বাংলাদেশের প্রতিদিনের বিনোদন পোর্টাল
বিনোদন ঝলক

দেশি-বিদেশি নাটক, সিনেমা ও সিরিজের প্রতিদিনের বিনোদন খবর

সিনেমা

কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত কোথায় দেখবেন: জিৎ-এর অনন্ত সিং, জি৫ স্ট্রিমিং, গল্প আর আসল ইতিহাস

বিনোদন ঝলক ডেস্ক৬ নভেম্বর ২০২৬12 মিনিটে পড়ুন
কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত গাইডের থাম্বনেইল
কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত: জিৎ-এর অনন্ত সিং, জি৫-এ কোথায় দেখবেন (ছবি: বিনোদন ঝলক)

জিৎ-এর নতুন ছবি কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত এখন দেখা যাচ্ছে জি৫-এ। পথিকৃৎ বসুর পরিচালনায় ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল ১৪ আগস্ট ২০২৬, আর এখন সেটি জি৫-এ স্ট্রিমিং হচ্ছে। ছবির কেন্দ্রে অনন্ত সিং, একজন বিপ্লবী যিনি স্বাধীনতার পর ডাকাত হয়ে ওঠেন, আর এই দুই পরিচয়ের দ্বন্দ্বই ছবির মূল প্রশ্ন। এই গাইডে ছবিটি কোথায় কীভাবে দেখবেন, গল্পটা কী, আসল ইতিহাস কতটা আছে, কারা অভিনয় করছেন আর দেখার আগে যা জানা দরকার, সব এক জায়গায় সাজানো হলো।

কোথায় দেখবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর সোজা: জি৫-এ। জি৫-এর অফিশিয়াল পেজ অনুযায়ী, ছবিটি সেখানে বাংলা ভাষায় দেখা যাচ্ছে, দেখতে একটি বৈধ সাবস্ক্রিপশন লাগবে। ছবির দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ১৬ মিনিট, ধরন জীবনীভিত্তিক অ্যাকশন। জি৫-এর অ্যাপ বা ওয়েবসাইট থেকে ছবিটি খুঁজে দেখা যায়। সাবস্ক্রিপশনের দাম আর উপলব্ধতা অঞ্চলভেদে বদলায়, তাই নির্দিষ্ট দাম এখানে লেখা হলো না, জি৫-এর নিজের পেজে গিয়ে নিজের অঞ্চলের দাম মিলিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়। যারা প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি দেখতে পারেননি, তাদের জন্য জি৫-ই এখন মূল ঠিকানা।

গল্পের কেন্দ্রে অনন্ত লাল সিং, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিৎ। গল্পটি এগোয় দুটি সময়রেখায়। একদিকে তরুণ বিপ্লবী অনন্ত, যিনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুট আর স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে স্বাধীনতার পরের কলকাতায় ১৯৬০-এর দশকের অনন্ত, যিনি তখন পুলিশের তাড়া খাওয়া এক পলাতক, আর তার পেছনে ছুটছেন পুলিশ কর্মকর্তা দুর্গা রায়। একসময় যিনি বিপ্লবী হিসেবে বন্দিত হয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর তিনি হয়ে উঠলেন ডাকাত, এই রূপান্তরই ছবির মূল প্রশ্ন। ছবিটি সরাসরি বলে দেয় না, অনন্ত নায়ক নাকি অপরাধী, বরং দর্শককে তার জগতে নিয়ে গিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে বলে।

ছবির শিরোনামটাই এর মূল দ্বন্দ্বকে ধরে রেখেছে: কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত। একই মানুষ, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়। স্বাধীনতার লড়াইয়ে যিনি বন্দুক হাতে নিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর সেই একই মানুষ যখন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, তখন তাকে ডাকাত বলা হলো। ছবিটি এই প্রশ্নটাই তুলছে, বিপ্লব শেষ হলে বিপ্লবীর কী হয়, আর একজন মানুষকে কখন নায়ক বলা হয়, কখন অপরাধী। এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর ছবিতে নেই, আর সেটাই ছবিটিকে শুধু অ্যাকশন ছবির চেয়ে বেশি কিছু করে তুলেছে।

গল্পের ভিত্তি আসল ইতিহাস। অনন্ত সিং ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনের সহযোগী, ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুটের অন্যতম পরিকল্পনাকারী। জি৫-এর ব্লগ অনুযায়ী, সূর্য সেন ছিলেন সেই দূরদর্শী কৌশলবিদ, যিনি বাংলার তরুণদের সংগঠিত করে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আর অনন্ত সিং ছিলেন তার কৌশলগত মস্তিষ্ক, দক্ষ সংগঠক, নিখুঁত নিশানাবাজ আর সাহসী মাঠকর্মী, যিনি ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অভিযানের পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নে সাহায্য করেছিলেন। অস্ত্রাগার লুটের পর শুরু হয়েছিল কঠোর দমন অভিযান, অনেক বিপ্লবীকে কারাদণ্ড, নির্বাসন বা মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়েছিল। মাস্টারদা ধরা পড়ে শহীদ হন, আর অনন্ত সিং আন্দামানের সেলুলার জেলে বছরের পর বছর কাটান।

মুক্তির পরের অনন্ত সিং-এর গল্পটাই ছবির দ্বিতীয় অর্ধের ভিত্তি। স্বাধীন ভারতে মুক্তি পেয়ে তিনি চুপচাপ অবসরে যাননি। স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্নীতি আর দারিদ্র্য দেখে তিনি হতাশ হয়েছিলেন, আর সেই হতাশা থেকেই তিনি আবার আন্ডারগ্রাউন্ডে ফিরে যান। জি৫-এর ব্লগের ভাষায়, ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর সাবেক সশস্ত্র বিপ্লবীদের মানিয়ে নিতে কতটা কষ্ট হয়েছিল, ছবিটি সেই মানসিক রূপান্তরকে ধরেছে। বিদেশি শাসকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য যে দক্ষতা তৈরি হয়েছিল, তা যখন দেশের নিজের শাসকদের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়াল, তখন সেটাই হয়ে উঠল অপরাধ। এই প্রেক্ষাপট না জানলে ছবির দ্বিতীয় অর্ধের অনন্তকে বোঝা কঠিন হবে।

ইতিহাস আর সিনেমার পার্থক্যটা এখানে বোঝা জরুরি। ইতিহাস বলে কী ঘটেছিল, আর সিনেমা বলে কেন ঘটেছিল, সেই আবেগের ভার। ছবির লড়াইয়ের দৃশ্যগুলোতে চট্টগ্রাম অভিযানের সময়কার গেরিলা কৌশল, গোপনে অস্ত্র পাচার আর লুকানোর জায়গার কৌশলের ছাপ আছে বলে জি৫-এর ব্লগ জানিয়েছে। গল্পে শুধু বন্দুকযুদ্ধ নয়, সেই সময়ের তীব্র বিতর্কও আছে। টোটা রায়চৌধুরী আর কৌশিক সেনের চরিত্রগুলো উচ্চপদস্থ তদন্তকারীর ভূমিকায়, যারা আইনশৃঙ্খলা চায় এমন এক তরুণ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, আর অনন্ত সেই প্রতিরোধের চেতনা, যা কখনো মাথা নত করেনি। অর্থাৎ ছবিটি শুধু একজন মানুষের গল্প নয়, একটি নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে তার পুরোনো বিপ্লবীদের টানাপোড়েনের গল্প।

