কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের বিরুদ্ধে কপিরাইটের মামলা করেছেন এলভিস প্রিসলির গানের স্বত্বাধিকারীরা। অভিযোগ, কোনো অনুমতি ছাড়াই মার্কিন সংগীতশিল্পী প্রিসলির রেকর্ড করা ২৭৪টি গান ব্যবহার করে নিজেদের ক্লড এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতে মামলাটি করা হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর রাতে এই খবর সামনে আসে।
মামলাটি করেছে অথেনটিক ব্র্যান্ডস গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। ২০১৩ সালে প্রিসলির মেধাস্বত্ব ও ট্রেডমার্ক সংক্রান্ত কপিরাইটের মালিকানা কিনে নেওয়া প্রতিষ্ঠান এটিই। অর্থাৎ, প্রিসলির নাম ও গানের স্বত্বের বাণিজ্যিক দেখভালের দায়িত্বে থাকা পক্ষই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। তাদের সঙ্গে বাদী হিসেবে রয়েছে সংগীত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান র্যালি মিউজিক পাবলিশিং ও অ্যাবিলিন মিউজিক। আরও রয়েছে গীতিকার লুইজি ক্রিয়েটোরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট এবং অ্যাবারবাখ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত পক্ষগুলো। অ্যাবারবাখ পরিবারের প্রকাশনা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে ছিল প্রিসলির গাওয়া বিভিন্ন গানের কপিরাইট।
অভিযোগের মূল কথা পরিষ্কার। অ্যানথ্রোপিক কোনো লাইসেন্স নেয়নি, কোনো অর্থও পরিশোধ করেনি, তবু গানগুলো কপি করেছে। শুধু প্রশিক্ষণের কাজেই নয়, ভবিষ্যতে ক্লড এআইয়ের নতুন সংস্করণ প্রশিক্ষণের জন্য গানগুলো প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ তথ্যভান্ডারেও সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এখানে প্রশ্নটি শুধু একটি গান নিয়ে নয়, একটি পুরো ক্যাটালগ নিয়ে। ২৭৪টি গান একসঙ্গে ব্যবহারের অভিযোগই মামলাটিকে বড় করে তুলেছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্যান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ, অল শুক আপ, ডোন্ট বি ক্রুয়েল, এ লিটল লেস কনভারসেশন এবং রিটার্ন টু সেন্ডার। এগুলো প্রিসলির সবচেয়ে চেনা গানগুলোর মধ্যে পড়ে। কয়েক প্রজন্ম ধরে এই গানগুলো রেডিও, সিনেমা আর নানা অনুষ্ঠানে বেজে আসছে। তাই মামলাটি শুধু আইনি নথির বিষয় নয়, সংগীতপ্রেমীদের কাছেও পরিচিত নামগুলো জড়িয়ে আছে। একটি গানের ক্যাটালগ কতটা মূল্যবান হতে পারে, এই তালিকাটা সেটাই মনে করিয়ে দেয়।
ক্ষতিপূরণের অঙ্কটাও চোখে পড়ার মতো। মামলায় প্রতিটি গানের কথিত স্বত্ব লঙ্ঘনের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার করে ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে। ২৭৪টি গানের হিসাবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ কোটি ১১ লাখ ডলার। অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণসহ বাদীদের মোট দাবি ৪ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এই অঙ্ক মামলার শুরুতেই জানানো হয়েছে, আদালত এখনো কোনো রায় দেয়নি। তাই এটাকে চূড়ান্ত জরিমানা ভাবা ঠিক হবে না, এটি বাদীদের দাবি।
এই মামলা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে হলে এআই প্রশিক্ষণের বিতর্কটি মনে রাখতে হবে। এআই মডেল তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ লেখা, ছবি ও সংগীত ব্যবহার করা হয়। সেই উপাদানের স্বত্বাধিকারীদের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা মামলা চলছে। লেখক, সংবাদমাধ্যম আর সংগীতশিল্পীদের পক্ষ থেকে আগেও অভিযোগ উঠেছে। প্রিসলির মতো একজন কিংবদন্তি শিল্পীর ক্যাটালগ জড়িয়ে যাওয়ায় এই বিতর্কটি আরও সামনে চলে এলো।
প্রিসলির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। তিনি বেঁচে নেই, তাই তাঁর গানের স্বত্বের দেখভাল করছে তাঁর উত্তরাধিকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। একজন শিল্পীর মৃত্যুর পরও তাঁর কাজের বাণিজ্যিক মূল্য থাকে, আর সেই মূল্যের সুরক্ষার প্রশ্নেই এই মামলা। স্বত্বাধিকারীদের যুক্তি, অনুমতি ছাড়া গান ব্যবহার করে একটি বাণিজ্যিক এআই পণ্য তৈরি করা হয়েছে। এই যুক্তি আদালতে কতটা টিকবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
অ্যানথ্রোপিকের বক্তব্য এখনো সামনে আসেনি, অন্তত জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তা উল্লেখ নেই। তাই এই পর্যায়ে মামলাটিকে শুধু অভিযোগ হিসেবেই দেখতে হবে। আদালতের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে মাত্র, শুনানি, জবাব আর তথ্য যাচাইয়ের পর্ব বাকি। এআই প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এই ধরনের অভিযোগে নিজেদের ব্যবহারকে ন্যায্য ব্যবহার বলে দাবি করে থাকে, কিন্তু এই মামলায় অ্যানথ্রোপিক কী যুক্তি দেবে, তা এখনো জানা যায়নি।
এরপর কী হতে পারে, তা নির্ভর করছে আদালতের গতিপথের ওপর। মামলাটি নিষ্পত্তি হতে পারে সমঝোতার মধ্য দিয়ে, আবার দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়াতেও যেতে পারে। ক্ষতিপূরণের অঙ্ক কমবেশি হতে পারে, এমনকি অভিযোগ খারিজও হতে পারে। তবে যে সিদ্ধান্তই আসুক, তা এআই প্রশিক্ষণে সংগীত ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে একটি নজির তৈরি করবে। অন্য শিল্পীদের স্বত্বাধিকারীরাও এই মামলার দিকে তাকিয়ে থাকবেন।
আপাতত নিশ্চিত তথ্য এটুকুই: ২৭৪টি গান, ৪ কোটি ১১ লাখ ডলারের মূল দাবি, মোট ৪ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের দাবি, এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতে দায়ের হওয়া মামলা। এর বাইরে কোনো রায় বা সমঝোতার খবর এখনো আসেনি। নতুন তথ্য এলে এই গল্পের পরের পর্বে তা জানানো যাবে।
