অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস স্বামী অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণ করছেন পরিচালক দেওয়ান নাজমুল। শিশির ভেজা চোখ নামের এই ছবির শুটিং এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। ঢাকা জেলার শ্রীনগরে চলছে ছবিটির দৃশ্যধারণ। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকে বড় পর্দায় আনার এই উদ্যোগ তাই এখন চলচ্চিত্র মহলে আলোচনার বিষয়।
ছবির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন রাজরিপা, শিপন মিত্র, সাব্বির আহমেদ, বদ্দা মিঠু, শিবা শানু, শিরীন আলম, রেশমী, ববি, জ্যাকি, ফিরোজ আলম, নৈরিতা ও অধরা চৌধুরীসহ অনেকে। এত বড় শিল্পী সমাবেশ থেকে বোঝা যায়, পরিচালক গল্পের প্রতিটি চরিত্রকে গুরুত্ব দিয়ে সাজাচ্ছেন। রাজরিপা কেন্দ্রীয় চরিত্রে থাকায় তার অভিনয়ের দিকেও থাকছে বাড়তি নজর।
দীর্ঘ বিরতির পর নতুন সিনেমা নির্মাণে ফিরেছেন দেওয়ান নাজমুল। এর আগে যৌথ প্রযোজনায় সীমারেখা এবং নিজস্ব প্রযোজনায় নাকফুল ও তোরে কত ভালোবাসি সিনেমা নির্মাণ করেছেন তিনি। পাশাপাশি বেশ কিছু নাটকও পরিচালনা করেছেন। এই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন, সাহিত্যনির্ভর ছবিতে গল্পের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা কতটা জরুরি, আবার একই সঙ্গে সিনেমার ভাষায় গল্প বলাও কতটা কঠিন।
শিশির ভেজা চোখ নির্মাণের কারণ ব্যাখ্যা করে পরিচালক বলেন, শরৎচন্দ্রের সাহিত্যকর্মটি অনেক পুরোনো হলেও মানুষের আবেগের পরিবর্তন হয়নি। আধুনিকতা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাবে সমাজে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটলেও মানুষের শিকড় বদলায়নি। এই কথাটাই ছবির মূল সুর। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু প্রেম, অভিমান, কর্তব্য আর অনুশোচনার অনুভূতিগুলো আজও একই রয়ে গেছে।
কেন শরৎচন্দ্রের স্বামী বেছে নিলেন, এমন প্রশ্নে দেওয়ান নাজমুল বলেন, শরৎচন্দ্রের অন্য লেখার চেয়ে স্বামীতেই তাকে বেশি উপলব্ধি করেছি। সিনেমাটি নির্মাণ করতে গিয়ে সিনেমাটিক পরিমার্জন ছাড়া শরৎচন্দ্রকেই সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেছি। তার চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণার পরশ ছবিটির প্রতিটি দৃশ্যেই পাওয়া যাবে। অর্থাৎ পরিচালক গল্পকে আধুনিক মোড়কে সাজাতে চান, কিন্তু শরৎচন্দ্রের মূল চেতনাকে সরিয়ে নয়, সেটাকে ধরে রেখেই।
ছবির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে মিনি, ঘনশ্যাম ও নরেনের সম্পর্ক। ছোটবেলায় প্রেমের সম্পর্কে জড়ালেও মিনির বিয়ে হয় বয়সে বড় ও বিপত্নীক ঘনশ্যামের সঙ্গে। অনিচ্ছার এই বিয়েতে প্রথমদিকে স্বামীর প্রতি মানসিক দূরত্ব ও বিতৃষ্ণা অনুভব করে সে। ঘনশ্যামের শান্ত, সহিষ্ণু ও কর্তব্যপরায়ণ স্বভাবও সহজে বুঝতে পারে না মিনি। এই দূরত্বই গল্পের প্রথম ধাক্কা, যেখানে একজন নারীর অনিচ্ছা, সমাজের চাপ আর ব্যক্তিগত অনুভূতি মুখোমুখি হয়।
একপর্যায়ে মিনির পুরোনো প্রেমিক নরেন ফিরে আসে। তার হাত ধরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পরে ঘনশ্যামের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মর্যাদার মূল্য উপলব্ধি করে মিনি। অনুশোচনা নিয়ে ফিরে আসে স্বামীর কাছে। এভাবেই গল্পে উঠে এসেছে সম্পর্ক, ভালোবাসা, উপলব্ধি ও নারীর মর্যাদার প্রসঙ্গ। শরৎচন্দ্রের লেখায় নারীর অন্তর্জগত সবসময়ই প্রধান ছিল, আর এই ছবিতেও সেই অন্তর্জগতই দর্শকের সামনে আসবে। মিনির ফিরে আসা শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়, এটি একজন নারীর নিজের অনুভূতিকে নতুন করে চেনার গল্প।
শুটিং এখনো চলছে, তাই ছবির মুক্তির তারিখ এখনো ঘোষিত হয়নি। তবে শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয় উপন্যাস, অভিজ্ঞ পরিচালক আর বড় শিল্পী দল মিলে শিশির ভেজা চোখ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সাহিত্যনির্ভর সিনেমা বাংলাদেশে সবসময়ই একটি বিশেষ দর্শক পায়, যারা গল্পের গভীরতা আর চরিত্রের সত্যতাকে বাণিজ্যিক চমকের চেয়ে বেশি মূল্য দেন। সেই দর্শকদের জন্যই এই ছবি একটি অপেক্ষার নাম হয়ে উঠছে।
