দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে মনোজ বাজপেয়ী। সমালোচনা, প্রত্যাখ্যান আর কঠিন চরিত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয় বহু পুরোনো। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে পড়লে পরিস্থিতি যে ভিন্ন হয়ে যায়, তা এবার নিজের মুখেই জানালেন তিনি। সম্প্রতি সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন মনোজ।
বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল তাঁর ছবি 'গজব রাত' এর আগের নাম 'ঘুষখোর পণ্ডিত'। চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে নেটফ্লিক্সের ছবিটির নাম 'ঘুষখোর পণ্ডিত' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। নামটি প্রকাশ্যে আসার পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় বিতর্ক। একাধিক রাজনীতিক ও সংগঠন ছবির নামকে জাতপাতভিত্তিক বিদ্বেষমূলক ও আপত্তিকর বলে সমালোচনা করেন। নাম নিয়ে এই বিতর্ক দ্রুত ছবির গণ্ডি ছাড়িয়ে অভিনেতা ও নির্মাতাদের দিকে চলে যায়।
বিতর্কের জেরে শেষ পর্যন্ত ছবির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'গজব রাত'। কিন্তু নাম বদলালেও বিতর্কের রেশ কাটেনি। বরং ছবির সঙ্গে যুক্ত অভিনেতা মনোজ বাজপেয়ী ও নির্মাতাদের ঘিরে অনলাইন সমালোচনা আরও তীব্র হয়। এই পর্যায়েই আক্রমণের লক্ষ্য হয়ে ওঠেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। মনোজ জানিয়েছেন, যখন তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে আক্রমণ করা হয়, তখন তিনি অপমানিত ও অসহায় বোধ করছিলেন।
সাক্ষাৎকারে মনোজের বক্তব্য খুবই সরল, কিন্তু তার ভেতরে একজন বাবা ও স্বামীর যন্ত্রণা স্পষ্ট। তিনি বলেন, একজন অভিনেতা হিসেবে সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে তিনি অভ্যস্ত। নিজেকে নিয়ে যত খারাপ কথাই বলা হোক, তা তিনি মেনে নিতে পারেন। কারণ, তাঁর পথচলা প্রত্যাখ্যান থেকে শুরু করে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তাই এখন তিনি অনেকটাই সহনশীল হয়ে উঠেছেন। কিন্তু সেই আক্রমণ যখন পরিবারের সদস্যদের দিকে ধেয়ে আসে, তখন তা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছিল যে বিষয়টি, তা হলো পরিবারের ছবি প্রকাশ করে তাঁদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা। মনোজের ভাষ্যমতে, যে বিষয়টি তাঁকে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ও ভীষণভাবে অপমানিত করেছিল, তা হলো তাঁর পরিবারের ছবি প্রকাশ করতে শুরু করা এবং তাঁদের নিয়ে নানা কথা বলা। একজন জনপ্রিয় অভিনেতার পরিবার হওয়ার মূল্য যে কতটা ব্যক্তিগত হতে পারে, এই অভিজ্ঞতা সেটাই সামনে এনেছে।
এই পরিস্থিতিতে আরও একটি দিক তাঁকে অসহায় করে তুলেছিল: আক্রমণকারীদের পরিচয়। মনোজ জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনলাইনে আক্রমণকারীরা ছিলেন নাম পরিচয়হীন ট্রোলার। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করতে চাইলেও কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছিলেন অভিনেতা। কাদের মুখোমুখি হবেন, এই প্রশ্নের উত্তর না থাকায় প্রতিবাদের পথও আটকে যাচ্ছিল। অথচ নিজের স্বভাবের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি সাধারণত সহজভাবে জীবন কাটাতে, আনন্দে থাকতে এবং হাসিখুশি থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু কাছের মানুষদের রক্ষা করার প্রশ্ন এলে তিনি প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।
মনোজের পারিবারিক পরিচয় এখানে প্রাসঙ্গিক, কারণ আক্রমণটা ঠিক সেই জায়গাতেই লেগেছিল। অভিনেত্রী শাবানার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ মনোজ। 'কারিব' ও 'ফিজা'র মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন শাবানা। তাঁদের এক কন্যা সন্তান রয়েছে। অর্থাৎ, যাঁরা নিজেরা কখনো আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে চাননি, তাঁরাও ছবির নাম নিয়ে বিতর্কের আঁচে এসে পড়েছিলেন।
বিতর্ক পেরিয়ে গত ২৩ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে 'গজব রাত'। রীতেশ শাহ পরিচালিত ছবিটি প্রযোজনা করেছে নীরজ পাণ্ডের সংস্থা ফ্রাইডে স্টোরিটেলার্স। ছবির গল্পে অজয় নামের এক পুলিশ কর্মকর্তার জীবনের একটি রাতকে কেন্দ্র করে ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে। আহত এক নারীকে সাহায্য করতে গিয়ে তিনি জড়িয়ে পড়েন উচ্চপর্যায়ের ষড়যন্ত্রে। এরপর এক রাতের মধ্যেই তাঁকে মোকাবিলা করতে হয় বিপজ্জনক পরিস্থিতি ও প্রাণঘাতী সংঘাতের।
ছবিটিতে মনোজ বাজপেয়ীর পাশাপাশি অভিনয় করেছেন দিব্যা দত্ত, সাকিব সেলিম, শ্রদ্ধা দাস ও অক্ষয় অবেরয়। বিশেষ উপস্থিতিতে রয়েছেন কিকু শারদা ও নুসরাত ভারুচা। অর্থাৎ, বিতর্কের ছায়া পেরিয়ে ছবিটি এখন দর্শকের সামনে, আর মনোজের সাক্ষাৎকার সেই ছবির পেছনের ব্যক্তিগত মূল্যটুকু সামনে এনেছে।
এই ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা শুধু একটি ছবির নাম বদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামনে এনেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত মর্যাদা ও পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নটিকেও। কোনো ছবির নাম নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে, সমালোচনা হতে পারে, কিন্তু সেই সমালোচনা যখন অভিনেতার পরিবারের ছবি ও ব্যক্তিগত জীবনে গিয়ে পৌঁছায়, তখন বিতর্কের সীমা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মনোজের অভিজ্ঞতা সেই সীমারেখা নিয়েই ভাবতে বাধ্য করে। নাম বদলালেও বিতর্কের আড়ালে পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা অভিনেতার কাছে যে কতটা বেদনাদায়ক ছিল, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট।
