বাংলাদেশের প্রতিদিনের বিনোদন পোর্টাল
বিনোদন ঝলক

দেশি-বিদেশি নাটক, সিনেমা ও সিরিজের প্রতিদিনের বিনোদন খবর

সিনেমা

হাওয়া সম্পূর্ণ গাইড: চঞ্চল-তুষির ট্রলার রহস্য, গান, অস্কার যাত্রা আর কোথায় দেখবেন

বিনোদন ঝলক ডেস্ক৩ নভেম্বর ২০২৬7 মিনিটে পড়ুন
হাওয়া সম্পূর্ণ গাইডের গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

মাঝসমুদ্রে একটি ট্রলার, আটজন মাঝিমাল্লা আর জালে ধরা পড়া এক রহস্যময় মেয়ে, এই তিনটি উপাদান দিয়ে তৈরি হাওয়া বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সিনেমার ইতিহাসে একটি আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। ২০২২ সালে মুক্তির পর ছবিটি শুধু হলের ভিড়ের কারণে নয়, গানের কারণে, রূপকথার ছায়া থাকা গল্পের কারণে আর অস্কারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের কারণেও আলোচনায় ছিল। এখনো অনেকেই খোঁজেন, হাওয়ার গল্প আসলে কী, গুলতি কে, শেষের রহস্যটা কী বোঝায় আর ছবিটি বৈধভাবে কোথায় দেখা যায়। এই গাইডে সেই প্রশ্নগুলোর যাচাই করা উত্তর একসঙ্গে রাখা হলো।

হাওয়া পরিচালনা করেছেন মেজবাউর রহমান সুমন। এটি তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি, এর আগে তিনি ছোট পর্দা আর বিজ্ঞাপনের কাজ করেছেন। ছবিটি প্রযোজনা করেছে সান মিউজিক অ্যান্ড মোশন পিকচার্স লিমিটেড, নির্মাণে ফেসকার্ড প্রোডাকশন। প্রধান চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী চান মাঝি আর নাজিফা তুষি গুলতি চরিত্রে। সঙ্গে শরিফুল রাজ, সুমন আনোয়ার, নাসির উদ্দিন খান, সোহেল মণ্ডল ও রিজভী রিজু। ছবিটি ২০২২ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশের ২৪টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। প্রথম আলোর মুক্তির দিনের প্রতিবেদনে স্টার সিনেপ্লেক্স, ব্লকবাস্টারসহ দেশের ২৪টি প্রেক্ষাগৃহের কথা উল্লেখ আছে।

হাওয়ার শুটিংয়ের গল্পটাই প্রায় ছবির মতো। ২০১৯ সালের অক্টোবরে গভীর সমুদ্রে টানা ৪০ দিন গোপনে শুটিং করা হয়েছিল বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে। ট্রলারের যাত্রীরা পেশাদার জেলে নন, অভিনয়শিল্পী, তবু জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা আর আসন্ন বিপদ মাথায় রেখেই দিনের পর দিন কাজ করে গেছেন তারা। করোনার কারণে ছবিটি দীর্ঘদিন আটকে ছিল। তারপর পোস্টার, ট্রেলার আর সাদা সাদা কালা কালা গান একের পর এক চমক দেয়। গানটি মুক্তির পরই ঝড় তোলে আর রাতারাতি গণমানুষের গানে পরিণত হয়।

গল্পের কেন্দ্রে একটি মাছ ধরার ট্রলার, যা মাঝসমুদ্রে গন্তব্যহীনভাবে আটকে পড়ে। চান মাঝির নেতৃত্বে আটজন মাঝিমাল্লা সেখানে দিন কাটায়। একদিন তাদের জালে ধরা পড়ে এক রহস্যময় মেয়ে, গুলতি। সে কথা বলে না বললেই চলে, আর তার আগমনের পর থেকেই ট্রলারে একের পর এক অঘটন ঘটতে থাকে। মৃত্যু, অবিশ্বাস আর সন্দেহ ধীরে ধীরে দলটিকে ভেঙে দিতে শুরু করে। কে বন্ধু আর কে শত্রু, কে সত্য বলছে আর কে লুকাচ্ছে, এই প্রশ্নগুলোই ছবির উত্তেজনা ধরে রাখে।

