বৃষ্টিভেজা লালগালিচা দিয়ে শুরু হয়েছে ৩৯তম টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। টাইফুনের প্রভাবে টোকিওতে টানা বৃষ্টি ফিরেছিল গত সপ্তাহান্তে, আর সেই বৃষ্টির মধ্যেই গত সোমবার সন্ধ্যায় উৎসবের উদ্বোধন হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে দর্শকেরা বর্ষাতি পরে অপেক্ষা করছিলেন, আর অতিথিরা হাতে নিয়েছিলেন উৎসবের লোগোসহ স্বচ্ছ ছাতা। মঙ্গলবার থেকে পুরোদমে শুরু হয়েছে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, আর বুধবার আকাশে রোদ ফেরায় হিবিয়া, ইউরাকুচো, মারুনৌচি ও গিনজা এলাকায় উৎসবের পরিবেশ আরও জমে উঠেছে।
এবারের উৎসব চলবে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। দশ দিনের এই আয়োজনে প্রদর্শিত হবে ২০৪টি চলচ্চিত্র। শুধু সিনেমা দেখানোই নয়, নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্ব, সিম্পোজিয়াম, মাস্টারক্লাস এবং বিশেষ আলোচনার আয়োজনও থাকছে। উৎসবের প্রধান পুরস্কার টোকিও গ্রাঁ প্রির জন্য প্রতিযোগিতায় রয়েছে ১৫টি চলচ্চিত্র। বিশ্বের ১১২টি দেশ ও অঞ্চল থেকে জমা পড়া ১ হাজার ৮৯২টি ছবির মধ্য থেকে এই ১৫টি বেছে নেওয়া হয়েছে।
এই প্রতিযোগিতার তালিকাতেই রয়েছে বাংলাদেশের খবরটি, যা এবারের উৎসবের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড স্থান পেয়েছে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে। টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রায় চার দশকের ইতিহাসে এটাই প্রথমবার, যখন বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র এই মর্যাদাপূর্ণ বিভাগে জায়গা করে নিল। বাংলাদেশি সিনেমার জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক।
৮৮ মিনিটের এই ছবিটি বাংলাদেশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে। টোকিওর আগে ছবিটি ভেনিস ও টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছে। অর্থাৎ টোকিওতে আসার আগেই বিশ্বের বড় দুটি উৎসবের দর্শক ছবিটি দেখেছেন। টোকিওতে ছবিটির তিনটি প্রদর্শনী নির্ধারিত রয়েছে। ৩১ অক্টোবর তোহো সিনেমা চ্যানটারে, ১ নভেম্বর হিউলিক হলে এবং ২ নভেম্বর হিউম্যানট্রাস্ট সিনেমা ইউরাকুচোতে ছবিটি দেখানো হবে।
ছবিতে অভিনয় করেছেন জাইনীন চৌধুরী করিম, আজমেরী হক বাঁধন, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, শতাব্দী ওয়াদুদ ও সাবেরী আলম। কেন্দ্রে রয়েছেন ঢাকার এক হবু কনের গল্প। বিয়ের প্রস্তুতি, সৌন্দর্যচর্চা, পারিবারিক প্রত্যাশা ও সামাজিক নিয়মের চাপে তাঁর শরীর ও মন এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্ন, ভয়, স্মৃতি ও অলৌকিকতার মিশেলে এগিয়ে যায় কাহিনি।
ছবির বিষয়বস্তুও একে আলাদা করে তুলেছে। নারীর শরীর, ব্যক্তিগত ইচ্ছা, সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণা এবং বিয়েকে ঘিরে সমাজে চালু থাকা বৈষম্যমূলক রীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে এই সিনেমা। একজন হবু কনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন তোলার এই চেষ্টাই সম্ভবত আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোর দৃষ্টি কেড়েছে।
উদ্বোধনী দিনের লালগালিচায় ছিল আন্তর্জাতিক তারকাদের মেলা। ইন্দোনেশিয়ার পরিচালক গারিন নুগ্রোহো ও অভিনেতা নিকোলাস সাপুত্রা আসেন রেড বিফোর ডন নিয়ে। বেলজিয়ামভিত্তিক পরিচালক তেওদোরা আনা মিহাই ও অভিনেত্রী ভায়োলেট ব্রেকম্যান প্রতিনিধিত্ব করেন হেইসেল ৮৫ ছবির। চীনা পরিচালক চিউ জিয়ংজিয়ং এবং অভিনয়শিল্পী ওয়াং হি ও শু শুচুয়ান আসেন ফুক্সি: ফোর টেলস অব ফিস্টিং নিয়ে। ইরানি নির্মাতা বাহমান ঘোবাদি এবং ট্রিজ আর ওয়াচিং ছবির শিল্পীরাও ছিলেন লালগালিচায়।
