বিনোদন ঝলক
তারকা

চার্লিস অ্যাঞ্জেলসের জ্যাকলিন স্মিথের ৮১তম জন্মদিন আজ: ৫০ বছর পরও কেন মনে রাখে সবাই

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২৬ অক্টোবর ২০২৬5 মিনিটে পড়ুন
জ্যাকলিন স্মিথের ৮১তম জন্মদিনের নিজস্ব গ্রাফিক
ছবি: বিনোদন ঝলক

আজ সোমবার, ২৬ অক্টোবর, মার্কিন অভিনেত্রী ও উদ্যোক্তা জ্যাকলিন স্মিথের ৮১তম জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হিউস্টনে তাঁর জন্ম। এবারের জন্মদিনটি আরও বিশেষ, কারণ তাঁর সবচেয়ে পরিচিত টেলিভিশন সিরিজ চার্লিস অ্যাঞ্জেলস এ বছর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করেছে। অর্ধশতক পেরিয়েও সেই সিরিজ আর কেলি গ্যারেট চরিত্রটি দর্শকের মনে যেভাবে টিকে আছে, সেটাই এই জন্মদিনের আলোচনার কেন্দ্রে।

ছোটবেলায় জ্যাকলিনের স্বপ্ন ছিল একেবারেই অন্যরকম। পেশাদার ব্যালে নৃত্যশিল্পী হতে চেয়েছিলেন তিনি, মাত্র তিন বছর বয়সে নাচ শেখা শুরু করেছিলেন। টেক্সাসের ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মঞ্চের নানা প্রযোজনায় অংশ নেন। নাচের স্বপ্ন নিয়েই পরে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সেখানেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়, বিজ্ঞাপনের কাজের সুযোগ আসে। লিস্টারিন ও ব্রেক শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি, এরপর ম্যাকক্লাউড ও সুইচের মতো টেলিভিশন সিরিজে অভিনয় করেন। তখনো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসেনি।

সেই সুযোগ আসে ১৯৭৬ সালে, চার্লিস অ্যাঞ্জেলসের মধ্য দিয়ে। সিরিজের কেন্দ্রে ছিলেন তিনজন নারী গোয়েন্দা, যাঁরা বিপদে পড়লে উদ্ধারের অপেক্ষায় বসে থাকতেন না। নিজেরাই অপরাধীর পিছু নিতেন, রহস্যের জট খুলতেন। সত্তরের দশকের টেলিভিশনের পর্দায় এই ধারণাটাই দর্শককে টেনেছিল। তিন নারীর অভিযান দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, আর তাঁদের একজন ছিলেন কেলি গ্যারেট, জ্যাকলিন স্মিথের চরিত্র।

কেলি গ্যারেটের সঙ্গী ছিলেন ফারাহ ফসেট ও কেট জ্যাকসন। সিরিজটি নিয়ে আলোচনা দুই দিক থেকেই এসেছিল। একদিকে গ্ল্যামার ও পোশাককে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, অন্যদিকে নারীদের সাহসী ও কর্মক্ষম চরিত্রে দেখানোর বিষয়টি প্রশংসা পেয়েছিল। এই দুই প্রতিক্রিয়ার মাঝখানেই সিরিজটি সময়ের আলোচনায় জায়গা করে নেয়। দর্শক শুধু চরিত্রগুলোর সাজ দেখেননি, তাঁদের কাজ করার ধরনটাও মনে রেখেছেন।

মূল টেলিভিশন সিরিজটি চলে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত। সময়ের সঙ্গে প্রধান নারী অভিনয়শিল্পীদের তালিকা বদলেছে, কিন্তু শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঁচটি মৌসুমেই ছিলেন জ্যাকলিন। শুরুর তিনজন অ্যাঞ্জেলের মধ্যে একমাত্র তিনিই পুরো যাত্রাটা শেষ করেছিলেন। এই ধারাবাহিক উপস্থিতিই কেলি গ্যারেটকে তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে পরিচিত চরিত্র করে তোলে। অনেক অভিনেতার ক্ষেত্রে একটি চরিত্র অন্য কাজকে আড়াল করে দেয়, জ্যাকলিনের ক্ষেত্রেও কেলি গ্যারেটের পরিচয় ছিল প্রবল।

সিরিজ শেষ হওয়ার পরও চার্লিস অ্যাঞ্জেলস নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরে এসেছে বারবার। ২০০০ সালে একই নামের সিনেমায় অভিনয় করেন ক্যামেরন ডিয়াজ, ড্রু ব্যারিমোর ও লুসি লিউ। ২০০৩ সালে আসে সিকুয়েল চার্লিস অ্যাঞ্জেলস: ফুল থ্রটল। ২০১১ সালে নতুন করে টেলিভিশন সিরিজ তৈরি হয়, তবে তা এক মৌসুমেই শেষ হয়ে যায়। ২০১৯ সালে ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, নাওমি স্কট ও এলা বালিনস্কাকে নিয়ে মুক্তি পায় আরেকটি চার্লিস অ্যাঞ্জেলস সিনেমা। এই ফিরে আসার ইতিহাসে জ্যাকলিনও ছিলেন, ২০০৩ ও ২০১৯ সালের সিনেমায় কেলি গ্যারেট চরিত্রে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি জানান দিয়ে। পুরোনো সিরিজের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অভিযানের যোগসূত্র হয়ে ওঠেন তিনি।

