৩০ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে আক্কা, যশ রাজ ফিল্মস এন্টারটেইনমেন্টের নতুন ওয়েব সিরিজ। লেখক ও পরিচালক ধর্মরাজ শেঠি। মোট পাঁচটি পর্ব, প্রতিটি প্রায় ৩৫ মিনিটের। মুখ্য দুই চরিত্রে কীর্তি সুরেশ ও রাধিকা আপ্তে। মুক্তির দিনেই প্রথম রিভিউগুলো এসেছে, আর সেগুলো পড়লে একটা ছবি পরিষ্কার হয়: অভিনয়, বিশেষ করে কীর্তির অভিনয় নিয়ে প্রশংসা প্রায় সর্বসম্মত, কিন্তু সিরিজের গল্প বলার ধরন নিয়ে মত ভাগ হয়ে গেছে।
গল্পের কেন্দ্রে কাল্পনিক শহর পের্নুরু, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারীরাই ক্ষমতায়। এই সমাজের নিয়ম আলাদা। এখানে প্রেমিক থাকতে পারে, কিন্তু স্বামী হিসেবে সংসার পাতার রীতি নেই। সিংহাসনে যিনি বসেন, তাঁকেই বলা হয় আক্কা, পের্নুরুর পবিত্র অভিভাবক। তিনটি ঘর, মালেমার, হেরকাদা আর পারপ্ল্যাডি, এই ক্ষমতার কাঠামো ধরে রেখেছে। গল্প কয়েকটি সময়ে ঘুরে বেড়ায়, চৌদ্দ শতক, উনিশ শ পঞ্চাশের দশক আর আশির দশক। মূল ঘটনা ১৯৮৫ সালের আবহে।
বর্তমান সময়ের সিংহাসনের কাছাকাছি আছেন মুথাক্কা, চরিত্রে তন্বী আজমি। তাঁর ডান হাত ভবানী, চরিত্রে কীর্তি সুরেশ, যিনি সিংহাসনের পরের উত্তরাধিকারী। অন্যদিকে বোম্বের গ্যাংস্টার শঙ্কর আন্নার হয়ে পের্নুরুতে আসে রুদ্র, চরিত্রে রাধিকা আপ্তে। মদের ব্যবসার টেন্ডার দখল আর পুরোনো প্রতিশোধ, এই দুই সূত্রে ভবানী আর রুদ্র মুখোমুখি হয়। প্রথম মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যটি অনেক রিভিউতেই আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ সেখানে চিৎকারের চেয়ে চাপা উত্তেজনাই বেশি কাজ করে।
প্রথম প্রতিক্রিয়ায় সবচেয়ে ধারাবাহিক প্রশংসা পেয়েছেন কীর্তি সুরেশ। নিউজ১৮ লিখেছে, মহানতীর পর এটাই তাঁর সেরা অভিনয় হতে পারে। তাঁদের মতে, ভবানীর নিষ্ঠুরতা আর কোমলতা, দুটোই একসঙ্গে ধরে রাখতে পেরেছেন কীর্তি। সিনেমা এক্সপ্রেসের রিভিউতে বলা হয়েছে, কীর্তির ক্লোজ আপেই একজন যোদ্ধার দৃঢ়তা আর পরাজয়ের বেদনা, দুটোই ধরা পড়ে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ভাষায়, কীর্তিই এই সিরিজকে টেনে নিয়ে গেছেন। সহশিল্পীদের মধ্যে তন্বী আজমি, পূজা মোহনরাজ, পূর্ণিমা ইন্দ্রজিৎ আর অঞ্জলি পাটিলের অভিনয়ও বেশ কয়েকটি রিভিউতে প্রশংসা পেয়েছে।
সিরিজের লুক নিয়েও প্রশংসা আছে। শাড়ি, ভারী গয়না, পুরোনো দিনের আবহ আর পের্নুরুর সাজসজ্জা, এগুলোকে অনেক সমালোচকই সিরিজের বড় শক্তি বলেছেন। নিউজ১৮-এর মতে, সাজসজ্জার যত্ন সিরিজের সময় আর সংস্কৃতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। সিনেমা এক্সপ্রেস লিখেছে, সোনার ঝলক দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে বোঝা যায়, এই ঐশ্বর্যের পেছনে ক্ষমতা আর উত্তরাধিকারের লড়াই লুকিয়ে আছে।
কিন্তু দুর্বলতার তালিকাটাও ছোট নয়। প্রথম তিনটি পর্ব নিয়ে প্রায় সব রিভিউতেই একই অভিযোগ, তথ্য আর চরিত্রের ভিড়ে গল্প ধীরে এগোয়। কোন ঘর, কোন গোষ্ঠী, কে কার আত্মীয়, এই হিসাব রাখতে গিয়ে দর্শকের মনোযোগ ভাগ হয়ে যায় বলে লিখেছে সিনেমা এক্সপ্রেস। নিউজ১৮-এর মতে, পাঁচটি পর্বের পরও চিত্রনাট্য আরও ছিমছাম হতে পারত, আর কিছু সংলাপ স্বাভাবিক কথোপকথনের চেয়ে উপন্যাসের লাইনের মতো শোনায়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সমালোচনা আরও কড়া, তাঁদের মতে, স্টাইল প্রচুর, কিন্তু সারবস্তু সেই তুলনায় কম, আর সহিংসতার কিছু দৃশ্য অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রকট।
