আজ শনিবার, ৩১ অক্টোবর, হ্যালোইন। বছরের যে রাতটায় ভূতের গল্প বলা, ভয় পাওয়া আর ভয় দেখানোই উৎসবের অংশ, সেই রাতটা আজ। পশ্চিমা দুনিয়ায় হ্যালোইনের শিকড় অনেক পুরোনো, প্রাচীন কেল্টিক উৎসব থেকে এর শুরু বলে ধরা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর চেহারা বদলেছে, কুমড়োর আলো, ভূতের সাজ আর মিষ্টি চাওয়ার খেলা যোগ হয়েছে, কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি, আর সেটা হলো রাত জেগে ভয়ের গল্পে ডুবে থাকা। বাংলাদেশে হ্যালোইন এখন আর শুধু বিদেশি উৎসব নয়, শহরের তরুণদের মধ্যে থিম পার্টি, সাজ আর হরর সিনেমা দেখার রাত হিসেবে এর জায়গা তৈরি হয়েছে। তাই আজকের রাতের জন্য রইল ভয় বাড়াবে এমন ১০টি হরর সিনেমার তালিকা, যেখানে বলিউড, দক্ষিণি সিনেমা আর হলিউডের ক্লাসিক সবই আছে।
তালিকার শুরুটা বলিউডের পরিচিত ভয় দিয়ে। ‘১৯২০ ইভিল রিটার্নস’ ছবিতে কবি জয়দেবের জীবনে ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকা স্মৃতির স্মৃতি, আর তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় এক অতৃপ্ত আত্মার গল্প। আফতাব শিবদাসানি আর টিয়া বাজপাই অভিনীত এই ছবি ভয়ের সঙ্গে বিষণ্ণ প্রেমের গল্প মিশিয়ে দেয়, ফলে শুধু চমকে ওঠা নয়, গল্পের টানটাও থেকে যায়। একই ধারার আরেকটি ক্লাসিক ‘রাজ’, যেখানে এক দম্পতির সম্পর্কে হানা দেয় অতিপ্রাকৃত শক্তি। ডিনো মোরিয়া আর বিপাশা বসু অভিনীত এই ছবি বলিউডের হরর ঘরানার অন্যতম সফল কাজ হিসেবে এখনো মনে রাখা হয়, আর এর গানগুলো ভয়ের আবহকে আরও গভীর করে।
ভূতের বাড়ির গল্প পছন্দ করলে তালিকায় আছে ‘হাউজ নম্বর থার্টিন’। পুরোনো বাড়ি, অশরীরী উপস্থিতি আর ধীরে ধীরে খুলতে থাকা রহস্য, এই ছবির মূল আকর্ষণ এখানেই। এটি একটি তামিল হরর ছবির হিন্দি রূপ, তাই দক্ষিণি হররের স্বাদ হিন্দিতে পেতে চাইলে এটা ভালো পছন্দ হতে পারে। আর রাম গোপাল ভার্মা পরিচালিত ‘ভূত’ তো এক সময়ের আইকনিক ছবি। অজয় দেবগন আর ঊর্মিলা মাতোন্ডকর অভিনীত এই ছবিতে ভয়টা আসে চিৎকার করে নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক চাপ আর অতিপ্রাকৃত ঘটনার ধারাবাহিকতায়। ফ্ল্যাটের ভেতরকার অস্বস্তি ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে দর্শক নিজেও চরিত্রদের মতো অসহায় বোধ করতে শুরু করে।
দক্ষিণি সিনেমার ভক্তদের জন্য তালিকার মজার সংযোজন ‘কাঞ্চনা’। এই তামিল ছবির নায়ক রাঘব ভূতকে ভীষণ ভয় পায়, অথচ পরিত্যক্ত মাঠে খেলতে গিয়ে সে তিনটি আত্মার মুখোমুখি হয়, আর সেই আত্মারা তার শরীরে ভর করে। রাঘব লরেন্সের অভিনয় আর পরিচালনায় ভয় আর হাসি পাশাপাশি চলে, ফলে যারা টানটান ভয়ের পাশাপাশি হালকা মেজাজও চান, তাদের জন্য এই ছবি অন্য রকম অভিজ্ঞতা দেবে। আর একেবারে ভিন্ন স্বাদের ছবি ‘বুলবুল’। উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে অতিপ্রাকৃত ঘটনার আড়ালে এখানে উঠে আসে নারীর প্রতিশোধ আর নীরব প্রতিবাদের গল্প। থমথমে আবহ, ধীর গতি আর শেষের মোচড় মিলিয়ে ‘বুলবুল’ প্রমাণ করে, হরর মানেই শুধু ভয় দেখানো নয়, গল্প বলার শক্তিশালী মাধ্যমও হতে পারে।