উদ্বোধনী চলচ্চিত্র ছিল জেজে তাকাহিসা পরিচালিত সুকিয়াকি। বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় একটি জাপানি গানের পেছনের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত জাপানি গান উয়ে ও মুইতে আরুকো আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে সুকিয়াকি নামে পরিচিতি পায়। প্রথম জাপানি ভাষার গান হিসেবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ড হট ১০০ তালিকার শীর্ষে টানা তিন সপ্তাহ অবস্থান করেছিল। ছবিতে সুরকার, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পীর জীবন, সৃজনশীল সহযোগিতা, সংগ্রাম এবং পারস্পরিক মতপার্থক্যের ঘটনা উঠে এসেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাপানের চলচ্চিত্র ও কনটেন্ট শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন দেশটির অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আকাজাওয়া রিয়োসেই। তিনি জানান, বিদেশের বাজারে জাপানের কনটেন্ট শিল্পের বিক্রি প্রায় ৬ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছেছে। ভিডিও বার্তায় যুক্ত হন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে। তিনি বলেন, চলচ্চিত্র দেশের সীমানা পেরিয়ে মানুষকে যুক্ত করে এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ায়।
এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রবীণ চলচ্চিত্র নির্মাতা রলফ ডি হিয়ার। তাঁর সঙ্গে বিচারক হিসেবে আছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযোজক ওহ জুংওয়ান, ফ্রান্সের ডিআই কালারিস্ট ইয়োভ মুর, প্রযোজক অ্যালেক্স লো ও জাপানি অভিনেত্রী ওয়াতানাবে মাকিকো। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রলফ ডি হিয়ার তাঁর চলচ্চিত্রজীবনে জাপানি নির্মাতা ইয়াসুজিরো ওজু, নাগিসা ওশিমা ও আকিরা কুরোসাওয়ার প্রভাবের কথা স্মরণ করেন।
প্রদর্শনীর পাশাপাশি উৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রবাজার টিফকম। বুধবার থেকে হামামাৎসুচোর টোকিও মেট্রোপলিটন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেড সেন্টারে শুরু হয়েছে এই আয়োজন। টিফকমের টোকিও গ্যাপ ফিন্যান্সিং মার্কেটে অংশ নিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৪টি চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন প্রকল্প। এই কর্মসূচি চলবে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। এ ছাড়া কুরোসাওয়া আকিরা অ্যাওয়ার্ড, টিফ এথিক্যাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড ও কাশিকো কাওয়াকিতা অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হবে এবারের আয়োজনের অংশ হিসেবে।
বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, টোকিওতে প্রতিযোগিতার ফল কী হবে। ৪ নভেম্বর উৎসব শেষ হলে জানা যাবে টোকিও গ্রাঁ প্রি কার হাতে যাচ্ছে। পুরস্কার জিতুক বা না জিতুক, মূল প্রতিযোগিতায় প্রথম বাংলাদেশি সিনেমা হিসেবে দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইডের জায়গা করে নেওয়াটাই ইতিমধ্যে ইতিহাস। ভেনিস ও টরন্টোর পর টোকিওর এই স্বীকৃতি বাংলাদেশি সিনেমার আন্তর্জাতিক যাত্রায় একটি নতুন অধ্যায় যোগ করল।