চান মাঝি চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী ট্রলারের নেতা, যার কাঁধে দলের নিরাপত্তা আর সিদ্ধান্তের ভার। তার অভিনয়ে নেতার কঠোরতা আর ভেতরের দ্বিধা দুটোই দেখা যায়। গুলতি চরিত্রে নাজিফা তুষি প্রায় নীরব, কিন্তু তার উপস্থিতিই ছবির সবচেয়ে বড় রহস্য। সে কোথা থেকে এসেছে, কেন এসেছে, আর তার সঙ্গে সমুদ্রের কী সম্পর্ক, এই প্রশ্নের উত্তর ছবি সরাসরি বলে দেয় না, বরং ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়। শরিফুল রাজ, সুমন আনোয়ার, নাসির উদ্দিন খান আর সোহেল মণ্ডলের চরিত্রগুলো ট্রলারের ভেতরের টানাপোড়েনকে আরও জটিল করে তোলে।

হাওয়ার গল্প শুধু বাস্তবতার গল্প নয়, শেষে গিয়ে তা রূপকথার গল্প হয়ে ওঠে বলে পরিচালক নিজেই প্রথম আলোকে বলেছিলেন। ছবির রহস্যের পেছনে আছে লোককথার ছায়া। পরিচালকের সাক্ষাৎকারভিত্তিক আলোচনায় মনসা আর বেহুলা লখিন্দরের গল্পের প্রতিধ্বনির কথা উঠে এসেছে। মনসা যেমন চাঁদ সদাগরের জাহাজ ডুবিয়েছিলেন, হাওয়াতেও গুলতির উপস্থিতি সেই পুরোনো পৌরাণিক টানাপোড়েনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই স্তরটি না বুঝলে হাওয়াকে শুধু একটি থ্রিলার মনে হতে পারে, কিন্তু রূপকথার স্তরটি বুঝলে ছবির শেষটা আরও অর্থবহ হয়।

স্পয়লার সতর্কতা সহ শেষের দিকের কথা বলা যাক, খুব বেশি খুঁটিনাটি না খুলে। ট্রলারের মাঝিদের মধ্যে সন্দেহ বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে প্রত্যেকেই নিজের বাঁচার চেষ্টা করে। গুলতির আসল পরিচয় আর তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের কথা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, সমুদ্র এখানে শুধু পটভূমি নয়, সে নিজেই একটি চরিত্র, যে অন্যায়ের প্রতিশোধ নেয় আর হারানো মানুষের বেদনাকে ধারণ করে। যারা ছবিটি দেখেননি, তাদের জন্য এর বেশি খুলে বলা ঠিক হবে না, কারণ হাওয়ার আসল অভিজ্ঞতা তার ধীরে ধীরে খোলা রহস্যের মধ্যেই।

সংগীত হাওয়ার আরেকটি বড় সম্পদ। সংগীত পরিচালনায় ইমন চৌধুরী, আর আবহ সংগীতে রাশেদ শরীফ শোয়েব। সাদা সাদা কালা কালা গানটি লিখেছেন ও সুর করেছেন হাশিম মাহমুদ, আর এই গান ছবি মুক্তির আগেই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। মেঘদলের এ হাওয়া গানটিও ছবির প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে আলোচিত হয়। সমুদ্রের শব্দ, ট্রলারের কাঠের আওয়াজ আর নীরবতার ব্যবহার ছবির আবহকে আরও ভারী করে। সাউন্ড ডিজাইন আর চিত্রগ্রহণের প্রশংসা সমালোচকদের লেখায় বারবার এসেছে।

হলের প্রতিক্রিয়া ছিল হাওয়ার সাফল্যের প্রমাণ। প্রথম দিনেই ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্স, ব্লকবাস্টার, শ্যামলী, মধুমিতাসহ দেশের নানা হলে হাউসফুল শো হয়েছিল বলে বিনোদন প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল। ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে শুধু মাল্টিপ্লেক্সেই ১৪ কোটি টাকার ব্যবসার কথা উল্লেখ আছে বলে পরবর্তী তথ্যসূত্রে জানা যায়। সব মিলিয়ে হাওয়া ২০২২ সালের সর্বোচ্চ আয় করা বাংলাদেশি ছবিগুলোর একটি হয়ে ওঠে। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবেও ছবিটি দেখানো হয়, আর ভারতের নানা শহরে মুক্তি পায়।

