বাংলা লোকগানের অবিস্মরণীয় কিংবদন্তি আব্বাসউদ্দীন আহমদ। অসংখ্য কালজয়ী গানে তিনি বাংলার মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছেন। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজন করা হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠান ওকি গাড়িয়াল ভাই। ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর এই আয়োজনের খবর জানানো হয়।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠানটি হবে একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে। এতে বিশিষ্ট অতিথিদের আলোচনার পাশাপাশি থাকবে সংগীতানুষ্ঠান। একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হবে অনুষ্ঠানটি। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মিজ ইমাসুমিন বেগম।
অনুষ্ঠানে মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশিষ্ট গবেষক ও সংগীতশিল্পী অধ্যাপক ড. নাশিদ কামাল। সভাপতিত্ব করবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ। আলোচনা পর্ব শেষে হবে সংগীতানুষ্ঠান। এতে লোকসংগীতের জনপ্রিয় শিল্পীরা গান করবেন। তবে শিল্পীদের নাম প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। তাই কোন কোন শিল্পী মঞ্চে উঠবেন, তা জানতে অনুষ্ঠান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আব্বাসউদ্দীন আহমদের জন্ম ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর কোচবিহারের বলরামপুরে। ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় প্রয়াত হন। তাঁর জীবনকাল ছিল বাংলার সংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। তখন লোকগান গ্রাম থেকে শহরের মঞ্চে, রেডিওতে আর রেকর্ডে ছড়িয়ে পড়ছিল। আব্বাসউদ্দীন সেই যাত্রার অন্যতম প্রধান কণ্ঠ ছিলেন। তাঁর গাওয়া গানগুলো শুধু বিনোদন নয়, বাংলার মানুষের জীবন, প্রেম, বিরহ আর প্রকৃতির কথা বলেছে।
বাংলার লোকসংগীতকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে আব্বাসউদ্দীন আহমদের অবদান চিরস্মরণীয়। বিশেষ করে ভাওয়াইয়া, পল্লিগীতি ও ভাটিয়ালি গানে তাঁর অসামান্য অবদান তাঁকে পরিণত করেছে কিংবদন্তিতে। তাঁর কিছু কালজয়ী গানের মধ্যে রয়েছে ওকি গাড়িয়াল ভাই, আমার গলার হার খুলে নে, আমায় এত রাতে কেন ডাক দিলি, আল্লাহ মেঘ দে পানি দে, মাঝি বাইয়া যাও রে, থাকতে পার ঘাটাতে, বাউকুমটা বাতাসে, নদীর কুল নাই, আমায় ভাসাইলি রে, আমার হাড় কালা করলাম রে। এই গানগুলো আজও বাংলার ঘরে ঘরে শোনা যায়।
ওকি গাড়িয়াল ভাই গানটির নামেই এবারের অনুষ্ঠানের নাম রাখা হয়েছে। গাড়িয়ালের জীবন, তাঁর পথচলা আর বাংলার মাটির গন্ধ এই গানে যেভাবে ধরা আছে, তা লোকগানের শক্তির বড় উদাহরণ। একটি গান কীভাবে একটি অঞ্চলের জীবনকে সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারে, আব্বাসউদ্দীনের কাজ তার প্রমাণ। তাঁর কণ্ঠে ভাওয়াইয়ার টান, ভাটিয়ালির নদীর সুর আর পল্লিগীতির সহজ ভাষা একসঙ্গে মিশে গেছে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৯ সালে শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮১ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কারে (মরণোত্তর) ভূষিত হয়েছেন। এই দুটি সম্মাননা তাঁর কাজের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। তবে তাঁর আসল স্বীকৃতি মানুষের মুখে মুখে ফেরা গানগুলো। পুরস্কারের চেয়ে বড় হয়ে আছে সেই গানগুলো, যেগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গাওয়া হচ্ছে।
১২৫তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানটি তাই শুধু একটি স্মরণসভা নয়। এটি নতুন প্রজন্মের কাছে লোকগানকে পৌঁছে দেওয়ার একটি সুযোগ। যাঁরা আব্বাসউদ্দীনকে শুধু নামে চেনেন, তাঁরা অনুষ্ঠানে তাঁর গানের ইতিহাস আর বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানতে পারবেন। আলোচনা পর্বে গবেষকের বক্তব্য আর সংগীতানুষ্ঠানে লোকশিল্পীদের পরিবেশনা মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সন্ধ্যা তৈরি হবে বলে আশা করা যায়।
যাঁরা অনুষ্ঠানে যেতে চান, তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য এটুকুই: তারিখ ২৭ অক্টোবর, সময় সন্ধ্যা ৬টা, স্থান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তন। প্রবেশ বা টিকিট সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই, তাই যাওয়ার আগে একাডেমির কাছ থেকে তা জেনে নেওয়া ভালো। অনুষ্ঠানের পর শিল্পীদের তালিকা আর পরিবেশনার বিস্তারিত জানা গেলে সেই খবরও সামনে আসবে।
