বই প্রকাশের আগেই টেলিভিশন সিরিজ হচ্ছে, এমন খবর প্রকাশনা জগতে বিরল নয়, কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লেখকের ক্ষেত্রে ঘটলে সেটা আলাদা আনন্দের হয়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক তাহমিমা আনামের নতুন উপন্যাস ‘গুড বুকস’ এবার টেলিভিশন সিরিজে রূপ নিতে যাচ্ছে। উপন্যাসটি এখনো বাজারে আসেনি, প্রকাশের কথা ২০২৮ সালে, অথচ এর মধ্যেই সিরিজ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পেসসেটার প্রোডাকশনস আর যুক্তরাজ্যের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কুডোস। বিনোদনবিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ভ্যারাইটির এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রথম এই খবর জানা যায়, আর চ্যানেল আই অনলাইন ৩০ অক্টোবর তা প্রকাশ করেছে।
সিরিজটির চিত্রনাট্য লিখবেন তাহমিমা আনাম নিজে, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এমি মনোনীত চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক অ্যালিসন ব্রাউন। অ্যালিসন ব্রাউনের নাম টেলিভিশন দর্শকদের কাছে পরিচিত, কারণ জনপ্রিয় সিরিজ ‘এমিলি ইন প্যারিস’, ‘ইয়ঙ্গার’ আর ‘আপলোড’-এ কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। লেখক নিজে চিত্রনাট্যে থাকা মানে বইয়ের সুর আর চরিত্রের মেজাজ পর্দায় ধরে রাখার সম্ভাবনা বেশি থাকে, আর অভিজ্ঞ সহ-লেখক থাকা মানে টেলিভিশনের ছন্দটাও ঠিক থাকবে। এই জুটিই ‘গুড বুকস’ সিরিজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি।
গল্পটা কী নিয়ে, সেটাও জানা গেছে প্রকাশনা সংস্থার বর্ণনা থেকে। ‘গুড বুকস’ প্রকাশনা জগতের নেপথ্যের গল্প বলবে, অর্থাৎ কীভাবে একটি বই তৈরি হয়, সেই প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকে, আর সাফল্যের পথে নিজের যোগ্যতা নিয়ে সংশয় কাটিয়ে ওঠার গল্প উঠে আসবে। প্রকাশনা সংস্থার ভাষায়, উপন্যাসটি ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’ আর ‘ইয়েলোফেস’-এর মিশেল, ফলে পেশাগত দুনিয়ার চাপ আর সৃজনশীল জগতের টানাপোড়েন দুটোই এখানে থাকবে বলে ধারণা করা যায়। এর পাশাপাশি মা মেয়ের সম্পর্ক আর জীবনে বিকল্প অভিভাবক হয়ে ওঠা মানুষদের সম্পর্কও উপন্যাসের অন্যতম বিষয়।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রায়া চ্যাটার্জি। নিউ ইয়র্কের একটি বইয়ের দোকানে কাজ করার সময় তার পরিচয় হয় লন্ডনের প্রভাবশালী সাহিত্য প্রতিনিধি প্রু ম্যাকনিলের সঙ্গে। এই পরিচয় রায়ার জীবনে নতুন পেশার সুযোগ তৈরি করে, আবার তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজের জন্মশহর লন্ডনে, যেখানে অপেক্ষা করছে অতীতের কিছু গোপন সত্য। ফলে গল্পে একসঙ্গে থাকছে পেশাগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নতুন শহরে নতুন জীবন, আর অতীতের মুখোমুখি হওয়ার টান। বইপ্রেমীদের কাছে এই প্রেক্ষাপটই আলাদা আকর্ষণ তৈরি করবে, কারণ বইয়ের দোকান, প্রকাশক আর সাহিত্য প্রতিনিধিদের দুনিয়া পর্দায় খুব কমই এত কাছ থেকে দেখা যায়।
বইটির প্রকাশনা যাত্রাও কম চমকপ্রদ নয়। ‘গুড বুকস’ প্রথম ঘোষণা করা হয় এডিনবরা বুক ফেস্টিভ্যালে, যেখানে একাধিক আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন তাহমিমা আনাম। উৎসব চলাকালে যুক্তরাজ্যের প্রকাশনা সংস্থা ক্যাননগেট বইটি প্রকাশের স্বত্ব কেনার ঘোষণা দেয়। উত্তর আমেরিকায় বইটির প্রকাশনা স্বত্ব নিয়েছে ক্যাননগেটের নিয়মিত মার্কিন সহযোগী প্রকাশনা সংস্থা স্ক্রিবনার। অর্থাৎ বই প্রকাশের আগেই দুই মহাদেশের বড় প্রকাশক আর দুই দেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এই গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে, যা লেখকের প্রতি প্রকাশনা ও বিনোদন জগতের আস্থার প্রমাণ।
সিরিজ নির্মাণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান দুটির পরিচয়ও আস্থা বাড়ায়। পেসসেটার প্রোডাকশনস প্রতিষ্ঠা করেছেন জেসিকা রোডস। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি পিককের স্পাই থ্রিলার সিরিজ ‘পনিস’ প্রযোজনা করেছে, আর চার্লি ব্রুকারের সঙ্গে জনপ্রিয় সিরিজ ‘ব্ল্যাক মিরর’ এবং আসন্ন কমেডি ‘কাঙ্ক অন সিনেমা’তেও প্রযোজক হিসেবে যুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে বানিজে গ্রুপের অংশ কুডোস যুক্তরাজ্যের টেলিভিশন প্রযোজনায় পরিচিত নাম, যাদের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘হাউস অব গিনেস’, ‘এসএএস: রগ হিরোস’ আর ‘গ্রান্টচেস্টার’। ফলে ‘গুড বুকস’ এমন দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাচ্ছে, যারা মানসম্মত টেলিভিশন বানাতে অভ্যস্ত।
তাহমিমা আনামের পরিচয়ও এই খবরকে বড় করে তোলে। ঢাকায় জন্ম নেওয়া এই লেখক তার ‘বেঙ্গল ট্রিলজি’র জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘আ গোল্ডেন এজ’, ‘দ্য গুড মুসলিম’ আর ‘আপ রাইজিং’। প্রথম বইয়ের জন্য তিনি কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজ অর্জন করেন, এ ছাড়া পেয়েছেন ও. হেনরি অ্যাওয়ার্ড। তার উপন্যাস ‘আপ রাইজিং’ রাজনৈতিক কথাসাহিত্যের জন্য অরওয়েল প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নেয়। গ্রান্টার ‘বেস্ট অব ইয়ং ব্রিটিশ নভেলিস্ট’ তালিকায়ও স্থান পেয়েছেন তিনি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞানে পড়াশোনা করা তাহমিমা রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচারের ফেলো।
এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। সিরিজটির মুক্তির সময়সূচি কিংবা সম্প্রচারমাধ্যম সম্পর্কে এখনো কোনো ঘোষণা আসেনি, কারা অভিনয় করবেন, তাও জানা যায়নি। বই প্রকাশের আগে সিরিজের কাজ শুরু হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নগুলো সামনে আসবে ধীরে ধীরে। তবে এটুকু নিশ্চিত, প্রকাশের দুই বছর আগেই ‘গুড বুকস’ বই আর পর্দা দুই জগতেই আলোচনায় চলে এসেছে। বাংলাদেশি পাঠকদের জন্য এটা গর্বের খবর, কারণ ঢাকায় জন্ম নেওয়া এক লেখকের গল্প এবার আন্তর্জাতিক পর্দায় নতুনভাবে উঠে আসতে যাচ্ছে। বইটি প্রকাশ পেলে আর সিরিজের কাস্ট ঘোষণা হলে এই গল্পের পরের অধ্যায়গুলো আরও স্পষ্ট হবে।
