ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে শুক্রবার সন্ধ্যায় জেমসের কনসার্ট ঘিরে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। 'রক এন রিদম ৫.০: নো লিমিটস ইন দ্য জোন' শিরোনামের এই কনসার্টে জনপ্রিয় গায়ক মাহফুজ আনাম জেমস ও তাঁর ব্যান্ড নগর বাউলের মঞ্চে ওঠার আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। হাজারো মানুষ নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে টিকিট ছাড়াই ভেন্যুতে ঢুকে পড়েন বলে জানা গেছে।
ঘটনাটি ঘটে ২৩ অক্টোবর সন্ধ্যায়। জেমস মঞ্চে ওঠার আগেই ভিড়ের চাপ বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণহীন প্রবেশের কারণে যাঁরা টিকিট কেটে এসেছিলেন, তাঁদের কনসার্ট উপভোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত ভিড় আর দুর্বল ভিড় ব্যবস্থাপনা নিয়ে টিকিটধারী দর্শকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে আয়োজকরা প্রধান ফটক খুলে দিতে বাধ্য হন। এতে টিকিট কেটে আসা দর্শকরা আরও ক্ষুব্ধ হন। তাঁদের প্রশ্ন ছিল, টাকা দিয়ে টিকিট কিনেও কেন তাঁদের এমন ভিড় আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়তে হলো। একটি কনসার্টে টিকিটের মূল্য শুধু প্রবেশের অধিকার নয়, একটি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতিও বটে। সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে গেলে দর্শকের ক্ষোভ স্বাভাবিক।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, দর্শকরা 'ফেক, ফেক' বলে স্লোগান দিচ্ছেন। একটি ভিডিওতে একজন অভিযোগ করেন, ব্যবস্থাপনা ঠিক নেই, অনেক মানুষ টিকিট ছাড়াই ঢুকে পড়েছে। আরেকটি ভিডিওতে নিরাপত্তাকর্মীদের একজন দর্শককে আটকে রাখা ও মারধরের দৃশ্যও দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই ভিডিওগুলোর প্রতিটি ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তাই সেগুলোকে ভিডিওতে দেখা দৃশ্য হিসেবেই দেখতে হবে।
বিনা টিকিটে ঢোকা এক ব্যক্তির বক্তব্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, এভাবে ঢোকা সম্ভব নয়, ভেতরে ঢুকতে তাঁকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিশৃঙ্খলা শুধু টিকিটধারীদের সমস্যা করেনি, ভিড়ের মধ্যে আটকে পড়া সবার জন্যই পরিস্থিতি ছিল অস্বস্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।
পুলিশ পরিস্থিতি সামলাতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন হয় এবং কনসার্টের প্রবেশপথে জড়ো হওয়া ভিড় সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। বড় কনসার্টে ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশের উপস্থিতি স্বাভাবিক, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ভিড় ভাঙার আগেই কেন নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। টিকিট পরীক্ষা, প্রবেশপথের সংখ্যা, বেষ্টনীর শক্তি আর ভেতরের ধারণক্ষমতা, এই বিষয়গুলোর যেকোনো একটিতে ঘাটতি থাকলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
জেমস বাংলাদেশের রক সংগীতের অন্যতম পরিচিত মুখ, আর তাঁর ভক্তদের মধ্যে তাঁকে 'গুরু' বলে ডাকার চল আছে। তাঁর কনসার্ট মানেই বড় জমায়েত, পুরোনো ও নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের একসঙ্গে হওয়া। তাই এই কনসার্ট ঘিরে আগ্রহ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আগ্রহ বড় হলে আয়োজনও বড় হতে হয়। দর্শকসংখ্যার তুলনায় ব্যবস্থাপনা ছোট হলে বিপদ বাড়ে।
এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন টিকিটধারীদের ক্ষতিপূরণ ও আয়োজকদের দায় নিয়ে। এখন পর্যন্ত আয়োজকদের পক্ষ থেকে টিকিটের টাকা ফেরত বা অন্য কোনো ব্যবস্থার কথা প্রকাশ্যে জানা যায়নি। দর্শকদের অভিযোগের জবাবে আয়োজকরা কী বলবেন, পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বাংলাদেশে বড় কনসার্টের সংখ্যা বাড়ছে, আর তার সঙ্গে বাড়ছে ভিড় ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জও। টিকিট ছাড়া প্রবেশ ঠেকানো, জরুরি বেরোনোর পথ খোলা রাখা, নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা, এই বিষয়গুলো এখন আর শুধু আয়োজকের সদিচ্ছার বিষয় নয়, দর্শকের নিরাপত্তার বিষয়। জেমসের কনসার্টের এই ঘটনা সেই আলোচনাকে আবার সামনে এনেছে।
আপাতত ঘটনার মূল চিত্র স্পষ্ট: জেমস মঞ্চে ওঠার আগেই ভিড় ভেঙে পড়ে, টিকিটধারী দর্শকরা ক্ষুব্ধ হন, পুলিশ পরিস্থিতি সামলাতে নামে। এরপর কী হবে, আয়োজকরা দায় স্বীকার করবেন কি না, ভবিষ্যতের কনসার্টে ব্যবস্থাপনা বদলাবে কি না, সেই উত্তরগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