রেটিংয়েও এই ভাগাভাগি স্পষ্ট। নিউজ১৮ দিয়েছে ৫-এর মধ্যে ৩.৫, সিনেমা এক্সপ্রেস দিয়েছে ৫-এর মধ্যে ৩, আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস দিয়েছে ৫-এর মধ্যে ২। অর্থাৎ একই সিরিজ কারও কাছে দেখার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী কাজ, কারও কাছে সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার উদাহরণ। রাধিকা আপ্তের রুদ্র নিয়েও মত আলাদা। নিউজ১৮ তাঁকে রহস্যময় আর আত্মবিশ্বাসী প্রতিপক্ষ বলেছে, আবার সিনেমা এক্সপ্রেসের মতে, চরিত্রটির ভেতরের বড় মাপটা পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি।
ভবানীর ব্যক্তিগত জীবন সিরিজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নিউজ১৮-এর রিভিউ অনুযায়ী, ভবানী প্রেমিক নন্দার সঙ্গে সংসার আর সন্তানের প্রশ্নে টানাপোড়েনে থাকেন। তিনি কন্যাসন্তান চান, যাতে বংশের ধারা এগিয়ে যায়, আর নন্দা বিয়ের কথা বলেন। এই টানাপোড়েন পের্নুরুর নিয়মের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে, যেখানে নারীর ক্ষমতা থাকলেও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত সহজ নয়। এই অংশটুকুই ভবানীকে শুধু গ্যাংস্টার নয়, একজন মানুষ হিসেবে দাঁড় করায় বলে মনে করেছেন সমালোচকেরা।
কীর্তি সুরেশের জন্য এই সিরিজের আরেকটি মানে আছে। মুক্তির আগে বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল, বড় পর্দার তারকা বলে তাঁকে ওটিটিতে কাজ না করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল। সেই পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি আক্কা বেছে নেন। এখন প্রথম রিভিউগুলো বলছে, সেই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় পুরস্কার তাঁর নিজের অভিনয়ই। সিরিজ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কীর্তির ভবানী নিয়ে বিতর্ক প্রায় নেই।
কোথায় দেখবেন, এই প্রশ্নের উত্তর সহজ। আক্কা এখন নেটফ্লিক্সে স্ট্রিমিং হচ্ছে। হিন্দি সিরিজ হিসেবে মুক্তি পেয়েছে এটি। পাঁচটি পর্ব মিলিয়ে দেখতে প্রায় তিন ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। যাঁরা গ্যাংস্টার ড্রামা, নারীকেন্দ্রিক ক্ষমতার গল্প আর বিস্তারিত বিশ্ব নির্মাণ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটি আগ্রহের কাজ হতে পারে। তবে যাঁরা দ্রুতগতির, সরল গল্প চান, তাঁদের প্রথম পর্বগুলো ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে পারে।
এরপর কী, সেই প্রশ্ন এখনো খোলা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিভিউতে পঞ্চম পর্বের শেষে এক ধরনের বিরতির কথা বলা হয়েছে, যেখানে মনে হয় গল্পের পরের অংশ আসতে পারে। তবে নির্মাতাদের পক্ষ থেকে দ্বিতীয় অংশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার খবর এই রিভিউগুলোতে নেই। তাই আপাতত আক্কাকে পাঁচ পর্বের একটি সম্পূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই দেখা ভালো, যার শেষটা পরের অধ্যায়ের দরজা খোলা রাখে।