কাস্টের দিকে তাকালে ছবির ভার বোঝা যায়। জিৎ হয়েছেন অনন্ত লাল সিং, আর এই চরিত্রে তাকে দুটি ভিন্ন পরিচয়ে দেখা যায়, তরুণ বিপ্লবী আর পরিণত পলাতক। টোটা রায়চৌধুরী হয়েছেন ইন্সপেক্টর দুর্গা রায়, সেই পুলিশ কর্মকর্তা, যার কাজ অনন্তকে ধরা। কৌশিক সেন আছেন গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্রে। সংগীত পরিচালনা করেছেন শান্তনু মৈত্র, যার সুর ছবির উত্তেজনা আর আবেগকে ধরে রেখেছে। পরিচালক পথিকৃৎ বসু, যিনি ঐতিহাসিক গল্প বলার সঙ্গে অ্যাকশন মিশিয়ে ছবিটি বানিয়েছেন। জি৫-এর পেজে ছবির ধরন হিসেবে জীবনীভিত্তিক অ্যাকশন লেখা আছে, আর সেটাই ছবির প্রকৃতি, জীবনীও বটে, অ্যাকশনও বটে।

জিৎ নিজে এই চরিত্র নিয়ে কী ভাবছেন, সেটা প্রিমিয়ারের সময় তিনি জানিয়েছেন। তার কথায়, অনন্ত সিং কারও কাছে বিপ্লবী ছিলেন, কারও কাছে ডাকাত, কিন্তু এই দুই পরিচয়ের আড়ালে ছিলেন নিজের ন্যায়বোধে চালিত একজন মানুষ। সেই দ্বন্দ্বই তাকে আকৃষ্ট করেছে। চরিত্রটি বুঝতে তাকে অনন্তের মানসিকতা, তার রাগ, তার আদর্শ আর তার দুর্বলতাগুলো বুঝতে হয়েছে। জিৎ-এর ভাষায়, ছবিটি দর্শককে বলে দেয় না অনন্তকে কী ভাবতে হবে, বরং দর্শককে তার জগতে নিয়ে গিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে দেয়, তিনি নায়ক, বিদ্রোহী নাকি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল কিছু।

পরিচালক পথিকৃৎ বসুর কথায়ও একই সুর। তিনি বলেছেন, অনন্ত সিং-এর গল্প স্বাধীনতার সঙ্গে শেষ হয়নি, তিনি তার বিশ্বাসের জন্য প্রশ্ন তুলে লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন, আর সেটাই তার যাত্রাকে আজও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। তিনি অনন্তকে মানুষ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, শুধু মহিমান্বিত বা নিন্দিত করে নয়। শিরোনামটাই এই দ্ব্যর্থকতাকে ধরে রেখেছে বলে তিনি মনে করেন, আর তিনি চেয়েছেন দর্শক যেন সেই দ্বন্দ্ব অনুভব করে নিজে নিজে প্রশ্ন করে, তারা কোন পক্ষে দাঁড়াবে।

ছবির প্রিমিয়ার হয়েছিল কলকাতার পিভিআর-আইনক্স সাউথ সিটিতে, আর সেখানে বাংলা ছবির জগতের অনেক পরিচিত মুখ এসেছিলেন জিৎ-এর নতুন ছবিকে সমর্থন জানাতে। জিৎ-এর ভক্তদেরও বড় উপস্থিতি ছিল, যা ছবিকে ঘিরে আগ্রহের প্রমাণ। টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিমিয়ারের সেই সন্ধ্যা ছিল তারকাখচিত। কোয়েল মল্লিক প্রিমিয়ারে বলেছিলেন, জিৎ খুবই চ্যালেঞ্জিং একটি চরিত্র নিয়েছেন, আর তার রূপান্তর অসাধারণ। তার মতে, ছবির আকর্ষণ এটাই যে, অনন্তকে শুধু এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় না, তার অনেক স্তর আছে, আর ছবি সেই স্তরগুলোকে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তুলতে দেয়।

টেলিগ্রাফের সমালোচনায় ছবিটির শক্তি আর দুর্বলতা, দুটোই উঠে এসেছে। তাদের মতে, ছবিটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি ঐতিহাসিক নাটক, যা অনন্তের যাত্রার কোনো কোণই ছেড়ে দিতে চায়নি। জিৎ-এর অভিনয়কে তারা বিশ্বাসযোগ্য আর শক্তিশালী বলেছেন, তার তীব্রতা শান্ত দৃশ্যেও দর্শককে ধরে রাখে, আর আগ্রাসন আর সংযমের মধ্যে ভারসাম্য চরিত্রটিকে ওজন দিয়েছে। তবে সমালোচনায় এটাও বলা হয়েছে, কোথাও কোথাও গল্প বেশি ব্যাখ্যা করে ফেলেছে, বিশেষ করে যেসব ধারণা গল্পের দ্বন্দ্ব নিজেই বলে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ার্ধ কিছুটা ধীর হয়ে যায় বলে তাদের মনে হয়েছে, আর কিছু আবেগের দৃশ্য অতিনাটকীয়তার দিকে ঝুঁকেছে। তবু ছবির আন্তরিকতাই এর সবচেয়ে বড় শক্তি, কারণ এটি স্বাধীনতা সংগ্রামীর সরল দেশপ্রেমিক ছবি না এঁকে, বিপ্লবের পরের জটিল সময়টা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

কার দেখা উচিত ছবিটি, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আপনি কী খুঁজছেন তার ওপর। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুট আর অনন্ত সিং-এর জীবনের অধ্যায়টি আকর্ষণীয় হবে। অ্যাকশনপ্রেমীদের জন্য লড়াইয়ের দৃশ্য আর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার গতি আছে। আর যারা শুধু বিনোদন নয়, নৈতিক প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য ছবির মূল দ্বন্দ্ব, বিপ্লবী কখন ডাকাত হয়ে যায়, ভাবনার খোরাক দেবে। তবে যারা টানটান গতি আর হালকা বিনোদন খুঁজছেন, তাদের জানা ভালো যে দ্বিতীয়ার্ধ কিছুটা ধীর, আর ছবিটি অনেক প্রশ্নের উত্তর ইচ্ছে করেই খোলা রেখেছে।

দেখার আগে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। প্রথমত, ছবির নায়ক জিৎ, দেব নন। সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু প্রোমো স্কিটে ভুল করে দেবের নাম বলা হয়েছে, কিন্তু অফিশিয়াল জি৫ পেজ আর টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন, দুটোতেই পরিষ্কার যে অনন্ত সিং-এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিৎ। দ্বিতীয়ত, এটি সিনেমা, ওয়েব সিরিজ নয়, তাই এক বসাতেই পুরো গল্প শেষ হয়। তৃতীয়ত, ছবিটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে হলেও এতে নাটকীয়তা আছে, তাই প্রতিটি দৃশ্যকে ইতিহাসের আক্ষরিক তথ্য ধরে নেওয়া যাবে না। চতুর্থত, জি৫-এ দেখতে সাবস্ক্রিপশন লাগবে, আর দাম অঞ্চলভেদে বদলায়।

জি৫-এ এই ছবি দেখার পর একই ধাঁচের আরও কিছু বাংলা ছবি দেখতে পারেন। জি৫-এর নিজের তালিকায় এই ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মতো ছবি হিসেবে রক্তবীজ ২, ফোর্স আর পাসওয়ার্ডের নাম আছে, যেগুলোতে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আর প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের গল্প আছে। আর জীবনীভিত্তিক নাটক হিসেবে অপরাজিত আর কাদম্বরীর নামও তালিকায় আছে, যেখানে ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ আর সমাজের পরিবর্তনের আবেগ ধরা আছে। অর্থাৎ অনন্ত সিং-এর গল্প ভালো লাগলে জি৫-তেই আরও একই ঘরানার ছবি খুঁজে পাওয়া যাবে।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুটের ঘটনাটা না জানলে ছবির প্রথম অর্ধের ওজন বোঝা যাবে না। ১৯৩০ সালে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে একদল তরুণ বিপ্লবী চট্টগ্রামের ব্রিটিশ অস্ত্রাগারে হামলা চালিয়েছিলেন, যা ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। জি৫-এর ব্লগ অনুযায়ী, সূর্য সেন ছিলেন সেই কৌশলবিদ, যিনি বাংলার তরুণদের সংগঠিত করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, আর অনন্ত সিং ছিলেন তার ডান হাত, যিনি অভিযানের পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিলেন। অভিযানের পর ব্রিটিশ প্রশাসন কঠোর দমন অভিযান শুরু করে, অনেক বিপ্লবী ধরা পড়েন বা নিহত হন। সূর্য সেন ধরা পড়ে শহীদ হন, আর অনন্ত সিং আন্দামানের সেলুলার জেলে বছরের পর বছর বন্দি থাকেন। এই ইতিহাসই ছবির প্রথম অর্ধের পটভূমি, আর অনন্তের পরের জীবনের প্রশ্নের উত্তরও এই ইতিহাসেই লুকিয়ে আছে।

ছবির দ্বিতীয় সময়রেখা ১৯৬০-এর দশকের কলকাতা, যেখানে অনন্ত আর তরুণ বিপ্লবী নন, তিনি এক রহস্যময় পলাতক। টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ব্যবস্থার প্রতি হতাশা থেকে অনন্তের জীবনে মোড় আসে, আর ১৯৬০-এর দশকে একের পর এক সাহসী ডাকাতির ঘটনা তাকে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনে। কর্তৃপক্ষ তখন সেই রহস্যময় ব্যক্তির পেছনে ছুটতে থাকে, আর সেই তাড়ার কেন্দ্রে আছেন ইন্সপেক্টর দুর্গা রায়। এই অংশে ছবিটি একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়: স্বাধীনতার লড়াই শেষ হলে বিপ্লবীর কী হয়। অনন্তের ক্ষেত্রে উত্তরটা হলো, তিনি থেমে যাননি, তিনি শুধু তার লড়াইয়ের লক্ষ্য বদলে নিয়েছিলেন। আর সেই বদলই তাকে একদল মানুষের চোখে নায়ক আর আরেক দলের চোখে অপরাধী করে তুলেছিল।

জিৎ-এর অভিনয় নিয়েই প্রিমিয়ারের আলোচনার বড় অংশ। টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছবিটি জিৎ-কে একই চরিত্রের দুটি ভিন্ন সংস্করণ আর দুটি ভিন্ন পরিচয়ে অভিনয়ের সুযোগ দিয়েছে, আর সেই রূপান্তরই ছবির বড় আকর্ষণগুলোর একটি। তরুণ বিপ্লবী অনন্তের আদর্শ আর উদ্যম, আর পরিণত অনন্তের রাগ আর হতাশা, দুটোকে আলাদা করে ফুটিয়ে তোলা সহজ কাজ নয়। সমালোচকদের মতে, জিৎ-এর তীব্রতা শান্ত দৃশ্যেও দর্শককে ধরে রাখে, আর তার নিয়ন্ত্রিত শরীরী ভাষা চরিত্রটিকে বাড়তি ওজন দিয়েছে। কাঁচা আগ্রাসন আর আবেগের সংযমের মধ্যে ভারসাম্য রেখে তিনি অনন্তকে এমনভাবে ফুটিয়েছেন, যাতে দর্শক তাকে শুধু নায়ক বা শুধু খলনায়ক, কোনো এক ছাঁচে ফেলতে না পারেন।

টোটা রায়চৌধুরী আর কৌশিক সেনের চরিত্রগুলো ছবির ভারসাম্য রক্ষা করে। টোটা হয়েছেন ইন্সপেক্টর দুর্গা রায়, সেই পুলিশ কর্মকর্তা, যার দায়িত্ব অনন্তকে ধরা। টেলিগ্রাফের ভাষায়, টোটা এই বিড়াল-ইঁদুর দৌড়ে একটি স্থির আর বাস্তবধর্মী উপস্থিতি এনেছেন, যা অনন্তের তীব্রতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ছবির টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করেছে। জি৫-এর ব্লগ অনুযায়ী, এই তদন্তকারী চরিত্রগুলো শুধু পুলিশের প্রতিনিধি নয়, তারা একটি তরুণ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, যে রাষ্ট্র আইনশৃঙ্খলা চায়, আর অনন্ত সেই অটল প্রতিরোধের চেতনা, যে কখনো মাথা নত করেনি। অর্থাৎ ছবির সংঘাত শুধু একজন ডাকাত আর পুলিশের মধ্যে নয়, দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে, একদিকে শৃঙ্খলা, অন্যদিকে প্রতিরোধ।