অ্যাঞ্জেলসের পরের পর্বেও তাঁর কাজের তালিকা ছোট নয়। জ্যাকলিন বুভিয়ে কেনেডি টেলিভিশন চলচ্চিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডির চরিত্রে অভিনয় তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি। এ অভিনয়ের জন্য ১৯৮২ সালে গোল্ডেন গ্লোবে মনোনয়ন পান তিনি। এরপর তাঁর কাজের তালিকায় যুক্ত হয় রেজ অব অ্যাঞ্জেলস, জর্জ ওয়াশিংটন ও দ্য বোর্ন আইডেনটিটির মতো মিনিসিরিজ। পরবর্তী সময়ে দ্য ডিস্ট্রিক্টের মতো সিরিজেও অভিনয় করেছেন। অভিনয়ের বাইরে উপস্থাপনা করেছেন হেয়ারস্টাইলিং প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান শিয়ার জিনিয়াস। সব মিলিয়ে তাঁর কাজের তালিকায় রয়েছে পঞ্চাশের বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা।

পর্দার বাইরে জ্যাকলিনের আরেকটি বড় অধ্যায় শুরু হয় ১৯৮৫ সালে। মার্কিন খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান কেমার্টের সঙ্গে নারীদের পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্যের সংগ্রহ বাজারে আনেন তিনি। তখন তারকাদের নিজস্ব ফ্যাশন ব্র্যান্ড আজকের মতো প্রচলিত ছিল না। সেই দিক থেকে শুরুর দিকের সফল উদ্যোগগুলোর একটি হয়ে ওঠে তাঁর নামের পোশাকের সংগ্রহ। পোশাকের পর ব্যবসার পরিধি বাড়ে ঘর সাজানোর সামগ্রী ও সুগন্ধিতে।

জ্যাকলিনের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ঘর সাজানোর কাপড় ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। পরের বছর কেমার্টে আসে বিছানা ও টয়লেট সাজসজ্জার পণ্যের সংগ্রহ। ২০০৮ সালে হেয়ারস্টাইলিস্ট হোসে এবার ও পলা ইয়ংয়ের সঙ্গে চালু করেন স্টাইল বাই জ্যাকলিন স্মিথ হেয়ার ফ্যাশন উদ্যোগ। ২০১০ সালে স্বামী চিকিৎসক ব্র্যাড অ্যালেনের সঙ্গে ত্বকের যত্নের পণ্য নিয়েও কাজ করেন তিনি। এভাবে পোশাক থেকে ঘরের সাজ, চুলের ফ্যাশন থেকে ত্বকের পরিচর্যা, বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর নাম।

দশকের পর দশক পেরিয়েও ফ্যাশন ব্যবসার সঙ্গে জ্যাকলিনের সম্পর্ক রয়ে গেছে। ২০২২ সালে এইচএসএনের সঙ্গে নতুন ব্যবসায়িক অধ্যায় শুরু করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়তালিকায় এখনো তাঁর নামের পোশাক রয়েছে। অভিনয় থেকে ব্যবসায় এই যাত্রাটা তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বড় পরিচয়। অনেক তারকা একটি সফল চরিত্রের পর হারিয়ে যান, জ্যাকলিন উল্টো পথে হেঁটে নিজের নামকে একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন।

এ বছর প্রকাশিত হয়েছে জ্যাকলিনের স্মৃতিকথা, আই ওয়ান্স নিউ আ গাই নেমড চার্লি। সেখানে উঠে এসেছে চার্লিস অ্যাঞ্জেলস তৈরির নেপথ্য, সহশিল্পীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং পর্দার বাইরের জীবন। নাচের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা এক তরুণী কীভাবে অভিনেত্রী ও উদ্যোক্তা হয়ে উঠলেন, সেই পথচলাও রয়েছে বইটিতে। জন্মদিন আর সিরিজের পঞ্চাশ বছর একসঙ্গে আসায় বইটির আলোচনাও নতুন করে সামনে এসেছে।

অক্টোবরে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জ্যাকলিন জানিয়েছেন, পঞ্চাশ বছর পরও সিরিজটি নিয়ে কথা বলতে হবে, এমনটা তাঁরা ভাবেননি। তাঁর আশা, সেই নারী গোয়েন্দাদের অভিযান দর্শকদের সাহসী ও স্বাধীন হতে উৎসাহ দিয়েছে। এই কথাটাই হয়তো তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সারাংশ। একটি চরিত্র দিয়ে শুরু, তারপর অভিনয়, ব্যবসা আর নিজের গল্প বলার মধ্য দিয়ে টিকে থাকা।

জন্মদিনের এই আলোচনায় নতুন কোনো প্রকল্পের ঘোষণা সামনে আসেনি, তাই তা নিয়ে অনুমান করার সুযোগ নেই। যা নিশ্চিত, তা হলো একটি সিরিজের পঞ্চাশ বছর আর একজন অভিনেত্রীর একাশি বছরের জীবন একসঙ্গে মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্প তৈরি করেছে। কেলি গ্যারেট হয়তো তাঁর সবচেয়ে চেনা মুখ, কিন্তু নাচের স্বপ্ন, টেলিভিশনের সাফল্য, ব্যবসার দ্বিতীয় ইনিংস আর স্মৃতিকথা মিলিয়ে জ্যাকলিন স্মিথের গল্পটি একটি চরিত্রের চেয়ে অনেক বড়।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার