তিন দশকের বেশি সময় ধরে অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মন জয় করা অভিনেতা সমু চৌধুরীর এখন ভিন্ন জীবন। নব্বই দশকের জনপ্রিয় এই অভিনেতা মানসিক অসুস্থতাজনিত কারণে সেই 'লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন'র জীবন পেছনে ফেলে এখন বোহেমিয়ান-নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন। মাঝেমধ্যেই তাঁর ভবঘুরে-উদভ্রান্ত জীবনের দু-একটি রিল ভেসে আসছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই রিল শুধুই বেদনার।
সমস্যাটা এখানেই থেমে নেই। এই রিল বানাতে গিয়ে অসুস্থ মানুষটিকে আরও অসুস্থ করে তুলছেন ইউটিউবাররা, এমন অভিযোগ উঠেছে। একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের ভবঘুরে জীবনকে কনটেন্ট বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া তাঁর কষ্ট বাড়াচ্ছে, কমাচ্ছে না। দর্শকের সহানুভূতি পাওয়ার বদলে অনেক সময় এসব ভিডিও তাঁকে আরও একা আর আরও অরক্ষিত করে তুলছে। শিল্পীর মর্যাদা আর অসুস্থ মানুষের গোপনীয়তা, দুটোই এখানে প্রশ্নের মুখে।
তবে আশার খবরও আছে। তাঁকে চিকিৎসা-পুনর্বাসনের মাধ্যমে একটু স্বস্তির জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানালেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু। অর্থাৎ শুধু আফসোস নয়, তাঁকে চিকিৎসার আওতায় এনে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। একজন শিল্পী যিনি দীর্ঘদিন দর্শককে আনন্দ দিয়েছেন, তাঁর শেষ জীবনটা যাতে একটু স্বস্তিতে কাটে, সেই চেষ্টাই এই উদ্যোগের মূল কথা।
সমু চৌধুরীর গল্পটা আসলে শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয়। জনপ্রিয়তার আলো নিভে গেলে শিল্পীদের জীবন কেমন হয়, অসুস্থতা আর একাকিত্ব কীভাবে তাঁদের গ্রাস করে, সেই বড় প্রশ্নটাও এখানে জড়িয়ে আছে। দর্শকের ভালোবাসা একসময় তাঁদের ঘিরে থাকলেও কঠিন সময়ে সেই ভালোবাসা অনেক সময় দূর থেকে আফসোসেই থেমে যায়। চিকিৎসা আর পুনর্বাসনের উদ্যোগ সেই জায়গাটাতেই পার্থক্য গড়তে পারে, যদি তা সত্যিই বাস্তবায়িত হয়।
এই প্রথম নয় যে সমু চৌধুরীকে নিয়ে উদ্বেগ উঠেছে। এর আগেও সহশিল্পী মনিরা মিঠু তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আকুতি জানিয়েছিলেন, যা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তখনও প্রশ্নটা একই ছিল, একজন অসুস্থ শিল্পীকে শুধু ভিডিওর বিষয় বানিয়ে রাখা হবে, নাকি তাঁর চিকিৎসা আর নিরাপত্তার ব্যবস্থা হবে। যশোরের সাংস্কৃতিক জোটের নতুন উদ্যোগ সেই প্রশ্নের জবাবে চিকিৎসা-পুনর্বাসনের পথ বেছে নিয়েছে। উদ্যোগটি সফল হলে সমু চৌধুরীর জীবনে একটি স্থিতিশীল ছাদ আর নিয়মিত চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা শুধু তাঁর জন্য নয়, এমন অবস্থায় থাকা অন্য শিল্পীদের জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হবে।
এর আগে সহশিল্পীরাও সমু চৌধুরীর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এবারের উদ্যোগ সেই আহ্বানকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। চিকিৎসা-পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাঁকে স্বস্তির জীবন ফিরিয়ে দেওয়া গেলে সেটাই হবে এই গল্পের সবচেয়ে মানবিক পরিণতি। আপাতত দর্শকের করণীয় একটাই, অসুস্থ মানুষটির ভিডিও ছড়িয়ে তাঁকে আরও অসুস্থ না করে তাঁর সুস্থতার জন্য শুভকামনা জানানো।
