাঁর ৩৪তম জন্মদিন। ছোট্ট এই ঘরোয়া মুহূর্তের মধ্যেই ধরা পড়ল তাঁর জীবনের বড় এক পরিবর্তন। একসময় যাঁর জন্মদিন মানেই ছিল ঢালিউডের বাড়তি আয়োজন, তিনি এখন সন্তানদের ঘিরেই দিনটি উদযাপন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

এই বিশেষ রাতে তাঁর সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছে নানাকে। শামসুল হক গাজী বেঁচে থাকতে ঘুম থেকে তুলে তাঁকে কেক কাটাতেন। সেই স্মৃতি মনে করে পরীমনি বলেছেন, নানা বেঁচে থাকতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে কেক কাটতেন। এখন তো আমার সেই মানুষটা নেই। মনে পড়লে কান্না পায়। ২০২৩ সালে নানাকে হারানোর পর থেকে জন্মদিনের উচ্ছ্বাসে কিছুটা ভাটা পড়েছে, সেটা তিনি নিজেও বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন।

শনিবার সন্ধ্যায় বন্ধুবান্ধব ও কাছের মানুষদের নিয়ে রাজধানীর পূর্বাচলের একটি রেস্তোরাঁয় আড্ডার আয়োজন করেছিলেন পরীমনি। এর নাম দিয়েছিলেন শিউলিসন্ধ্যা। অক্টোবর, অর্থাৎ শরৎকালে জন্মদিন বলেই শিউলি ফুল ছিল এবারের থিম। নিজের ডিজাইন করা কমলা রঙের শাড়িতে হাতে আঁকা শিউলি ফুলের নকশা ছিল, আর তাতে চুমকির কাজ মিলিয়েছিলেন শাড়ির রঙের সঙ্গে। এই সাজপোশাকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই ভক্তদের প্রশংসায় ভরে ওঠে মন্তব্যের ঘর।

একসময় পরীমনির জন্মদিন মানেই ছিল পাঁচ তারকা হোটেলের ঝলমলে পরিবেশ, থিম ধরে সাজপোশাক, তারকাদের উপস্থিতি, কেক কাটা আর নাচ গান। কখনো বিমানের কেবিন ক্রুর সাজে, কখনো ব্যতিক্রমী পোশাকে হাজির হয়ে অতিথিদের চমকে দিতেন তিনি। সেই আয়োজনের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে উদযাপনের ধরন, বদলেছে তাঁর ব্যক্তিজীবনের চিন্তাভাবনাও। এখনো সাড়ম্বরে জন্মদিন পালন করেন, তবে পরিসর আগের চেয়ে ছোট করে নিয়েছেন।

১৯৯২ সালের ২৪ অক্টোবর সাতক্ষীরায় জন্ম পরীমনির। তাঁর পুরো নাম শামসুন্নাহার স্মৃতি। বাবা মনিরুল ইসলাম, মা সালমা সুলতানা। মাত্র তিন বছর বয়সে মাকে হারান তিনি। এরপর পিরোজপুরে নানাবাড়িতে বড় হন। নানা শামসুল হক গাজী ছিলেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ও সাহসের নাম। শৈশবের সেই আশ্রয় পরবর্তী সময়ে পরীমনির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।

অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছোটবেলায় নাচ শিখেছিলেন পরীমনি। বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টসে ভর্তি হয়েছিলেন, যদিও খুব বেশি দিন সেখানে থাকেননি। তবে অল্প দিনের নাচ শেখার অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়জীবনের পথ চলতে পরে বেশ সহায়ক হয়। টেলিভিশন নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান প্রথমে। প্রথম নাটক সেকেন্ড ইনিংস। এরপর অভিনয় করেছেন এক্সক্লুসিভ ও এক্সট্রা ব্যাচেলরের মতো নাটকে। ধীরে ধীরে বড় পর্দার দিকে এগিয়ে যান তিনি।

২০১৫ সালে শাহ আলম মণ্ডল পরিচালিত ভালোবাসা সীমাহীন ছবির মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় পরীমনির। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন জায়েদ খান। চলচ্চিত্রে নাম লেখানোর আগেই অনেকগুলো ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। একই সময়ে নজরুল ইসলাম খানের রানা প্লাজা ছবিতে অভিনয়ের খবরও তাঁকে আলোচনায় রাখে, তবে ছবিটির মুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। শুরুর দিকে পরীমনিকে ঘিরে প্রত্যাশা ছিল অনেক। তাঁর সৌন্দর্য, পর্দা উপস্থিতি ও নাচের দক্ষতা তাঁর পরিচিতি দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।

পরীমনির অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি সিনেমা গিয়াস উদ্দিন সেলিম পরিচালিত স্বপ্নজাল। ছবিতে শুভ্রা চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রশংসা পান। এই সিনেমায় পরীমনির বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন ইয়াশ রোহান। এখানে গ্ল্যামারনির্ভর নায়িকার পরিচয়ের বাইরে চরিত্রের আবেগ, দ্বন্দ্ব ও সংকট তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন। দর্শক ও সমালোচকদের কাছে ছবিটি তাঁকে নতুনভাবে পরিচিত করে। মালেক আফসারি পরিচালিত অন্তর জ্বালা ছবিতেও অভিনয় নিয়ে নিজের সন্তুষ্টির কথা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন পরীমনি। তাঁর অভিনীত অন্য ছবির মধ্যে রয়েছে ওয়াজেদ আলী সুমনের রক্ত, চয়নিকা চৌধুরীর বিশ্বসুন্দরী, আবু রায়হান জুয়েলের অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন, গিয়াস উদ্দিন সেলিমের গুণিন ও অরণ্য আনোয়ারের মা। বিশেষ করে মা ছবিতে সন্তান হারানো এক মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি, চরিত্রটি তাঁর জন্য ছিল ভিন্ন ধরনের এক অভিজ্ঞতা।

