হলিউডের তারকা টম ক্রুজের সিনেমা মানেই দর্শকের প্রত্যাশা থাকে দুর্দান্ত অ্যাকশন, চোখধাঁধানো স্টান্ট আর টানটান উত্তেজনা। কিন্তু সেই পরিচিত ছকের বাইরে গিয়ে নির্মিত ডিগার বক্স অফিসে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতু পরিচালিত সিনেমাটির নির্মাণ ও প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও আয় হয়েছে তুলনামূলকভাবে সামান্য। সমালোচকেরা মনে করছেন, এই ব্যর্থতার পেছনে সম্ভাব্য পাঁচটি কারণ রয়েছে। আর সেই হিসাব মিলিয়ে ভ্যারাইটির ধারণা, সিনেমাটি থেকে লোকসান হতে পারে দুই হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।
প্রথম কারণটা সরাসরি অঙ্কের। ডিগার নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১৫ থেকে ১৮ কোটি ডলার। এর সঙ্গে প্রচারণায় খরচ হয়েছে আরও প্রায় ১০ কোটি ডলার। ফলে সিনেমাটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ২৮ কোটি ডলার। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ধারণা ছিল, প্রেক্ষাগৃহের আয় থেকে খরচ পুষিয়ে নিতে বিশ্বব্যাপী ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ডলারের ব্যবসা করবে সিনেমাটি। কিন্তু মুক্তির পর সিনেমাটির আয় সেই লক্ষ্যের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। বড় বাজেটের ছবির ক্ষেত্রে এই ব্যবধানটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ শুরুতে পিছিয়ে পড়লে পরে তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
দ্বিতীয় কারণ, উদ্বোধনী আয় হতাশাজনক। উত্তর আমেরিকায় মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তে ডিগার আয় করে মাত্র ৮০ লাখ ডলার। টম ক্রুজের মতো তারকার সিনেমার জন্য এই আয় ছিল হতাশাজনক। সাধারণত তাঁর সিনেমায় অ্যাকশন ও স্টান্টের আকর্ষণে প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করেন দর্শক। কিন্তু এবার সেই প্রত্যাশা বক্স অফিসে প্রতিফলিত হয়নি। দুর্বল উদ্বোধন পরবর্তী সপ্তাহগুলোতেও সিনেমাটির ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি করে, কারণ প্রথম সপ্তাহের খবরই অনেক দর্শকের সিদ্ধান্ত ঠিক করে দেয়, তাঁরা হলে যাবেন কি যাবেন না।
তৃতীয় কারণ, বিপণনে গল্প ও ঘরানা স্পষ্ট হয়নি। সিনেমাটির প্রচারণায় দর্শকের কাছে গল্প ও ঘরানার পরিচয় যথেষ্ট স্পষ্টভাবে তুলে ধরা যায়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। ট্রেলার দেখে অনেক দর্শক বুঝতে পারেননি, এটি ঠিক কী ধরনের সিনেমা কিংবা গল্পটি কোন দিকে এগোবে। টম ক্রুজের পরিচিত অ্যাকশনধর্মী সিনেমার সঙ্গে এর উপস্থাপনার পার্থক্যও দর্শকের প্রত্যাশা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে। ফলে সম্ভাব্য দর্শকদের একটি অংশকে আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে। একটি ছবি কী নিয়ে, সেটা যদি প্রথম দেখাতেই পরিষ্কার না হয়, তাহলে টিকিট কেনার সিদ্ধান্তটা দর্শকের জন্য কঠিন হয়ে যায়।
চতুর্থ কারণ, টম ক্রুজের পরিচিত ঘরানা থেকে সরে আসা। টম ক্রুজকে সাধারণত মিশন: ইমপসিবল ফ্র্যাঞ্চাইজির মতো অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় দেখা যায়। কিন্তু ডিগার একটি অদ্ভুত, গাঢ় রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক সিনেমা। এতে তিনি অভিনয় করেছেন ডিগার রকওয়েল নামের এক খামখেয়ালি তেল ব্যবসায়ীর চরিত্রে। চরিত্রটির প্রয়োজনে কৃত্রিম প্রসাধনীর সাহায্যে তাঁর চেহারাতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। অভিনয়ের এই ভিন্নতা প্রশংসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও, টম ক্রুজের কাছ থেকে যে ধরনের বিনোদন দর্শক প্রত্যাশা করেন, তার সঙ্গে সিনেমাটির পার্থক্য বক্স অফিসে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পঞ্চম কারণ, মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও মুখে মুখে প্রচার না থাকা। সিনেমাটি নিয়ে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া ছিল বিভক্ত। দর্শকদের মূল্যায়নেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। সিনেমাস্কোরে সিনেমাটি পেয়েছে সি প্লাস গ্রেড। তবে আইএমডিবিতে এর রেটিং ৭.৫। মুক্তির পর দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে উত্তর আমেরিকায় টিকিট বিক্রিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে না পারায় আয় বাড়ানোর সুযোগ আরও সংকুচিত হয়। বড় বাজেটের সিনেমার ক্ষেত্রে দর্শকের ইতিবাচক মুখে মুখে প্রচার গুরুত্বপূর্ণ, ডিগার সেই সুবিধা পায়নি। বেশির ভাগ দর্শকই এটাকে নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করেছে, তবে একশ্রেণির দর্শক সিনেমাটি পছন্দ করেছেন, সেই সংখ্যা কম।
এবার লোকসানের আশঙ্কা কতটা, সেই হিসাব। বক্স অফিসের হিসাব অনুযায়ী, ডিগার বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪ কোটি ৬৪ লাখ ডলার আয় করেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল নির্মাণ ও প্রচারণা ব্যয়ের তুলনায় এই আয় অনেক কম। ভ্যারাইটির তথ্যমতে, সিনেমাটি থেকে সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ ১৫ কোটি থেকে ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে এটি চূড়ান্ত হিসাব নয়, অন্যান্য স্বত্ব বিক্রি ও আনুষঙ্গিক আয় বিবেচনায় চূড়ান্ত আর্থিক ফল বদলাতে পারে। ভ্যারাইটির ধারণা সিনেমাটি ২০০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে পারে, এই হিসাবটাই এখন শিরোনামে ঘুরছে।
এই ঘটনা টম ক্রুজের ক্যারিয়ারের জন্যও একটা পরীক্ষা। একজন তারকা যখন দীর্ঘদিন একই ধরনের সফল ছবি দিয়ে পরিচিত হন, তখন ভিন্ন ঘরানায় যাওয়া মানেই দর্শকের প্রত্যাশার সঙ্গে ঝুঁকি নেওয়া। ডিগারের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকিটা কাজ করেনি, অন্তত বক্স অফিসের হিসেবে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ছবিটির শিল্পগত আলোচনা শেষ। আইএমডিবির রেটিং আর একশ্রেণির দর্শকের পছন্দ দেখায়, ছবিটির নিজস্ব দর্শক আছে, শুধু সেই দর্শক বড় বাজেটের ছবিকে টিকিয়ে রাখার মতো বড় হয়নি।
শেষ পর্যন্ত ডিগারের গল্পটা শুধু একটি ছবির ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং বড় বাজেট, ভুল প্রত্যাশা আর অস্পষ্ট বিপণন একসঙ্গে মিললে কী হয়, তার উদাহরণ। ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ডলারের লক্ষ্য নিয়ে শুরু করে ৪ কোটি ৬৪ লাখ ডলারে এসে থামা মানে ব্যবধানটা এত বড় যে অন্যান্য স্বত্বের আয় দিয়েও তা পুরোপুরি পূরণ করা কঠিন। তাই এখন প্রশ্ন একটাই, টম ক্রুজ আর ইনারিতুর এই জুটির পরের পদক্ষেপ কী হবে, আর দর্শক কি পরের বার এই ভিন্ন ধারার ছবির জন্য হলে ফিরবেন, নাকি তাঁরা আবার সেই চেনা অ্যাকশন তারকার অপেক্ষায় থাকবেন।