অস্কার যাত্রা হাওয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে। ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, বাংলাদেশের অস্কার কমিটি ৯৫তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সেরা আন্তর্জাতিক পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি বিভাগে হাওয়া বেছে নিয়েছে। ৯৫তম অস্কার অনুষ্ঠান ২০২৩ সালের ১২ মার্চ ক্যালিফোর্নিয়ার ডলবি থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয়। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো মানে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া নয়। হাওয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে জমা পড়েছিল, কিন্তু চূড়ান্ত মনোনয়নের তালিকায় তার নাম আসেনি। তবু একটি দেশের প্রতিনিধি হিসেবে বাছাই হওয়াটাই ছবির জন্য বড় স্বীকৃতি ছিল।

গোল্ডেন গ্লোবের সংক্ষিপ্ত তালিকায় হাওয়ার থাকার কথাও বিভিন্ন তথ্যসূত্রে উল্লেখ আছে। এই দুটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলে হাওয়াকে শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যের ছবি থেকে বাংলাদেশের সিনেমার প্রতিনিধিত্বকারী কাজে পরিণত করে। দেশের বাইরে সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডেও ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছিল। কলকাতায় মুক্তির সময় চঞ্চল চৌধুরী নিজে উপস্থিত ছিলেন, আর দুই বাংলার দর্শকের মধ্যে সেতুর কথা বলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

কোথায় দেখবেন, এই প্রশ্নের যাচাই করা উত্তর হলো সনি লিভ। ওটিটি সংবাদমাধ্যম ওটিটিপ্লে জানিয়েছিল, হাওয়া ২০২৩ সালের ৭ জুলাই সনি লিভে আসছে, আর দেখতে সাবস্ক্রিপশন লাগবে। অর্থাৎ ছবিটির বৈধ ওটিটি ঠিকানা সনি লিভ। তবে ২০২৬ সালে এসে কোনো প্ল্যাটফর্মের ক্যাটালগ বদলে যেতে পারে, তাই সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার আগে সনি লিভের বর্তমান ক্যাটালগে ছবিটি আছে কিনা যাচাই করে নেওয়া নিরাপদ। পাইরেসি সাইট, টরেন্ট বা টেলিগ্রাম লিংক থেকে ছবি দেখা বৈধ নয়, আর এই গাইডে সেসবের কোনো সন্ধান দেওয়া হয়নি।

হাওয়া কাদের জন্য, এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে দর্শকের ধৈর্যের ওপর। যারা ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া রহস্য, সমুদ্রের আবহ আর লোককথার ছায়া পছন্দ করেন, তাদের জন্য হাওয়া বিশেষ অভিজ্ঞতা। যারা শুধু দ্রুতগতির অ্যাকশন আশা করেন, তাদের কাছে ছবির মাঝের অংশ ধীর লাগতে পারে। ছবিতে মৃত্যু, সন্দেহ আর সহিংসতার দৃশ্য আছে, তাই পরিবারের ছোটদের সঙ্গে দেখার আগে এই দিকটি মনে রাখা ভালো।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর এখানে রাখা হলো। হাওয়া কবে মুক্তি পায়, ২০২২ সালের ২৯ জুলাই, বাংলাদেশের ২৪টি প্রেক্ষাগৃহে। পরিচালক কে, মেজবাউর রহমান সুমন, এটি তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি। চান মাঝি কে, চঞ্চল চৌধুরী। গুলতি কে, নাজিফা তুষি, জালে ধরা পড়া রহস্যময় মেয়ে। হাওয়া কি অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিল, না, বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে জমা পড়েছিল, চূড়ান্ত মনোনয়ন পায়নি। বৈধভাবে কোথায় দেখা গিয়েছিল, ২০২৩ সালের ৭ জুলাই থেকে সনি লিভে, বর্তমান ক্যাটালগ যাচাই করে নেওয়া উচিত।

সব মিলিয়ে হাওয়া এমন একটি ছবি যেখানে সমুদ্র, রূপকথা আর মানুষের লোভ ও সন্দেহ একসঙ্গে কাজ করে। চঞ্চল চৌধুরীর চান মাঝি, তুষির নীরব গুলতি, সাদা সাদা কালা কালা গান আর মাঝসমুদ্রের ট্রলারের আবহ মিলে ছবিটিকে মনে রাখার মতো করেছে। যারা এখনো দেখেননি, তারা বৈধ প্ল্যাটফর্মে ছবিটি দেখে নিজেরাই বিচার করতে পারেন, কেন হাওয়া বাংলাদেশের সিনেমার একটি মোড় ঘোরানো কাজ হিসেবে আলোচিত হয়।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার
← সব খবর দেখুন