এক দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে পরীমনি পেয়েছেন তারকাখ্যাতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল অনুসারী ও আলোচনার কেন্দ্রে থাকার নানান অভিজ্ঞতা। ফেসবুকে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা এক কোটি সত্তর লাখের বেশি। নতুন নতুন পোশাক, ফটোশুট, ভ্রমণ, ব্যক্তিগত অনুভূতি, সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর ছবি কিংবা নতুন কাজের খবর, বিভিন্ন বিষয় নিয়মিত ভাগ করে নেন তিনি। ফলে নতুন ছবি মুক্তি না পেলেও তাঁকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ বরাবরই থাকে। কিন্তু চলচ্চিত্রে পরীমনির সেই জনপ্রিয়তার প্রতিফলন কতটা ঘটেছে, প্রশ্নটি কিন্তু রয়ে গেছে।

পরীমনির ক্ষেত্রে ব্যক্তিজীবনের খবর প্রায়ই তাঁর অভিনীত কাজের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। ২০২১ সালের আগস্টে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার ও কারাবাস ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। সে বছরের ১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরও সেই ঘটনা নিয়ে আজ পর্যন্ত আলোচনা থামেনি। ব্যক্তিজীবনে একাধিক সম্পর্ক ও বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। পরিচালক কামরুজ্জামান রনির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল ২০২০ সালে, পরে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। এরপর গুণিন ছবিতে কাজ করতে গিয়ে অভিনেতা শরীফুল রাজের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০২১ সালে তাঁরা বিয়ে করেন। ২০২২ সালের আগস্টে তাঁদের ছেলে রাজ্যর জন্ম হয়। তবে সেই সংসারও স্থায়ী হয়নি। দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন ও বিচ্ছেদের পর পরীমনি এককভাবে সন্তানকে বড় করার দায়িত্ব পালন করছেন। ছেলের নামও পরে পরিবর্তন করে শাহীম মুহাম্মদ পুণ্য রাখা হয়। পাশাপাশি একটি কন্যাশিশুর অভিভাবকত্ব নিয়েছেন পরীমনি। দুই সন্তানকে ঘিরে এখন তাঁর ব্যক্তিজীবনের বড় একটি অংশ আবর্তিত হচ্ছে।

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও কাজ করেছেন পরীমনি। রঙিলা কিতাব ওয়েব সিরিজে অভিনয় করে নতুন মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দেন তিনি। এ ছাড়া কলকাতার ফেলুবক্সী ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে টালিউডেও অভিষেক ঘটে তাঁর। এসব কাজ তাঁর অভিনয়জীবনের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। দেশের চলচ্চিত্রের বাইরে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে নতুন মাধ্যমে কাজ করাই শেষ কথা নয়। চরিত্র নির্বাচন, চিত্রনাট্যের মান এবং অভিনয়ের গভীরতা, এসব ক্ষেত্রেই তাঁকে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করতে হবে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সালতামামিতে বলা হয়েছিল, আগের বছর বিনোদন অঙ্গনের হিসাবনিকাশে পরীমনির নতুন কোনো সিনেমা মুক্তি পায়নি। ডোডোর গল্প ছবির শুটিং শেষ হলেও মুক্তির বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ আলোচনায় থাকলেও নতুন সিনেমা নিয়ে দর্শকের সামনে নিয়মিত হাজির হতে পারেননি তিনি। এখানেই পরীমনির অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল অনুসারী থাকা মানেই প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানার নিশ্চয়তা নয়। তারকাখ্যাতি একজন অভিনয়শিল্পীকে পরিচিতি দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান তৈরি করে তাঁর কাজ। ভালো চিত্রনাট্য, উপযুক্ত পরিচালক, মনে রাখার মতো চরিত্র এবং অভিনয়ের ধারাবাহিকতা, সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

এদিকে শোনা যাচ্ছে, খুব শিগগির পরীমনিকে নতুন একটি সিনেমায় দেখা যেতে পারে, যে সিনেমায় তাঁর বিপরীতে থাকবেন ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। এ বছরে ছবিটির শুটিং শুরুর কথা রয়েছে। এই খবর সত্যি হলে সেটা হতে পারে পরীমনির ক্যারিয়ারের নতুন মোড়। ৩৪ বছরে পা দিয়ে তাঁর সামনে তাই দুটি বাস্তবতা। একদিকে তিনি ঢালিউডের পরিচিত ও আলোচিত মুখ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী তারকাদের একজন। অন্যদিকে তাঁর অভিনয়জীবনে এমন ধারাবাহিক সাফল্যের অভাব রয়েছে, যা তাঁকে নিঃসন্দেহে শীর্ষ সারির অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। স্বপ্নজাল কিংবা মার মতো ছবিতে যে সম্ভাবনা দেখা গেছে, তা আরও বেশি কাজে লাগানোই হতে পারে তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার