বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত মডেল শ্রদ্ধা দুবের ঠিকানা এখন কারাগার। ক্যাফে ব্যবসায়ী শিবা শর্মার মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর ভারতের লক্ষ্ণৌয়ের গোসাইগঞ্জ জেলা কারাগারে দিন কাটছে তার। সেখানে ৪৫ জন নারী বন্দির সঙ্গে একই কক্ষে রাখা হয়েছে তাকে। কারাগারে যাওয়ার পর থেকে ঠিকমতো খাচ্ছেন না শ্রদ্ধা। অন্য বন্দিদের সঙ্গেও কথা বলছেন কম। এই খবরটি সামনে আসার পর থেকেই মডেলের জীবনের এই আকস্মিক বদল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঘটনার শুরু ৯ অক্টোবর। সেদিন লক্ষ্ণৌয়ের একটি আবাসনের চারতলা থেকে পড়ে মারা যান শিবা শর্মা। ওই আবাসনেই শ্রদ্ধা দুবের সঙ্গে লিভ ইন সম্পর্কে ছিলেন তিনি। শিবার মৃত্যুর ঘটনায় শ্রদ্ধার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করে মডেলটির দাবি, আত্মহত্যা করেছেন শিবা। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা জরুরি। হত্যার অভিযোগ আনা আর আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক কথা নয়। এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তা অভিযোগ ও তদন্তের পর্যায়ের তথ্য। চূড়ান্ত সত্য আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হবে।
ঘটনার পরের দিনগুলোতে শ্রদ্ধা ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধি নিয়েও পুলিশের তদন্ত চলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগে নেপালে অবস্থানকালে পুলিশের নজরে আসার পর গ্রেপ্তার এড়াতে তারা ভারতে ফিরে আসেন। পরে নাগপুরে আশ্রয় নিলে সেখান থেকেই তাদের আটক করা হয়। গত ২০ অক্টোবর মহারাষ্ট্রের পুলিশ নাগপুর থেকে শ্রদ্ধা, তার বোন রশ্মি এবং তাদের গাড়িচালক আদিলকে গ্রেপ্তার করে।
এই ঘটনায় আরও একটি নাম সামনে এসেছে, শ্রদ্ধার প্রেমিক আমির শেখের নাম। অভিযোগ অনুযায়ী, আমির ও তার সহযোগীরা শ্রদ্ধা, রশ্মি ও আদিলের জন্য কানপুর, নাগপুর এমনকি নেপালেও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অন্য সহযোগীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। এটিও এখন পর্যন্ত পুলিশের তদন্তের পর্যায়ের অভিযোগ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়াটি দ্রুত এগিয়েছে। শিবার মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, তিনজনকে আদালতে তোলা হয়। আদালত তাদের ১০ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অর্থাৎ শ্রদ্ধা, রশ্মি ও আদিল এখন বিচার বিভাগীয় হেফাজতে আছেন। এই হেফাজতের মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তী শুনানি বা নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কারাগারের ভেতরের জীবন সম্পর্কে যা জানা গেছে, তা এসেছে কারা সূত্রের বরাতে। কারা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কারাগারে নেওয়ার পর প্রথমে শ্রদ্ধা ও রশ্মিকে নিভৃতবাসে রাখা হয়েছিল। পরে তাদের অন্য কক্ষে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে দুই বোনের ঠাঁই হয়েছে ৪৫ নারী বন্দির সঙ্গে। গ্রেপ্তারের পর থেকে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পরিবারের কেউ কারাগারে আসেননি বলেও জানিয়েছে কারা সূত্র।
কারাগারের জেলার ঋত্বিক প্রিয়দর্শী জানিয়েছেন, দুই বোনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হয়েছে। তবে তাদের আচরণে উদ্বেগের ছাপ রয়েছে। বেশির ভাগ সময় চুপচাপ বসে থাকছেন তারা। মাঝেমধ্যে নিজেদের মধ্যে কথা বললেও অন্য বন্দিদের সঙ্গে তেমন মিশছেন না। কারাগারে প্রথম রাতেও স্বাভাবিক ছিলেন না শ্রদ্ধা। রাতে তাকে রুটি, ডাল, আলু সয়াবিন ও মেথি শাকের তরকারি দেওয়া হলেও খেতে চাননি তিনি। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলেন, ঘুমও হয়নি ঠিকমতো। ভোর ৬টার দিকে অন্য বন্দিদের সঙ্গে তাকেও ঘুম থেকে উঠতে হয়।
বিলাসবহুল জীবন থেকে কারাগারের এমন কঠোর রুটিনে এসে এভাবেই দিন কাটছে এই মডেলের। এই বৈপরীত্যটাই খবরটিকে আলোচিত করেছে। একদিকে মডেলিং ও বিলাসী জীবনযাপনের পরিচয়, অন্যদিকে ৪৫ জন বন্দির সঙ্গে এক কক্ষ, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, নির্দিষ্ট খাবার, সার্বক্ষণিক নজরদারি। এই দুই জীবনের ব্যবধানই পাঠকদের নজর কেড়েছে।
তবে এই আলোচনার মধ্যে একটি সতর্কতা মনে রাখা দরকার। এই ঘটনাটি এখনো তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। শিবা শর্মার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো আদালতের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়নি। শ্রদ্ধার দাবি এক রকম, পুলিশের অভিযোগ অন্য রকম। তাই এই খবর পড়ার সময় অভিযোগকে রায় হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। পরবর্তী শুনানি, তদন্তের অগ্রগতি বা আদালতের নতুন নির্দেশনা এলে ঘটনার চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
আপাতত যা নিশ্চিত, তা হলো শ্রদ্ধা দুবে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে লক্ষ্ণৌয়ের গোসাইগঞ্জ জেলা কারাগারে আছেন, তার সঙ্গে বোন রশ্মি ও গাড়িচালক আদিলও একই মামলায় হেফাজতে আছেন, এবং পুলিশ পলাতক থাকতে সহায়তা করার অভিযোগে আরও ব্যক্তিদের খুঁজছে। এই মামলার পরবর্তী অগ্রগতি জানা গেলে সেই খবরও যাচাই করে জানানো হবে।
