দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে মুক্তির তারিখ পেল যাপিত জীবন। ২০২৬ সালের ২০ নভেম্বর দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে সিনেমাটি। ৩ নভেম্বর সন্ধ্যায় অফিশিয়াল পোস্টার প্রকাশের মাধ্যমে এই তারিখ জানানো হয়। পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেস টেলিফিল্ম পোস্টার প্রকাশ করে মুক্তির ঘোষণা দেয়। সমকালের প্রতিবেদনে পরিবেশক হিসেবে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের পাশাপাশি জাজ মাল্টিমিডিয়ার নামও উল্লেখ আছে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে চার বছর ধরে আটকে থাকা একটি সিনেমার যাত্রা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দর্শকের মনে এখন একটাই প্রশ্ন, এত দিন পর পর্দায় আসা এই সিনেমায় আসলে কী আছে, আর কেনই বা এটি নিয়ে এত আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
যাপিত জীবন কোনো হালকা বিনোদনের সিনেমা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে না, বরং এটি একটি সাহিত্যনির্ভর ঐতিহাসিক সিনেমা হিসেবে আলোচনায় এসেছে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের আলোচিত উপন্যাস যাপিত জীবন অবলম্বনে একই নামে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন হাবিবুল ইসলাম হাবিব। উপন্যাসটিতে দেশভাগ ও ভাষা আন্দোলনসহ ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উঠে এসেছে। সিনেমাটির পরিচালনার পাশাপাশি সহ প্রযোজনাও করেছেন হাবিবুল ইসলাম হাবিব নিজে। চিত্রনাট্য লিখেছেন অনিমেষ আইচ ও ইশতিয়াক আহমেদ। এই তথ্যগুলো একসঙ্গে রাখলে বোঝা যায়, সিনেমাটি শুধু একটি মুক্তির তারিখের খবর নয়, এর পেছনে একটি বড় সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে।
সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন আশনা হাবিব ভাবনা। তাঁর চরিত্রের নাম আনজুম। এই সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার বাবার পরিচালনায় কাজ করেছেন ভাবনা। বাবা হাবিবুল ইসলাম হাবিবের পরিচালনায় মেয়ের প্রথম সিনেমা, এই পরিচয়টাই যাপিত জীবনকে অন্য অনেক সিনেমা থেকে আলাদা করে দিয়েছে। পরিবারের ভেতরের সম্পর্ক পর্দায় নয়, পর্দার পেছনের এই বাবা মেয়ের কাজের সম্পর্কই এখন আলোচনার বড় অংশ। দর্শক জানতে চাইছেন, বাবার নির্দেশনায় মেয়ের অভিনয় কেমন হয়েছে, আর এই প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা ভাবনার ক্যারিয়ারে কী অর্থ বহন করে।
আরেকটি প্রথমের খবরও আছে এই সিনেমায়। বড় পর্দায় প্রথমবারের মতো একসঙ্গে দেখা যাবে আফজাল হোসেন ও রোকেয়া প্রাচীকে। সিনেমায় স্বামী স্ত্রীর চরিত্রে দেখা যাবে তাঁদের। দুজনেই বাংলাদেশের অভিনয় জগতের পরিচিত ও সম্মানিত মুখ, কিন্তু বড় পর্দায় তাঁদের একসঙ্গে দেখা যায়নি আগে। এই জুটির উপস্থিতি সিনেমাটির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন দর্শকের কাছে এই তথ্যটাই যথেষ্ট হতে পারে সিনেমাটি দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য, কারণ দুজন অভিজ্ঞ শিল্পীর একসঙ্গে কাজ করা মানেই পর্দায় অভিনয়ের একটি অন্য মাত্রা প্রত্যাশা করা যায়।
