বাংলাদেশের প্রতিদিনের বিনোদন পোর্টাল
বিনোদন ঝলক

দেশি-বিদেশি নাটক, সিনেমা ও সিরিজের প্রতিদিনের বিনোদন খবর

সিনেমা

হোগলাবুনিয়া থেকে তাসভিরের সেরা: প্রথম সিনেমাতেই সেরা অভিনেতা চিরনজিৎ বিশ্বাস

বিনোদন ঝলক ডেস্ক৩০ অক্টোবর ২০২৬4 মিনিটে পড়ুন
চিরনজিৎ বিশ্বাসের তাসভির পুরস্কার নিয়ে নিজের বানানো গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

স্কুলের মঞ্চে অভিনয়ের হাতেখড়ি। কলেজজীবন থেকে নাট্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকা। আর প্রথম সিনেমাতেই আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এমন গল্পই এখন বাস্তব চিরনজিৎ বিশ্বাসের জীবনে। উত্তর আমেরিকার তাসভির চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। তার অভিনীত প্রথম সিনেমা দেলুপি দিয়েই এসেছে এই স্বীকৃতি।

খবরটা চিরনজিৎ পেয়েছেন বেশ নাটকীয়ভাবে। ফোনের রিংটোনে তার ঘুম ভাঙে। ফোনের ওপাশে পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে কথা বলতেই শুনলেন সুখবর। তাসভির চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেতা হয়েছেন তিনি। চিরনজিতের পক্ষ থেকে পুরস্কারটি গ্রহণ করেছেন পরিচালক তাওকীর নিজেই। গত বছরের ৭ নভেম্বর মুক্তি পায় দেলুপি।

সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চিরনজিৎ বলেন, এই অনুভূতি আসলে মুখের ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবে এই পুরস্কার শুধু তার একার অর্জন নয়, এটা পুরো দলের মেধা ও পরিশ্রমের ফল। তার এই কথায় বোঝা যায়, প্রথম সিনেমার সাফল্যকে তিনি দলগত অর্জন হিসেবেই দেখছেন। নিজের নামের চেয়ে দলের পরিশ্রমকেই এগিয়ে রাখছেন তিনি।

চিরনজিতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার হোগলাবুনিয়া গ্রামে। তার অভিনয়ের শুরু তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়। হোগলাবুনিয়া মধ্যপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষিকা নূপুর মণ্ডলের লেখা বাল্যবিবাহ নাটকে ঘটকের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এরপর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় একক অভিনয় করেছেন, পেয়েছেন পুরস্কারও। মাধ্যমিক পর্যায়ে বাল্যবিবাহ নামে আরেক নাটকে মাতালের চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পান। স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানেও নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কখনো মুক্তিযোদ্ধা, কখনো টিক্কা খান, কখনো বর। চরিত্রের ধরন নিয়ে ভাবনার চেয়ে অভিনয়ের সুযোগটাই ছিল তার কাছে বড়।

কলেজে ওঠার পর অদিতি নাট্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হন চিরনজিৎ। ২০২০ সাল থেকে এই দলের হয়ে মঞ্চনাটক, পথনাটক ও মাঠমহড়ায় অংশ নিচ্ছেন। তাদের নাটকে উঠে আসে নদীপারের মানুষের জীবনসংগ্রাম, ঝড় বন্যার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার গল্প। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এসব নাটক নিয়ে গেছেন তারা। অর্থাৎ, সিনেমায় আসার আগেই মঞ্চ আর মাঠের অভিনয়ে তার হাত পেকেছে বহু বছর ধরে।

সিনেমায় আসার গল্পটাও বন্ধুত্বের সূত্রে গাঁথা। চিরনজিতের ছোটবেলার বন্ধু অদিতি রায়। একই গ্রামে, একই পাড়ায় তাদের বাড়ি। পাশাপাশি বেড়ে ওঠা, একসঙ্গে স্কুল কলেজে পড়া, নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া, সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের পরিচয়। এই অদিতি আবার একটি যাত্রাদলের সঙ্গে অভিনয় করতেন। সেই দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে খুলনায় আসেন মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম ও তার দল। আর অদিতির মাধ্যমেই পরিচালকের সঙ্গে চিরনজিতের পরিচয়। সেই সূত্র ধরেই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য অডিশন দেন তিনি। দেলুপিতে কাজের সুযোগ পান। তার বিপরীতে অভিনয় করেছেন অদিতি রায়।

সিনেমায় কাজ করবেন, এমনটা কখনো ভাবেননি বলে জানিয়েছেন চিরনজিৎ। দেলুপি দিয়ে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। প্রথম দিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা সহজ ছিল না। কিছুটা ভয় ও অস্বস্তি কাজ করছিল। তার ওপর নদীতে শুটিংয়ের একটি দৃশ্য ছিল। শুশুক দেখে ভয় পেয়েছিলেন চিরনজিৎ। পরিচালকের কাছে সে ভয়ও প্রকাশ করেছিলেন। তবে সহশিল্পী ও নির্মাতাদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে জড়তা কাটে। নিজের অভিনয় দেখে এবং দলের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান তিনি।

দেলুপি মুক্তির পর নিজের এলাকায়ও পরিচিতি বেড়েছে চিরনজিতের। আগে যারা চিনতেন না, তারাও এখন কথা বলেন, অভিনয়ের প্রশংসা করেন। পরবর্তী কাজ নিয়ে জানতে চান। নিজের উপজেলায় একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে দর্শকদের সঙ্গে ছবি তোলা, কথা বলা ও অটোগ্রাফ দেওয়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। চিরনজিতের ভাষায়, দেলুপি তার জীবনটাই বদলে দিয়েছে। আগে যে অবস্থানে ছিলেন, সেখান থেকে আজ আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। সিনেমাটি তাকে একটা পথ দেখিয়েছে। চেষ্টা করবেন এই পথ ধরে এগিয়ে যেতে।

পড়াশোনার পাশাপাশি অভিনয় চালিয়ে যেতে চান তিনি। খুলনার সরকারি আদর্শ সুন্দরবন কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন চিরনজিৎ। সম্প্রতি একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন। আরেকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিনয়ের কথাও চলছে। বাংলাদেশে চঞ্চল চৌধুরী তার পছন্দের অভিনেতা। ভারতীয় অভিনেতাদের মধ্যে শাহরুখ খানের ভক্ত তিনি। তাদের কাজ দেখেই অভিনয়ের নানা দিক শেখার চেষ্টা করেন।

হোগলাবুনিয়ার স্কুলমঞ্চ থেকে উত্তর আমেরিকার তাসভির উৎসব, এই যাত্রাপথটাই চিরনজিতের গল্পকে বিশেষ করে তুলেছে। কোনো বড় শহরের সুযোগ ছাড়াই, গ্রামের মঞ্চ আর নাট্যদলের মহড়া থেকে উঠে এসে প্রথম সিনেমাতেই সেরা অভিনেতার পুরস্কার পাওয়া সহজ কথা নয়। দেলুপি তার হাতে সেই পথ খুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই পথ ধরে তিনি আর কতদূর এগোতে পারেন।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার
← সব খবর দেখুন