সন্ত কবির আর ফকির লালন শাহের দর্শন মানুষকে শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতামুক্ত পৃথিবী গড়ার পথ দেখাতে পারে। এই বার্তা নিয়েই চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হলো সপ্তম কবির-লালন ভাবসংগীত উৎসব। শুক্রবার চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই বিভাগীয় সংগীত উৎসবে কবির ও লালনের মানবতাবাদী শিক্ষার কথা নতুন করে শোনা গেল।
উৎসবটির আয়োজন করে লালন বিশ্ব সংঘ, আর এতে সহায়তা করে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রদীপ জ্বালিয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত বংশীবাদক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম। তাঁর হাত ধরে শুরু হওয়া এই আয়োজন শুধু গানের অনুষ্ঠান ছিল না, ছিল একটি ভাবনার চর্চাও।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম বলেন, কবির ও লালনের শিক্ষা ভৌগোলিক সীমানা, সময়, ভাষা, ধর্ম, জাতপাত আর বর্ণের ঊর্ধ্বে। এই শিক্ষা সার্বজনীন মানবতার বন্ধনকে শক্ত করে। পাঁচ শ বছরের কাছাকাছি সময় ধরে চলে আসা এই আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী ঐতিহ্য আজও মানুষকে একসূত্রে বাঁধতে পারে বলে আয়োজকরা মনে করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শেখ সাদী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লালন বিশ্ব সংঘের প্রধান নির্বাহী ও কবির-লালন গবেষক আবদেল মান্নান। প্রশাসন, শিক্ষা আর সংস্কৃতি, তিন ক্ষেত্রের মানুষের একসঙ্গে উপস্থিতি উৎসবটিকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
সন্ধ্যার অন্যতম আকর্ষণ ছিল 'কবির থেকে লালন: চিরন্তন প্রেমের এক ঐক্য বন্ধন' শিরোনামের সংগীত আখ্যান। কবির-লালন মিউজিক্যাল মিশনের শিল্পীরা এটি পরিবেশন করেন। কবির থেকে লালন পর্যন্ত প্রেমের যে ধারাবাহিকতা, সেটিকে সংগীতের মাধ্যমে তুলে ধরাই ছিল এই পরিবেশনার লক্ষ্য।
আয়োজকদের মতে, সন্ত কবির আর ফকির লালন শাহের বার্তা হলো প্রেম, মানবতাবাদ আর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা। বিভেদ আর শত্রুতা দূর করে শান্তিপূর্ণ বিশ্ব সমাজ গড়ার উপায় হিসেবে এই বার্তাগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় বিভাজন আর সাংস্কৃতিক দূরত্বের সময়ে এই কথাগুলো বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো।
বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, কবির ও লালনকে যত বেশি চর্চা ও অধ্যয়ন করা হবে, তত বেশি প্রেমচালিত সমাজ গড়ে উঠবে। তিনি পশ্চিমা সাংস্কৃতিক প্রভাব গ্রহণ করতে গিয়ে দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অবহেলা করার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, হাজার বছরের ঐতিহ্য আমাদের হাতে আছে, আর কবির ও লালনের প্রেমের শিক্ষা অন্তরে ধারণ করলে সমাজ স্বাভাবিকভাবেই প্রেমময় হয়ে উঠবে।
এই বক্তব্য উৎসবের মূল সুরের সঙ্গে মিলে যায়। ভাবসংগীত শুধু শোনার বিষয় নয়, চর্চার বিষয়। গান শুনে মুগ্ধ হওয়া এক কথা, আর সেই গানের ভাবনাকে জীবনে ধারণ করা আরেক কথা। চট্টগ্রামের এই উৎসব সেই দ্বিতীয় কাজটির দিকেই ইঙ্গিত করে।
চট্টগ্রামে সপ্তমবারের মতো এই উৎসব হওয়ার মধ্যেও একটি বার্তা আছে। একটি আয়োজন যখন বছর বছর ধরে চলতে থাকে, তখন তা আর একদিনের অনুষ্ঠান থাকে না, হয়ে ওঠে একটি ঐতিহ্য। কবির-লালন ভাবসংগীত উৎসব এখন সেই পথেই এগোচ্ছে, যেখানে নতুন প্রজন্মও এই গান আর ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হতে পারছে।
