বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলিচালনার ঘটনায় গ্রেফতার তিন অভিযুক্তের মধ্যে থাকা ১৮ বছর বয়সী রেহানের বাবা প্রথমবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন। ছেলে গ্রেফতারের পর তিনি জানিয়েছেন, প্রায় দশ থেকে বারো বছর ধরে ছেলের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। এমনকি ছেলের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন। তাঁর স্পষ্ট ভাষ্য, আইন নিজের পথে চলুক, ছেলের যে শাস্তি প্রাপ্য, তা-ই দেওয়া হোক।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৮ অক্টোবর, রোববার। মুম্বাইয়ে একটি ফুটবল মাঠের বাইরে টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। অভিনেতা বড়সড় আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তাঁর গাড়ির চালক গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনার পরপরই মুম্বাই পুলিশ তদন্তে নামে এবং পালানোর রুট ধরে তিন অভিযুক্তকে রাজস্থানের কোটা রেলওয়ে স্টেশন থেকে গ্রেফতার করে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন হরিয়ানার সোনিপত জেলার বাসিন্দা রেহান (১৮), আরেক নাবালক ফুল সিং (১৭) এবং ২২ বছরের হৃতিক কুমার ওরফে রোশন, যিনি মুম্বাইয়ে র্যাপিডো চালক হিসেবে কাজ করতেন।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে পালানোর রুটের চিত্রও। গুলি চালানোর পর অভিযুক্তরা প্রথমে এসভি রোড ধরে আন্ধেরি স্টেশনে যান, সেখান থেকে গুজরাট হয়ে ট্রেনে রাজস্থানের দিকে পালানোর চেষ্টা করেন। কোটায় পৌঁছানোর আগেই তাঁরা ধরা পড়েন। অনিল পণ্ডিতের নামে এই হামলার দায় স্বীকার করে একটি পোস্ট ছড়িয়েছে, তবে পুলিশ সেই দাবির সত্যতা যাচাই করে দেখছে। এই তিনজনের প্রত্যেকের ভূমিকা, হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর নেপথ্যে আর কারা জড়িত, তা এখন তদন্তাধীন।
রেহানের পারিবারিক পটভূমি নিয়ে বাবা শুদীনের বক্তব্যে উঠে এসেছে একটি ভাঙা পরিবারের চিত্র। তাঁর ভাষায়, প্রায় আট থেকে দশ বছর ধরে পরিবারের সদস্যরা আলাদা থাকেন। রেহানের মা শামসিদা একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেন। বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর থেকে রেহান মায়ের সঙ্গেই থাকত। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর স্কুল ছেড়ে দেয় সে।
শুদীন আরও জানান, এটিই রেহানের প্রথম অপরাধ নয়। গত ১৯ আগস্ট হরিয়ানায় বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ওই মামলাটি হয়েছিল প্রায় চার-পাঁচ মাস আগে। পরে রেহানের মা জামিনের ব্যবস্থা করেন। সংবাদমাধ্যমকে রেহানের মাসি অফসানা জানিয়েছেন, জেল থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর রেহান ঝালাইয়ের কাজ শুরু করেছিল। কাজের জন্যই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। ঈদের সময় একবার বাড়িতেও এসেছিল, তারপর আবার চলে যায়।
এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে বলিউড তারকাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। এর আগেও সালমান খানসহ একাধিক তারকার বাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশে হুমকি ও গুলির ঘটনা ঘটেছে। টাইগার-হামলার পর বলিউডে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়, যা নিয়ে প্রবীণ শিল্পীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একের পর এক এমন ঘটনা ভারতের বিনোদনজগতে নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ এখন এই মামলার গভীরে যাচ্ছে। গ্রেফতার তিনজনের প্রত্যেকের ভূমিকা আলাদা করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারা তাঁদের এই কাজে ব্যবহার করল, অস্ত্র কোথা থেকে এল, এবং এর পেছনে কোনো সংগঠিত চক্র আছে কিনা, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারীরা। বাবার বক্তব্য তদন্তে নতুন কোনো মোড় আনবে কিনা, তা সময়ই বলবে। তবে শুদীনের ভাষ্য স্পষ্ট: তিনি ছেলের পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন না, আইনের হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন পুরো বিষয়টি।
এই মামলায় এর আগেও গ্রেফতার হয়েছে। টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলির ঘটনায় অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে আরও চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অর্থাৎ ঘটনার পেছনে শুধু গুলি চালানো তিনজন নয়, অস্ত্রের যোগানদাতাদের একটি শৃঙ্খলও সক্রিয় ছিল বলে তদন্তকারীদের ধারণা। এই গ্রেফতারগুলো মিলিয়ে মামলাটি এখন একটি সংগঠিত চক্রের দিকে ইঙ্গিত করছে।
এই ঘটনার নেপথ্যে কারাগারে থাকা কুখ্যাত অপরাধী লরেন্স বিষ্ণোইয়ের গ্যাংয়ের নামও উঠে এসেছে। এর আগে টাইগার-হামলায় বিষ্ণোই গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে কোটা রেলস্টেশন থেকে গ্রেফতারের খবর প্রকাশিত হয়। বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হুমকির তালিকায় আগেও ছিলেন সালমান খানসহ একাধিক বলিউড তারকা। অনিল পণ্ডিতের দায়-স্বীকারের পোস্ট নিয়েও তদন্ত চলছে, যদিও পুলিশ এখনও এর সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
