ভূতের গল্প শুনিয়ে শেষে দর্শককে চমকে দেওয়ার কাজটা ভিকি জাহেদ বরাবরই ভালো পারেন। হ্যালোইনের দিন, ৩১ অক্টোবর তিনি আবারও সেই চমক দিলেন, এবার একেবারে ছোট পরিসরে। সাড়ে ৮ মিনিটের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি, নাম স্কন্দকাটা, নিজের ফেসবুক পেজে উন্মুক্ত করেছেন তিনি। প্রথম কয়েক মিনিট দেখলে মনে হবে, এটা নিছকই একটি ভৌতিক গল্প। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গিয়ে বোঝা যায়, পুরো আয়োজনটার পেছনে আছে আরেকটি উদ্দেশ্য।
স্কন্দকাটা আসলে গ্রামবাংলার পুরনো এক লোকগাথা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, স্কন্দকাটা এমন এক ভূত, যার মাথা নেই। রাতের অন্ধকারে জঙ্গলে কিংবা নির্জন জায়গায় সে নিজের হারানো মাথা খুঁজে বেড়ায়, আর সামনে পড়া মানুষকে ভয় দেখায়। ভিকি জাহেদ সেই পরিচিত গল্পটাকেই পর্দায় তুলে ধরেছেন, ভৌতিক আবহ, অন্ধকার আর রহস্য দিয়ে। এই লোকগাথার সঙ্গে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের ভয়ের গল্পের একটা পুরনো যোগ আছে, আর সেই কারণেই গল্পটা শুনতে শুনতে দর্শকের মনে একটা চেনা ভয় কাজ করে।
স্কন্দকাটায় অভিনয় করেছেন আজিজুল হাকিম ও তামিম করিম। দুজনেই অভিজ্ঞ অভিনেতা, আর তাঁদের উপস্থিতি ছোট এই নির্মাণটাকে শুধু একটি পরীক্ষামূলক কাজের গণ্ডিতে আটকে রাখেনি। ভিকির হাতে ভয়ের গল্প সাধারণত শুধু ভয় দেখানোর জন্য থাকে না, তার ভেতরে থাকে চরিত্রের মানসিক চাপ, অজানা আতঙ্ক আর শেষ মুহূর্তের মোচড়। স্কন্দকাটাতেও সেই ধারাটা ধরা পড়ে, যদিও মাত্র সাড়ে ৮ মিনিটের মধ্যে গল্প বলতে হয়েছে।
আর সেই মোচড়টাই এই শর্টফিল্মের সবচেয়ে আলোচিত অংশ। একেবারে শেষে গিয়ে বোঝা যায়, এটি আসলে একটি পণ্যের প্রচারণামূলক কনটেন্ট। একটি টয়লেট ক্লিনার ব্র্যান্ডের জন্যই আস্ত শর্টফিল্ম বানিয়েছেন ভিকি। অর্থাৎ, দর্শক প্রথমে ভেবেছিলেন একটি ভৌতিক শর্টফিল্ম দেখছেন, শেষে আবিষ্কার করলেন সেটি একটি বিজ্ঞাপনী নির্মাণ, কিন্তু বিজ্ঞাপনের চিরাচরিত ধরন ভেঙে গল্পের আদলে সাজানো। এই আইডিয়ার জন্য দর্শক তাঁকে বাহবাও দিচ্ছেন বলে ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রকাশের দিনটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ৩১ অক্টোবর বিশ্বের নানা দেশে হ্যালোইন উদযাপিত হয়। মৃত আত্মা, ভূত ও অতিপ্রাকৃত বিষয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা এই উৎসবের আবহের সঙ্গে মিল রেখেই স্কন্দকাটা প্রকাশ করা হয়েছে। হ্যালোইনের দিন ভৌতিক গল্প প্রকাশ করাটা স্বাভাবিক, কিন্তু ভিকি সেই স্বাভাবিকতাটাকেই ব্যবহার করেছেন চমকের জন্য। উৎসবের আবহে দর্শক ভূতের গল্প খুঁজছিলেন, আর তাঁরা পেলেন ভূতের গল্পের ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি ব্র্যান্ডের বার্তা।
এই ঘটনাটা শুধু একটি শর্টফিল্মের খবর নয়, বিজ্ঞাপন আর কনটেন্টের মাঝের সীমানাটা কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তারও একটি উদাহরণ। আগে বিজ্ঞাপন মানেই ছিল সরাসরি পণ্যের কথা বলা। এখন অনেক ব্র্যান্ডই গল্প, সিনেমা বা শর্টফিল্মের আদলে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে চায়, যাতে দর্শক বিজ্ঞাপন মনে করে এড়িয়ে না যান, বরং গল্প হিসেবে দেখেন। স্কন্দকাটা সেই ধারারই একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ। তবে এখানে একটি সতর্কতাও আছে। দর্শক যখন বুঝতে পারেন তিনি গল্পের আড়ালে বিজ্ঞাপন দেখছিলেন, তখন কারও ভালো লাগে, কারও আবার মনে হতে পারে তাঁকে একটু ঠকানো হলো। স্কন্দকাটার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত যে প্রতিক্রিয়ার কথা জানা গেছে, তাতে প্রশংসার দিকটাই বেশি।
ভিকি জাহেদের সময়টাও এখানে লক্ষণীয়। তাঁর প্রথম সিনেমা খলনায়কের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এসেছে ঠিক আগের দিন, ৩০ অক্টোবর। একসঙ্গে দুটি সিনেমার কাজ চলছে বলে জানা গেছে, আর তার মাঝেই হ্যালোইনে এই শর্টফিল্ম প্রকাশ। অর্থাৎ, বড় পর্দার ব্যস্ততার মাঝেও ছোট পরিসরের পরীক্ষামূলক কাজ থেকে তিনি সরে যাননি। বরং ছোট কাজটাকেই তিনি ব্যবহার করেছেন নিজের পরিচিত টুইস্টের ধারাটা ধরে রাখতে। ঢাকা শোবিজে তাঁকে মিস্টার টুইস্ট বলা হয়, আর স্কন্দকাটা সেই নামটাকে আবারও সত্যি প্রমাণ করল।
দর্শকদের জন্য এখন প্রশ্নটা সহজ: স্কন্দকাটা দেখতে চাইলে কোথায় যাবেন? ভিকি জাহেদের নিজের ফেসবুক পেজেই এটি উন্মুক্ত করা হয়েছে। মাত্র সাড়ে ৮ মিনিটের এই নির্মাণ দেখতে বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু শেষের চমকটা নিয়ে আলোচনা চলবে আরও কিছুদিন। যাঁরা ভূতের গল্প ভালোবাসেন, তাঁরা লোকগাথাটা উপভোগ করবেন। আর যাঁরা বিজ্ঞাপনের নতুন ধরন নিয়ে আগ্রহী, তাঁরা দেখবেন কীভাবে একটি ভূতের গল্পের ভেতর দিয়ে একটি পণ্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়।