সময়রেখাটা বুঝলে সিনেমাটির অপেক্ষার গল্পটা পরিষ্কার হয়। ২০২২ সালের নভেম্বরে শুরু হয়েছিল যাপিত জীবনের শুটিং। এক বছরের মধ্যে শেষ হয় নির্মাণকাজ। অর্থাৎ শুটিং ও নির্মাণ শেষ হয়েছিল অনেক আগেই, কিন্তু তারপরও সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নানা কারণে মুক্তি পায়নি সিনেমাটি। এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হাবিবুল ইসলাম হাবিব পরিচালিত সিনেমাটি সেন্সর ছাড়পত্র পায়। সেন্সর ছাড়পত্র পাওয়ার পরই মুক্তির পথ খুলে যায়। ৩ নভেম্বর পোস্টার প্রকাশ ও ২০ নভেম্বর মুক্তির ঘোষণা সেই দীর্ঘ অপেক্ষারই সমাপ্তি।
এই চার বছরের ব্যবধানকে শুধু দেরি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একটি ঐতিহাসিক সিনেমার ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধান দর্শকের প্রত্যাশাকেও বদলে দেয়। ২০২২ সালে শুটিং হওয়া একটি সিনেমা ২০২৬ সালে মুক্তি পেলে দর্শক স্বাভাবিকভাবেই জানতে চান, সিনেমাটি সময়ের পরীক্ষায় কতটা টিকে আছে। যাপিত জীবনের ক্ষেত্রে উত্তরটা লুকিয়ে আছে এর বিষয়বস্তুতে। দেশভাগ ও ভাষা আন্দোলনের মতো বিষয় কোনো নির্দিষ্ট বছরের মধ্যে আটকে থাকে না। এই ইতিহাস আজও প্রাসঙ্গিক, তাই চার বছর পর মুক্তি পেলেও সিনেমাটির বিষয় পুরোনো হয়ে যায়নি। বরং অপেক্ষাটাই সিনেমাটিকে আরও বেশি আলোচনায় এনেছে।
এবার আসা যাক মূল উপন্যাসের দিকে, কারণ সিনেমাটি বুঝতে হলে উপন্যাসটি বোঝা জরুরি। সেলিনা হোসেনের যাপিত জীবন উপন্যাসের পটভূমি ভাষা আন্দোলন। উপন্যাসের নায়ক জাফর বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে। লেখক নিজে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, যাপিত জীবন উপন্যাসে তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করেছেন। জাফর চরিত্রটি শহীদ বরকতের ছায়া অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়েছে। উপন্যাসের নায়কের পরিবার দেশভাগের ফলে মালদহ থেকে ঢাকায় চলে আসে। এই একটি লাইনেই উপন্যাসের পুরো ঐতিহাসিক পরিধি ধরা পড়ে। দেশভাগ দিয়ে শুরু, ভাষা আন্দোলন দিয়ে এগিয়ে যাওয়া, আর তার মধ্য দিয়ে বাঙালির পরিচয়ের প্রশ্ন তোলা।
সেলিনা হোসেনের লেখালেখিতে দেশভাগ একটি বারবার ফিরে আসা বিষয়। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, দেশভাগের সম্প্রসারণই হচ্ছে ভাষা আন্দোলন, আর এর ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ। এই ভাবনাটা যাপিত জীবন বোঝার চাবিকাঠি। সিনেমাটি তাই শুধু একটি সময়ের গল্প নয়, বরং একটি ধারাবাহিক ইতিহাসের গল্প। দেশভাগ মানুষের জীবনে কী ভাঙন এনেছিল, ভাষা আন্দোলন সেই ভাঙনের মধ্য থেকে কীভাবে একটি জাতির কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল, এই প্রশ্নগুলোই উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে। সিনেমা হিসেবে যাপিত জীবন সফল হবে কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করবে এই ঐতিহাসিক আবহ পর্দায় কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা গেছে তার ওপর।
পরিচালক হাবিবুল ইসলাম হাবিব নিজেও এই চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেছেন। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, উপন্যাসের সময়কাল ও ঐতিহাসিক পরিবেশ পর্দায় তুলে ধরতে দীর্ঘ প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। শিল্পীদের পোশাক থেকে শুরু করে লোকেশনের আবহ, সবকিছুতেই ঐতিহাসিক বাস্তবতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। একটি ঐতিহাসিক সিনেমার ক্ষেত্রে এই প্রস্তুতিটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। পোশাক একটু ভুল হলে, লোকেশন একটু আধুনিক মনে হলে, দর্শকের বিশ্বাস ভেঙে যায়। পরিচালকের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নির্মাণ দল শুধু গল্প বলতে চায়নি, সময়টাকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছে। দর্শক হলে গিয়ে এই দিকটাতেই প্রথম নজর দেবেন।
ভাবনার ক্যারিয়ারের দিক থেকে দেখলেও যাপিত জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ছোট পর্দার মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেন আশনা হাবিব ভাবনা। ২০১৭ সালে অনিমেষ আইচ পরিচালিত ভয়ংকর সুন্দর সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। এরপর লাল মোরগের ঝুঁটি ও দামপাড়া সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি নৃত্যশিল্পী, চিত্রশিল্পী ও লেখক হিসেবেও পরিচিত ভাবনা। এই পটভূমি জানলে বোঝা যায়, ভাবনা শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি একজন বহুমাত্রিক শিল্পী। যাপিত জীবনে আনজুম চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাই শুধু একটি নতুন সিনেমার কাজ নয়, বরং তাঁর অভিনয় যাত্রার একটি নতুন অধ্যায়।
একটি মজার সংযোগও আছে এখানে। যাপিত জীবনের চিত্রনাট্য লিখেছেন অনিমেষ আইচ, যাঁর পরিচালনায় ভাবনার বড় পর্দায় অভিষেক হয়েছিল। অর্থাৎ ভাবনার সিনেমা যাত্রার শুরুর মানুষটি আবার ফিরে এসেছেন তাঁর জীবনের একটি বিশেষ সিনেমার চিত্রনাট্যকার হিসেবে। এই সংযোগ সিনেমাটির গল্পকে আরও ব্যক্তিগত করে তোলে। একজন শিল্পীর ক্যারিয়ারে এমন পুনর্মিলন খুব কমই ঘটে। দর্শক হয়তো পর্দায় এই সংযোগ দেখতে পাবেন না, কিন্তু সিনেমাটির পেছনের গল্প জানলে এই তথ্যটি দেখার অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।
কাস্টের তালিকাটা দেখলেই বোঝা যায়, যাপিত জীবন একটি বড় ensemble সিনেমা। কেন্দ্রীয় চরিত্রে ভাবনা, আর আফজাল হোসেন ও রোকেয়া প্রাচী ছাড়াও অভিনয় করেছেন ইমতিয়াজ বর্ষণ, রওনক হাসান, আবুল কালাম আজাদ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, গাজী রাকায়েত, তানভীর হোসেন প্রবাল, কাজী হায়াৎ, প্রণব ঘোষ, মিলি মুন্সী, ডলি জহুর, মৌসুমী হামিদ ও খালিদ মাহবুব তুর্যসহ অনেকে। এই তালিকায় নাটক, সিনেমা ও মঞ্চের অভিজ্ঞ শিল্পীরা একসঙ্গে আছেন। একটি ঐতিহাসিক গল্পের ক্ষেত্রে এত বড় ও অভিজ্ঞ কাস্ট থাকা জরুরি, কারণ গল্পের সময়কালকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে প্রতিটি চরিত্রকেই নিজের জায়গায় শক্ত হতে হয়। দর্শক এই সিনেমায় অনেক পরিচিত মুখ একসঙ্গে দেখতে পাবেন।
এবার সবচেয়ে ব্যবহারিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া যাক। যাপিত জীবন কবে মুক্তি পাচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত, ২০ নভেম্বর ২০২৬। কোথায় দেখা যাবে, এই প্রশ্নের উত্তর, দেশের প্রেক্ষাগৃহে। তবে কোন কোন হলে, কোন শো টাইমে দেখা যাবে, সেই হল তালিকা এখনো পর্যন্ত যাচাই করা প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়নি। তাই মুক্তির সপ্তাহে হলে যাওয়ার আগে হলের তালিকা ও শো টাইম আলাদা করে যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এই গাইডে হল তালিকা অনুমান করে দেওয়া হয়নি, কারণ ভুল তথ্য দেওয়ার চেয়ে সঠিক তথ্যের অপেক্ষা করা ভালো। হল তালিকা প্রকাশ হলে সেটাই হবে দেখার পরিকল্পনার পরের ধাপ।
আরেকটি প্রশ্ন অনেকেই করছেন, যাপিত জীবন কি কোনো পুরোনো সিনেমার রিমেক। উত্তর না। এটি সেলিনা হোসেনের উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ। রিমেক আর সাহিত্যনির্ভর সিনেমার মধ্যে পার্থক্য আছে। রিমেকে একটি সিনেমাকে আবার বানানো হয়, আর এখানে একটি উপন্যাসকে পর্দায় আনা হয়েছে। উপন্যাসের পাঠকরা তাই সিনেমায় নিজেদের পড়া গল্পের একটি নতুন রূপ দেখতে পাবেন, আর যাঁরা উপন্যাস পড়েননি, তাঁরা একটি সম্পূর্ণ নতুন গল্প হিসেবেই সিনেমাটি দেখতে পারবেন। দুই ধরনের দর্শকের জন্যই সিনেমাটি কাজ করতে পারে, যদি চিত্রনাট্য উপন্যাসের মূল সুর ধরে রাখতে পারে।
ওটিটি নিয়ে প্রশ্নের উত্তর এখনো দেওয়া যাচ্ছে না। যাপিত জীবন কোন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে, কবে আসবে, সে বিষয়ে যাচাই করা প্রতিবেদনে এখনো কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তাই এই গাইডে কোনো ওটিটি তারিখের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে না। সিনেমাটি প্রথমে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে, এটাই এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য। ওটিটি ঘোষণা এলে সেটা আলাদাভাবে জানানো যাবে। দর্শকদের জন্য পরামর্শ একটাই, প্রেক্ষাগৃহে দেখার পরিকল্পনা থাকলে মুক্তির সপ্তাহটাই সবচেয়ে নিরাপদ সময়, কারণ ওটিটি তারিখ অনিশ্চিত।
যাপিত জীবন দেখার আগে কী মনে রাখবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে তিনটি বিষয় আলাদা করে বলতে হয়। প্রথমত, এটি একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সিনেমা, তাই দ্রুতগতির বাণিজ্যিক সিনেমার প্রত্যাশা নিয়ে হলে গেলে ভুল হবে। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় চরিত্র আনজুমের মধ্য দিয়ে গল্প এগোবে, আর তাঁর চারপাশে থাকবে দেশভাগ ও ভাষা আন্দোলনের সময়কাল। তৃতীয়ত, বাবা মেয়ের প্রথম কাজ ও আফজাল রোকেয়ার প্রথম জুটি, এই দুটি প্রথমের গল্প সিনেমাটির আবেগের দিককে আরও গভীর করে। এই তিনটি বিষয় মাথায় রেখে দেখলে সিনেমাটি বোঝা সহজ হবে।
জাফর চরিত্রের প্রসঙ্গটি আলাদা করে বোঝা দরকার, কারণ এখানেই উপন্যাসের ঐতিহাসিক ওজনটা লুকিয়ে আছে। সেলিনা হোসেন জানিয়েছিলেন, জাফর চরিত্রটি শহীদ বরকতের ছায়া অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়েছে। বরকত ভাষা আন্দোলনের শহীদদের একজন হিসেবে পরিচিত। একজন শহীদের ছায়ায় একটি কাল্পনিক চরিত্র গড়ে তোলা মানে সেই চরিত্রের মধ্য দিয়ে একটি পুরো আন্দোলনের আবেগকে ধারণ করা। উপন্যাসের পাঠক জাফরের মধ্য দিয়ে তাই শুধু একজন ব্যক্তির গল্প পড়েন না, তাঁরা একটি সময়ের কণ্ঠস্বর শোনেন। সিনেমায় আনজুম কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও, উপন্যাসের এই ঐতিহাসিক ভিত্তিটাই সিনেমার আবহকে গভীর করে। দর্শক যদি এই পটভূমি জেনে হলে যান, তাহলে সিনেমার অনেক দৃশ্যের অর্থ তাঁদের কাছে আরও পরিষ্কার হবে।
দেশভাগ থেকে ঢাকায় আসার গল্পটাও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উপন্যাসের নায়কের পরিবার দেশভাগের ফলে মালদহ থেকে ঢাকায় চলে আসে। এই একটি যাত্রার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, দেশভাগ শুধু মানচিত্রের ভাগাভাগি ছিল না, এটি ছিল মানুষের ঘর, পরিচয় ও জীবনের ভাগাভাগি। একটি পরিবারকে নিজের জায়গা ছেড়ে নতুন শহরে এসে আবার জীবন গড়তে হয়। সেই নতুন জীবনের মধ্যেই ভাষা আন্দোলনের প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। ভাষা তখন শুধু কথা বলার মাধ্যম থাকে না, ভাষা হয়ে ওঠে পরিচয়ের প্রশ্ন। যাপিত জীবন এই পরিচয়ের প্রশ্নটাকেই গল্পের কেন্দ্রে রেখেছে। সিনেমা হিসেবে এই দিকটি ধরে রাখতে পারলে, সিনেমাটি শুধু ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ হবে না, বরং আজকের দর্শকের কাছেও প্রাসঙ্গিক মনে হবে।
এখনো যা জানা যায়নি, সেটাও স্পষ্ট করে বলা দরকার, কারণ একটি গাইডের কাজ শুধু জানা তথ্য দেওয়া নয়, অজানা তথ্য সম্পর্কে সতর্ক করাও। সিনেমাটির ট্রেলার কবে আসবে, সে বিষয়ে যাচাই করা প্রতিবেদনে এখনো কোনো তারিখ পাওয়া যায়নি। সিনেমাটির দৈর্ঘ্য কত হবে, সংগীত পরিচালনা কে করছেন, আর কোন কোন হলে প্রথম সপ্তাহে শো চলবে, এই তথ্যগুলোও এখনো প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। এই তথ্যগুলো না জানিয়ে গাইড লেখা হলে দর্শক ভুল প্রত্যাশা নিয়ে হলে যেতে পারেন। তাই এই গাইডে যা নিশ্চিত, শুধু তা-ই লেখা হয়েছে। ট্রেলার, হল তালিকা ও শো টাইম প্রকাশ হলে সেগুলোই হবে দেখার পরিকল্পনার পরের ধাপ।
কারা এই সিনেমাটি দেখতে যাবেন, সেই প্রশ্নের উত্তরও গল্প থেকেই পাওয়া যায়। যাঁরা সেলিনা হোসেনের উপন্যাস পড়েছেন, তাঁরা পর্দায় নিজেদের পড়া সময়কালকে দেখতে চাইবেন। যাঁরা ইতিহাসের গল্প পছন্দ করেন, তাঁরা দেশভাগ ও ভাষা আন্দোলনের আবহের জন্য সিনেমাটি দেখতে পারেন। যাঁরা ভাবনার অভিনয় অনুসরণ করেন, তাঁরা বাবার পরিচালনায় তাঁর প্রথম কাজ দেখতে আগ্রহী হবেন। আর যাঁরা আফজাল হোসেন ও রোকেয়া প্রাচীর কাজ পছন্দ করেন, তাঁরা বড় পর্দায় তাঁদের প্রথম জুটি দেখার সুযোগ পাবেন। এই চার ধরনের দর্শকের জন্যই যাপিত জীবন আলাদা আলাদা কারণে আকর্ষণীয়। একটি সিনেমা যখন এতগুলো দিক থেকে দর্শক টানতে পারে, তখন তার মুক্তি শুধু একটি তারিখের খবর থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি আলোচনার বিষয়।
শেষ কথা হিসেবে বলা যায়, যাপিত জীবন বাংলাদেশের সিনেমার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। সাহিত্যনির্ভর সিনেমা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বড় ensemble কাস্ট, আর চার বছরের অপেক্ষা, এই সবকিছু মিলে সিনেমাটিকে নভেম্বরের আলোচিত মুক্তিগুলোর একটি করে তুলেছে। ২০ নভেম্বর হলে গিয়ে দর্শকই ঠিক করবেন, অপেক্ষাটা সার্থক হয়েছে কিনা। তবে মুক্তির আগেই যেটা নিশ্চিত, তা হলো যাপিত জীবন শুধু একটি তারিখের খবর নয়। এটি একটি উপন্যাসের পর্দায় আসার গল্প, একটি বাবা ও মেয়ের প্রথম কাজের গল্প, আর দুজন অভিজ্ঞ শিল্পীর প্রথম জুটির গল্প। এই তিনটি গল্প একসঙ্গে মিলেই যাপিত জীবনকে মনে রাখার মতো করে তুলেছে।