হলিউডের ক্লাসিক ছাড়া হ্যালোইনের তালিকা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ‘হ্যালোইন’ ছবির মাইকেল মায়ার্স মাত্র ছয় বছর বয়সে নিজের কিশোরী বোনকে হত্যা করে, তারপর মানসিক হাসপাতালে কাটায় বহু বছর। ফিরে এসে সে শুরু করে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, আর সেই থেকেই হ্যালোইন রাতের আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠে তার মুখোশ পরা চেহারা। স্ট্যানলি কুবরিক পরিচালিত ‘দ্য শাইনিং’ আবার ভয়ের অন্য মাত্রা দেখায়। স্টিফেন কিংয়ের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে নির্জন হোটেল, বিচ্ছিন্ন পরিবার আর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়া মানসিক ভারসাম্য মিলে এমন এক আতঙ্ক তৈরি করে, যা ছবি শেষ হওয়ার পরও মাথায় থেকে যায়।
একইভাবে ‘দ্য এক্সরসিস্ট’ হরর সিনেমার ইতিহাসে আলাদা জায়গা ধরে রেখেছে। এক তরুণীর শরীরে অশুভ শক্তির ভর করা আর তা তাড়ানোর চেষ্টাকে ঘিরে তৈরি এই ছবি মুক্তির সময় থেকেই আলোচনায় ছিল, আর আজও অনেকের কাছে এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর ছবিগুলোর একটি। আর ‘দ্য কনজারিং’ এসেছে প্যারানরমাল তদন্তকারী দম্পতি এড আর লরেন ওয়ারেনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত গল্প নিয়ে। ভূতুড়ে বাড়ি, পরিবারকে ঘিরে বাড়তে থাকা বিপদ আর তদন্তকারী দম্পতির লড়াই, এই ছবি দেখার সময় দর্শক গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়ে সহজেই।
কোন ছবি দিয়ে রাত শুরু করবেন, সেটা নির্ভর করছে আপনার ভয়ের সহ্যক্ষমতার ওপর। হালকা ভয় দিয়ে শুরু করতে চাইলে ‘কাঞ্চনা’ বা ‘বুলবুল’ দিয়ে শুরু করা যায়। পুরোনো দিনের ক্লাসিক স্বাদ নিতে চাইলে ‘রাজ’ বা ‘ভূত’ ভালো পছন্দ। আর সত্যিকারের আতঙ্ক চাইলে ‘হ্যালোইন’, ‘দ্য শাইনিং’ আর ‘দ্য এক্সরসিস্ট’ রাতের শেষের দিকে রাখাই ভালো, কারণ এই ছবিগুলো দেখার পর ঘুম আসতে দেরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। একটা পরামর্শ মাথায় রাখা ভালো, ছোটদের সঙ্গে এই তালিকার সব ছবি দেখা ঠিক হবে না, বিশেষ করে স্ল্যাশার আর অতিপ্রাকৃত আতঙ্কের ছবিগুলো বড়দের জন্যই রাখুন। আলো নিভিয়ে, ভালো সাউন্ডে আর সঙ্গীসাথী নিয়ে দেখলে হ্যালোইনের রাতটা জমে উঠবে সবচেয়ে বেশি, কারণ ভয় ভাগ করে নিলেই তো উৎসব।
হ্যালোইন শুধু ভয় পাওয়ার উৎসব নয়, গল্পের উৎসবও। এই ১০টি ছবির প্রতিটির পেছনে আছে আলাদা সময়, আলাদা সংস্কৃতি আর আলাদা ভয়ের ভাষা। বলিউডের প্রেম আর ভূতের মিশেল থেকে হলিউডের মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক পর্যন্ত, এই বৈচিত্র্যই হরর ঘরানাকে এতদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে। আজ রাতে তাই তালিকা থেকে নিজের পছন্দের দুই তিনটি ছবি বেছে নিন, দেখার আগে পছন্দের প্ল্যাটফর্মে সেগুলো খুঁজে নিন, আর ভয়ের রাতটাকে বানিয়ে নিন স্মরণীয়।
