পাইলটের পোশাক পরে ঢাকার বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন তৌসিফ মাহবুব। উদ্দেশ্য ছিল চরিত্রের প্রস্তুতি, কিন্তু অভিজ্ঞতাটা হয়ে গেল একেবারে বাস্তব। অনেকেই তাঁকে অভিনেতা হিসেবে চিনতে পারেননি। পেশাদার পাইলট ভেবে কেউ কেউ তাঁকে আলাদা সম্মানও দেখিয়েছিলেন। মজার এই ঘটনাটা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন তৌসিফ নিজেই, আর সেখান থেকেই আবার আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁর নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘ক্যাফে আমব্রেলা’।
পোশাকটা এমনি এমনি তৈরি হয়নি। ‘ক্যাফে আমব্রেলা’তে তৌসিফকে দেখা যাবে পাইলটের চরিত্রে। সেই চরিত্রের জন্য সাদা শার্ট, টাই, কালো প্যান্ট, পাইলটের টুপি আর ব্যাজসহ পেশাদার পাইলটদের আদলে পোশাক তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশের পাইলটদের পোশাকের ধরন ভালো করে লক্ষ করে, নিজের মাপ অনুযায়ী পোশাক বানিয়েছিলেন তিনি। শুটিংয়ের বাইরে বিমানবন্দরে সেই পোশাকে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাটাই তাঁকে একটা নতুন উপলব্ধি দিয়েছে। চরিত্রের পোশাক যে একজন মানুষের প্রতি অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও প্রভাব ফেলতে পারে, সেটা তিনি নিজে টের পেয়েছেন সেদিন।
অভিনেতা হিসেবে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থাকলেও পাইলটের এই সাজ তাঁর জন্য ছিল একেবারে নতুন। রোমান্টিক নায়ক, পারিবারিক গল্পের ছেলে, কমেডি, সিরিয়াস চরিত্র, সবই তিনি করেছেন। কিন্তু ইউনিফর্ম পরা একজন পেশাদারের চরিত্রে দাঁড়ানো, তার হাঁটাচলা, তার আত্মবিশ্বাস, সবকিছুই আলাদা। বিমানবন্দরের ঘটনাটা যেন সেই প্রস্তুতিরই একটা পরীক্ষা হয়ে গিয়েছিল, যেখানে দর্শক নয়, সাধারণ মানুষই তাঁকে সত্যিকারের পাইলট বলে মেনে নিয়েছিল।
‘ক্যাফে আমব্রেলা’ শুধু তৌসিফের গল্প নয়। নির্মাতা শিহাব শাহীনের এই ওয়েব ফিল্মে চার জুটির প্রেম, মান-অভিমান, ভুল-বোঝাবুঝি আর সম্পর্কের নানা সমীকরণ উঠে এসেছে। নাম শুনে ক্যাফে বা খাবারকেন্দ্রিক গল্প মনে হলেও, আসলে ‘ক্যাফে আমব্রেলা’তে মূলত মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও সম্পর্কের নানা দিকই দেখানো হবে। শিহাব শাহীনের মতে, এটি বেশ কয়েকটি চরিত্রের সমান্তরাল গল্প। চারটি আলাদা গল্প এগিয়ে গিয়ে একপর্যায়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হবে। শুধু প্রেমের মিষ্টি মুহূর্ত নয়, সম্পর্কের জটিলতা, ভুল-বোঝাবুঝি ও মান-অভিমানের নানা দিকও এতে থাকবে।
জুটিগুলোর বিন্যাসটাও দর্শকের আগ্রহের একটা বড় কারণ। বিদুষী বর্ণিতার বিপরীতে রয়েছেন তৌসিফ মাহবুব, নাযাহ নাওয়ারের সঙ্গে পার্থ শেখ, আর আমিনা ইসলামের বিপরীতে আরেফিন জিলানী। অন্য জুটিতে দেখা যাবে সাইদুর রহমান পাভেল ও সানজিদা তাসনিমকে। ‘লাক্স সুপারস্টার ২০২৫’-এর চ্যাম্পিয়ন বিদুষী বর্ণিতা, প্রথম রানারআপ নাযাহ নাওয়ার ও দ্বিতীয় রানারআপ আমিনা ইসলামকে নিয়ে তৈরি হয়েছে এই ওয়েব ফিল্ম। অর্থাৎ একদিকে পরিচিত মুখ, অন্যদিকে অভিনয়ের নতুন তিন মুখ, এই মিশেলটাই ছবির একটা বড় শক্তি।
লাক্স সুপারস্টার হওয়ার পর ‘ক্যাফে আমব্রেলা’ বিদুষী বর্ণিতার প্রথম বড় কাজ। সহশিল্পী হিসেবে তৌসিফকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত তিনি। তাঁর ভাষায়, আগে তৌসিফের কাজ দেখে মনে হতো তিনি বড় তারকা, তাঁর আলাদা একটা আভা আছে। এখন কাজ করতে গিয়ে দেখছেন, তিনি বড় ভাইয়ের মতো, বন্ধুর মতো। নিজের দৃশ্য বাদ দিয়েও বিভিন্ন কিছু শেখাচ্ছেন, গাইড করছেন। নতুনদের জন্য এ ধরনের সহযোগিতা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছেন বিদুষী।
তৌসিফও নতুন সহশিল্পীর প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, বড় একটি মঞ্চে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে বিদুষীর চেষ্টা ও যোগ্যতা রয়েছে। নাযাহ আর আমিনার জন্যও শুভকামনা জানিয়েছেন তিনি। নতুনদের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তাঁর কথা, শুরুতে নিজেরাও এমন দিকনির্দেশনা পেলে অভিনয়জীবনের ভুলগুলো আরও কম হতো। অর্থাৎ সিনিয়র হিসেবে তিনি যে দায়িত্বটা অনুভব করেন, সেটা এই ছবিতে স্পষ্ট।
নাযাহ নাওয়ারের কাছে শিহাব শাহীনের সঙ্গে কাজের সুযোগটি বড় প্রাপ্তির মতো। তাঁর ভাষায়, লাক্স থেকে বেরিয়ে প্রথম কাজ শিহাব শাহীন স্যারের সঙ্গে, এটা তাঁর কাছে বড় সুযোগ মনে হয়েছে। নতুন হিসেবে যতটা সহযোগিতা আশা করেছিলেন নির্মাতা ও সহশিল্পীদের কাছে, তার চেয়ে বেশি পেয়েছেন। লাক্সে অংশ নেওয়ার আগে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘অ্যানি’ সিরিজে অভিনয় করেছিলেন নাযাহ। তবে তাঁর কথা, দ্বিতীয় কাজ হলেও মুক্তির দিক দিয়ে এখন এটিই প্রথম। তাই খানিকটা ভয়ে আছেন, মানুষ কীভাবে গ্রহণ করে। তবে আশা করছেন, ভিন্ন রকম কিছুই পাবে দর্শক।
অন্যদিকে আমিনা ইসলামের অভিনয়জীবনের আনুষ্ঠানিক অভিষেক হচ্ছে ‘ক্যাফে আমব্রেলা’ দিয়ে। কাজটি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি জানিয়েছেন, এই ওয়েব ফিল্মটি সারা জীবন মনে গেঁথে থাকবে। প্রথমবারের মতো অভিনয়জগতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে আনন্দিত আমিনা। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও কাজটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত। অর্থাৎ তিন নতুন মুখের তিন রকম যাত্রা এই এক ছবিতে মিলেছে, আর সেটাই ‘ক্যাফে আমব্রেলা’কে শুধু একটা প্রেমের গল্পের চেয়ে বেশি কিছু করে তুলেছে।
তিন নতুন অভিনয়শিল্পীকে ‘ক্যাফে আমব্রেলা’র জন্য তৈরি করতে শুটিংয়ের আগে কর্মশালা করেছিলেন শিহাব শাহীন। প্রথম আলোকে তিনি জানিয়েছেন, লাক্স প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুবাদে তারা গ্রুমিং পেয়েছে, তবে অভিনয়ের আলাদা প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল না, সে জায়গায় তাদের তৈরির চেষ্টা করেছেন তিনি। অর্থাৎ মঞ্চের ঝলক আর ক্যামেরার সামনে অভিনয়, এই দুটোর পার্থক্যটা নির্মাতা শুরুতেই ধরতে চেয়েছেন।
‘ক্যাফে আমব্রেলা’ নিয়ে তৌসিফের প্রত্যাশা, এটি কেবল রোমান্টিক গল্পে আটকে থাকবে না। পরিবার, দাম্পত্য জীবন এবং মানুষের অজান্তে ঘটে যাওয়া ভুলভ্রান্তিও এতে উঠে আসবে। তাঁর ভাষায়, দর্শক একটি পূর্ণাঙ্গ কাজ দেখতে পাবেন। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায়, লাক্সের আয়োজনে নির্মিত ওয়েব ফিল্মটি দেখা যাচ্ছে আইস্ক্রিনে, মুক্তি পেয়েছে আজ ২৯ অক্টোবর। মুক্তির আগে ২২ অক্টোবর ওয়েব ফিল্মটির ট্রেলার প্রকাশিত হয়, তাতে বিভিন্ন জুটির সম্পর্কের নানা সমীকরণ ও আবেগের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। আর আইস্ক্রিনে মুক্তির আগে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকার পান্থপথের স্টার সিনেপ্লেক্সে ওয়েব ফিল্মের বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে ছবির অভিনয়শিল্পীসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা থাকবেন। পাইলটের পোশাকে বিমানবন্দরের সেই মজার অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে চার জুটির জটিল সম্পর্ক, সব মিলিয়ে ‘ক্যাফে আমব্রেলা’ এখন দর্শকের বিচারের অপেক্ষায়।
