পশ্চিমবঙ্গের সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, সংক্ষেপে এসআরএফটিআই, এর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ালেন বর্ষীয়ান অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। শনিবার ফেসবুকে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় তিনি সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন এবং দলটিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তাঁর এই বার্তা প্রকাশের পর থেকেই চলচ্চিত্র জগৎ ও শিক্ষাঙ্গনের বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ভিডিওবার্তায় ৭৬ বছর বয়সী এই অভিনেতা বিজেপিকে 'রক্তচোষা মিথ্যাবাদী দল' বলে উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, দলটির বিশ্বাস ও নীতির সঙ্গে যারা একমত নন, তাদেরই নিশানা করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে কারসাজির মাধ্যমে জয় পাওয়ার পর বিজেপি এখন ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বলেও তিনি দাবি করেন। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু একটি ক্যাম্পাস আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়াননি, বরং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক আবহ নিয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন।
কী নিয়ে এই আন্দোলন, তা বুঝতে পেছনের ঘটনাগুলো দেখা দরকার। এসআরএফটিআইয়ের শিক্ষার্থীরা গত ১২ অক্টোবর থেকে প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য সন্তোষ আজমেরার কার্যালয়ের সামনে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। তাঁদের দাবি দুটি মূল বিষয়কে ঘিরে: ক্যাম্পাসে সহিংসতার ঘটনায় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং উপাচার্যের পদত্যাগ। অর্থাৎ, পড়ুয়ারা শুধু একটি ঘটনার প্রতিবাদ করছেন না, তাঁরা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত গত ২৭ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। সেদিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের সদস্যদের সংঘর্ষ হয়। এরপর ৪ অক্টোবর বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের আয়োজিত প্রতিবাদের সময়ও ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়ায়। অভিযোগ ওঠে, পুলিশ বাধা দিলে কয়েকজন বিক্ষোভকারী প্রতিষ্ঠানের ফটক জোর করে খোলার চেষ্টা করেন। এই দুটি ঘটনার পর ক্যাম্পাসের পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পড়ুয়াদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
নাসিরুদ্দিন শাহের ভিডিওবার্তায় সবচেয়ে জোরালো অংশটি হলো পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের অভিযোগ। তিনি বলেন, প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চাওয়ায় শিক্ষার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে, হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাঁদের হল ছাড়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। একজন অভিনেতার মুখে এই অভিযোগগুলো উঠে আসায় বিষয়টি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা বৃহত্তর বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
এরপর ১৬ অক্টোবর কর্তৃপক্ষ একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। সেই বিজ্ঞপ্তিতে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত চলচ্চিত্র, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়া বিভাগের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং সহিংসতার ঘটনায় জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ফলে ক্লাস বন্ধ থাকলেও আন্দোলনের প্রশ্নগুলো এখনো খোলা রয়ে গেছে।
নাসিরুদ্দিন শাহের বার্তায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। বিজেপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, দলটি নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালাতেই সন্তুষ্ট নয়, এবার দেশের ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরও প্রভাবিত করতে কিংবা ভয় দেখাতে চাইছে। তবে তা সফল হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, এই তরুণেরাই ভবিষ্যতে নিজেদের, দেশ এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতির সত্য তুলে ধরবেন। একই সঙ্গে সচেতন নাগরিকদের শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
কেন এই খবর গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এসআরএফটিআইয়ের পরিচয়ের মধ্যেই। এটি দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে ভবিষ্যতের পরিচালক, চিত্রগ্রাহক ও সম্পাদকরা তৈরি হন। সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের বিষয় থাকে না। তা চলচ্চিত্র শিক্ষার পরিবেশ, সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দেয়। নাসিরুদ্দিন শাহের মতো একজন প্রবীণ শিল্পীর এগিয়ে আসা সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
এরপর কী হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। শিক্ষার্থীরা তাঁদের দাবিতে অনড় রয়েছেন, আর কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। উপাচার্যের পদত্যাগ, ক্যাম্পাস সহিংসতার তদন্ত এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে কোনো নতুন সিদ্ধান্ত আসে কিনা, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। একই সঙ্গে নাসিরুদ্দিন শাহের মন্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া কী দাঁড়ায়, তাও এই বিতর্কের পরবর্তী অধ্যায় ঠিক করবে।