প্রেক্ষাগৃহ থেকে জি৫-এ আসার অর্থটাও দর্শকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ছবিটি ১৪ আগস্ট ২০২৬ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল, আর এখন জি৫-এ স্ট্রিমিং হচ্ছে, ফলে যারা হলে দেখতে পারেননি, তারা ঘরে বসে দেখতে পারছেন। বাংলা ছবির ক্ষেত্রে এই হল থেকে ওটিটি যাত্রা এখন স্বাভাবিক পথ, আর জি৫ বাংলা ছবির একটি বড় ঠিকানা হয়ে উঠেছে। এই ছবির ক্ষেত্রে ওটিটি মুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ ছবির বিষয় ইতিহাস, আর ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী দর্শক অনেক সময় হলে যাওয়ার সুযোগ পান না, কিন্তু ঘরে বসে ছবিটি দেখে নিজের মতো করে ভাবতে পারেন। জি৫-এ ছবিটি বাংলা ভাষায় আছে, তাই ভাষার কোনো বাধা নেই, আর ২ ঘণ্টা ১৬ মিনিটের ছবিটি এক বসাতেই দেখে শেষ করা যায়।

ছবির বার্তাটা শেষ পর্যন্ত কী, সেই প্রশ্নে টেলিগ্রাফের মূল্যায়নটি মনে রাখার মতো। তাদের মতে, ছবিটি স্বাধীনতা সংগ্রামীর সরল দেশপ্রেমিক ছবি আঁকেনি, বরং বিপ্লবের পরের জটিল সময়টা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে: একটি জাতি তার জন্য আত্মত্যাগ করা মানুষদের কাছে কী ঋণী। অনন্ত সিং-এর জীবন সেই প্রশ্নের জীবন্ত উদাহরণ। তিনি স্বাধীনতার জন্য লড়েছিলেন, কারাবরণ করেছিলেন, আর মুক্তির পর যখন দেখলেন, স্বাধীনতা তার স্বপ্নের মতো হয়নি, তখন তিনি আবার লড়াইয়ে ফিরলেন। ছবিটি এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না, বরং দর্শককে প্রশ্নটা নিয়ে ভাবতে বলে। আর সেই ভাবনাটাই ছবিটিকে শুধু বিনোদনের চেয়ে বেশি কিছু করে তুলেছে, একটি ঐতিহাসিক নাটক, যা ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে আজকের দর্শকের সামনে দাঁড়িয়েছে।

সবশেষে কয়েকটি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর। কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত কি সত্যি ঘটনা অবলম্বনে: হ্যাঁ, ছবিটি বিপ্লবী অনন্ত সিং-এর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত, যিনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুটের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ছবির নায়ক কে: জিৎ, অনন্ত লাল সিং-এর চরিত্রে। পরিচালক কে: পথিকৃৎ বসু। কোথায় দেখবেন: জি৫-এ, বাংলা ভাষায়, বৈধ সাবস্ক্রিপশনে। ছবিটি কতক্ষণের: ২ ঘণ্টা ১৬ মিনিট। প্রেক্ষাগৃহে কবে মুক্তি পেয়েছিল: ১৪ আগস্ট ২০২৬। ছবিতে আর কারা আছেন: টোটা রায়চৌধুরী ইন্সপেক্টর দুর্গা রায়ের চরিত্রে, কৌশিক সেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়, আর সংগীত পরিচালনা করেছেন শান্তনু মৈত্র।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার
← সব খবর দেখুন